ঢাকাThursday , 13 August 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি পথে মির্জা ফখরুল

Link Copied!

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি জানান, দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা। আগামী ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় নির্ধারিত রয়েছে। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি পদে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের প্রার্থিতা সামনে এসেছে। ফলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যে পরিবারে রাজনীতির হাতেখড়ি
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই রাজনৈতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন মির্জা ফখরুল। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক অধ্যায় শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয়
ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালে মির্জা ফখরুল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সংগঠনের এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। সেই সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক চিন্তা ও নেতৃত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকারি জীবনীতে তার ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

রাজনীতির পর শিক্ষকতা
ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর কর্মজীবনে ভিন্ন একটি পথ বেছে নেন মির্জা ফখরুল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন।
পরবর্তী সময়ে কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরিতে থাকাকালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।

সরকারি প্রশাসন থেকে পূর্ণকালীন রাজনীতি
কর্মজীবনের এই পর্যায়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন মির্জা ফখরুল। এরপর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূলত ঠাকুরগাঁওকে কেন্দ্র করে আরও বিস্তৃত হয়।

পৌর চেয়ারম্যান থেকে বিএনপিতে
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিকভাবে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এরপর স্থানীয় রাজনীতির সীমানা পেরিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তার উত্থান শুরু হয়।

সংসদে প্রবেশ, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব
রাজনীতির মাঠে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল।
বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে একের পর এক দায়িত্ব
সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি বিএনপির সাংগঠনিক পর্যায়েও মির্জা ফখরুলের অবস্থান শক্ত হতে থাকে। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়।
এরপর ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হন। মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। দলীয় কর্মসূচি, রাজনৈতিক আন্দোলন, নির্বাচন এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।

ব্যক্তিজীবন ও পরিবার
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ। তার স্ত্রী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাদের দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। সরকারি জীবনীতে তাদের শিক্ষাজীবন ও পেশাগত কর্মকাণ্ডের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে।
তার ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ছাত্র ইউনিয়ন থেকে বিএনপির মহাসচিব
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো তার রাজনৈতিক যাত্রার বৈচিত্র্য। ছাত্রজীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু, এরপর শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি—সবশেষে বিএনপির রাজনীতিতে এসে তিনি দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছেছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে পৌর চেয়ারম্যান, জাতীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী এবং দলীয় রাজনীতিতে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিব হন তিনি।

রাষ্ট্রপতি পদে নতুন অধ্যায়ের সামনে
এই দীর্ঘ পথচলার পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে তার পদত্যাগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে প্রবেশ, শিক্ষকতা ও সরকারি প্রশাসনের দায়িত্ব পালন, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া এবং দীর্ঘ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দেওয়া—সব মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন কয়েকটি ভিন্ন পর্বে বিভক্ত। এবার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে। তবে নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবেই উল্লেখ করা হবে। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্টের ভোটের পরই নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্ত হবে।