মো. জিয়াউল হক
পানি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। পানির অপর নাম জীবন। জীবনের উৎস পানি। এই অমূল্য সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অনস্বীকার্য। পৃথিবীর দুই ভাগ (২৯%) স্থল, বাকি পাঁচ ভাগ (৭১%) জল। পৃথিবীতে মোট পানিসম্পদ এর পরিমাণ প্রায় ১৪০০ মিলিয়ন কিউবিক কি. মি. (এমসিকেএম)। তন্মধ্যে সুপেয় পানির পরিমাণ ২.৫% এবং অপেয় পানির পরিমাণ ৯৭.৫%। দেশে ভূপরিস্থ মোট পানি সম্পদের পরিমাণ ১৩৫০ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিক মিটার)। এ ভূপরিস্থ পানি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নদ-নদী, খাল-নালা, বিলে অবস্থান করে অর্থাৎ বর্ষা মৌসুম (জুন-সেপ্টেম্বর) এবং পরবর্তী সময়ে সাগর মহাসাগরে পতিত হয়। তাই আমাদের দেশে ভূপরিস্থ পানি সারাবছর কৃষি ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না (সূত্র: বাংলাপিডিয়া)।
সাধারণত নদ-নদী, খাল-নালা প্রবাহের আড়াআড়ি নির্মিত এপার ওপার বিস্তৃত অবকাঠামোকে বাঁধ (Dam) বলে। শুষ্ক মৌসুমে নির্দিষ্ট উচ্চতা ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নদ-নদী, খাল-নালায় পানি ধরে রাখার নিমিত্ত নির্মিত অবকাঠামো যা স্রোতের গতিরোধ করে বাঁধের উজানে জলাধার সৃষ্টি করা হয়। সেচ, গৃহস্থালি, কলকারখানায় ব্যবহার ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে মানুষের জীবনে পানির বহুমাত্রিক ব্যবহারে এরূপ বাঁধ নির্মিত হয়। এ বাঁধ জলাধারের উঁচু সীমা হ্রাস বা বৃদ্ধিকরণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রাকৃতিক পানির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ অথবা নদ-নদী, খাল-নালায় পানি বৃদ্ধি করে সেচ, নৌ চলাচল, পরিবহণ এবং পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ ড্যাম নির্মাণের ফলে সৃষ্ট জলাধার হতে গ্র্যাভিটি ‘ফ্লো’র মাধ্যমে ভূপরিস্থ পানির সাহায্যে সেচ ও লবণ পানির অনুপ্রবেশ রোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বাঁধ সাধারণত দুই প্রকার-
১. মাটির তৈরি বাঁধ (Earth Dam);
২. কংক্রিট বা রাবার বাঁধ (Concrete or Rubber Dam)।
এখন আর মাটির বাঁধ তৈরি করা হয় না। বতর্মানে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির রাবার ড্যাম, হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম ও কংক্রিট ড্যাম তৈরি করা হয়ে থাকে। বাঁধের সহায়ক কার্যক্রমগুলো হলো:
১) নির্গম পথ, দ্বার, জলকপাটিকার মাধ্যমে জলাধারের উদ্বৃত্ত পানি ড্যামের ভাটির দিকে প্রবাহিতকরণ;
২) অভ্যন্তরে কাঠামোতে পানিকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে, খাল বিলে সুড়ঙ্গে প্রবাহিতকরণ;
৩) দূরবর্তী অঞ্চলে সেচে ব্যবহারের জন্য সেচনালা বা বারিড পাইপের মাধ্যমে প্রবাহের ব্যবস্থাকরণ।
ড্যাম নির্মাণের ইতিহাস সুপ্রাচীন। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৯০০ অব্দে মিশরের কোশেইশে নীল নদের উপর ৪৯ ফুট (প্রায় ১৫ মিটার) উঁচু সুরকি পাথরের নির্মিত ড্যাম সদৃশ কাঠামোর চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ অব্দে কায়রোর সাদ-আল-কাফারায় মৃত্তিকার বাঁধের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এশিয়ায় নদীতে ড্যাম নির্মাণের ধারাটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়ে ছিলো। এশিয়ার প্রথম ড্যাম চীনের পাঁকৌ নদীতে নির্মাণ করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের পর সেচ কাজে বড় জলাধার বা জলাশয় সৃষ্টির নিমিত্ত ড্যাম নির্মিত হয়। ভারতবর্ষে ও প্রাচীন বাংলায়ও সে সময় থেকে ড্যাম নির্মাণ কর্মকান্ডের সাথে পরিচিত ছিল। সাম্প্রতিককালে, দেশে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বেশকিছু সংখ্যক রাবারের তৈরি ড্যাম নির্মিত হয়েছে।
রাবার ড্যাম সাধারণত কংক্রিট নির্মিত ড্যাম এবং রেগুলেটর এর তুলনায় সস্তা, নমনীয় এবং পরিচালনায় সহজ। বন্যার মৌসুমে পানি বাঁধাহীনভাবে সরে বা প্রবাহিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহজেই রাবার ব্যাগগুলো থেকে পানি বা বাতাস শূণ্য করে বাঁধ সরিয়ে ফেলা যায়। রাবার ড্যাম সেচ ও গ্রামীণ এলাকার পানি সরবরাহ কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও পার্বত্য এলাকার স্রোতধারায় বা ঝর্ণায় ক্ষুদ্রাকার পর্যায়ে জলবিদ্যুৎ ও মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এ ধরণের রাবার ড্যাম ব্যবহার করা যায়। ১৯৫৭ সালে তদানিন্তন EPWAPDA (East Pakistan Water And Power Development Authority) কর্তৃক সেচকাজে ব্যবহারের জন্য মেঘনা নদী এবং ফেনী নদীতে একটি করে ২টি কংক্রিট ড্যাম নির্মাণ করা হয়। ১৯৬২ সালে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই এ কর্ণফুলী নদীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আরো একটি কংক্রিট ড্যাম নির্মাণ করা হয়।
