আরাফাত শাহীন
এখন বর্ষা মৌসুম চলছে। সাধারণত এই সময়েই অধিক হারে গাছ লাগানো প্রয়োজন। কারণ বর্ষার এই সময়টাতে মাটিতে সঞ্চিত রসের সাহায্যে গাছ সহজেই বেড়ে উঠতে পারে। আমাদের দেশে প্রতিবছর এই মৌসুমে এসে গাছ লাগানোর বেশ বড়সড় প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে গাছপালা যে হারে কমে যাচ্ছে তাতে এ ধরনের প্রজেক্ট বেশি বেশি হাতে নেওয়া উচিত বলে মনে করি। কিছুদিন পূর্বে দেশের হাজার হাজার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ত্রিশ লাখ শহীদের স্মরণে ত্রিশ লাখ গাছ লাগানো হয়েছে। এটা অবশ্যই একটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমন উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, একটি দেশের জন্য তার আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, ভূটান, মিয়ানমার এমনকি ভারতেও প্রচুর বনভূমি রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বনভূমি নেই। ঠিক কত শতাংশ বনভূমি রয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে এটা যে শতকরা ১০ ভাগের বেশি হবে না তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটি দেশের জন্য বনভূমি কিংবা সবুজের সমারোহ কেন প্রয়োজন? মাধ্যমিকে পড়ার সময় ‘বৃক্ষরোপণ অভিযান’ নামে যে রচনাটি আমাদের পড়ানো হতো তাতে বিষয়টা বেশ সুন্দরভাবে বলা হয়েছিল। গাছ থেকে আমরা সবচেয়ে দামি যে জিনিসটা পাই সেটা হলো অক্সিজেন। আচ্ছা বলুন তো, এই অক্সিজেন ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও কি বেঁচে থাকতে পারবো?
বলা হয়ে থাকে, কোনো কারণে যদি একটি গাছ কাটা হয় তাহলে সেই স্থানে অন্তত দু’টি গাছ লাগানো উচিত। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে কি তাই ঘটে? আমরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গাছ কেটে উজাড় করে ফেলছি অথচ একটি গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তাটুকুও অনুভব করি না। গাছ যে আমাদের কতটুকু উপকার করে তা আমরা ক’জনা বোঝার চেষ্টা করি? এই যে দিনদিন প্রকৃতি আমাদের সাথে বিরূপ আচরণ করে চলেছে এর কারণ আসলে কী? পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বার বার আমাদের সতর্ক করে বলছেন, ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধনের ফলেই আজকের এই অবস্থা। তবুও আমরা বনভূমি উজাড় করে দিয়ে শান্তিতে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছি। কবে আমাদের চেতনা জাগ্রত হবে?
একটা গাছ আমাদের কতটুকু সাহায্য করে থাকে সেটা আমাদের ভেবে দেখা উচিত। গাছের অক্সিজেন সরবরাহের কথা আগেই বলেছি। শুধু কি তাই! আমাদের উপকূলীয় এলাকা বরাবরই ঘূর্ণিঝড় কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রবল বাতাস যখন এসে আঘাত হানে তখন সেই বাতাসের তীব্রতাকে বাধাগ্রস্ত করে সারি সারি লাগানো গাছ। গাছ তার নিজেকে উত্সর্গ করে দিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত রক্ষা করে চলেছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির দরকার তা হলো গাছ। আজকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার কারণে প্রকৃতি আমাদের সঙ্গে রুক্ষ আচরণ করে চলেছে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে গলে পড়ছে মেরু অঞ্চলের বরফ। এতে করে সমুদ্রের পানি বেড়ে গিয়ে উপকূলীয় এলাকা ডুবিয়ে দেওয়ার জোগাড় করেছে।
আমাদের এখন একটু ভাবতে শিখতে হবে। আমাদের প্রকৃতি আমাদের মস্ত বড় সম্পদ। আমাদের জীবনধারণের উপকরণগুলো আমরা এই প্রকৃতি থেকেই সংগ্রহ করে থাকি। এখন আমরা যদি দিনের পর দিন এই প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে থাকি তাহলে সে তা মানবে কেন? প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। প্রকৃতি তাই নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রের বাস্তব প্রয়োগ ঘটাচ্ছে আমাদের উপর। আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের এই প্রকৃতি এবং সর্বোপরি পৃথিবীকে বাঁচাতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য যে খুব বেশি কিছু করা লাগবে তেমন নয়। আমরা প্রত্যেকে যদি অন্তত দু’টি গাছ লাগাই তবুও কয়েক কোটি গাছ লাগানো হয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা আজ থেকেই শুরু করি। নিজেদের স্বার্থের জন্য সামান্য এই কাজটুকুও কি আমরা করতে পারবো না?
লেখক: শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