রাবার ড্যাম (Rubber Dam): সারাবছর পানির প্রবাহ থাকে এরূপ ছোট নদ-নদী খাল-নালায় বা স্রোতধারাসমূহে পানি ধরে রাখার জন্য বাতাস বা পানির দ্বারা স্ফীত রাবার ব্যাগ পরস্পর সংযোজিত করে এই ড্যাম নির্মিত হয়। নির্মিত রাবার ড্যাম নদী বা খালের তলদেশে নির্মিত Foundation Base এর সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে নাট বোল্ট এর মাধ্যমে সংযোজিত করে রাখা হয়। রাবার ব্যাগগুলোকে রাবার এবং কৃত্রিম তন্তু দিয়ে বুননের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। স্ফীত রাবার ব্যাগগুলোর এ সংযোজন ব্যবস্থাটি প্রসারণ শক্তি রয়েছে, যা পানির গতিরোধী এবং আসঞ্চনশীল (Cohesive)। রাবার ব্যাগটি মজবুত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে স্তরে স্তরে কৃত্রিম তন্তু দ্বারা সংযোজিত করা হয়। রাবার ড্যাম নির্মাণ শুধু রাবার ব্যাগ সংযোজন কাজ নয়, তার সাথে স্থানীয় জনগণের চাহিদা মোতাবেক সম্ভাব্যতা যাচাইপূর্বক আরও অনেক আনুষঙ্গিক অবকাঠামো ও অন্যান্য কার্যক্রম করা হয়। উক্ত কার্যক্রমের মধ্যে প্রধান কাজ হলো-রাবার ড্যাম সংলগ্ন ব্রীজ নির্মাণ, যার মাধ্যমে কৃষক তার কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল সহজে পরিবহণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়। এছাড়াও এ ব্রীজের মাধ্যমে জনগণ, অন্যান্য পণ্য ও মালামাল পরিবহণ করা হয়। সেচ কাজে পানি পরিবহণ, সংরক্ষণ ও জলাধার সৃষ্টির জন্য সেচ খাল পুনঃখনন/সংস্কার, বারিড পাইপ, পানি নিয়ন্ত্রণের স্লুইচগেইটি রেগুলেটর, পানি সংরক্ষণ কাঠামো, কালভার্ট, এক্যুইডাক্ট নির্মাণ করা হয়। রাবার ড্যামের নদী বা খালটিকে সংরক্ষণের জন্য তীর সংরক্ষণ বাঁধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ কাজও করা হয়। অপরদিকে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য রাবার ড্যাম সাইট ও নদী বা খালের তীরে ব্যাপক বৃক্ষরোপনের ফলে পরিবেশের কোন ক্ষতি হয় না। ফলে রাবার ড্যাম সাইট বিনোদন/পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়। রাবার ড্যামটি সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সুবিধাভোগীদের সমন্বয়ে একটি পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি গঠিত হয়। সমিতি রাবার ড্যাম পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের কাজ করে থাকে। এছাড়াও প্রতি বছর নির্বাচিত হয়ে সেচচার্জ আদায় এবং ড্যামটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করে থাকে। সমিতি রাবার ড্যামের পানিতে মাছ ও হাঁস চাষ অথবা স্থানীয়ভাবে লীজ প্রদান করে সমিতির আয় বৃদ্ধি করে থাকে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের খাদ্যের স্বয়ম্ভরতা অর্জনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র অবদান অপরিসীম। বিএডিসি কৃষির মৌলিক ৩টি উপকরণ যথাঃ উন্নত বীজ, সার ও সেচ নিয়ে কাজ করে থাকে। তন্মধ্যে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। বিএডিসির ক্ষুদ্রসেচ উইং দেশব্যাপী প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার করে, সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিচালিত সেচ পাম্প, রাবার ড্যাম, হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম, স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রি-পেইড মিটার, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টর, পলিনেটেড শেড, স্প্রিংকলার ও ড্রিপ সেচ পদ্ধতিসহ আরও অনেক নতুন প্রযুক্তি, সেচ পদ্ধতি বা যন্ত্রপাতি প্রবর্তনে কাজ করে যাচ্ছে। প্রচলিত ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা করে, ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সেচকাজে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার লক্ষ্যে রাবার ড্যাম ও হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণপূর্বক জলাধার সৃষ্টি করে সেচ কার্যক্রমে অবদান রাখছ। এযাবৎ সারাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন বিএডিসি-১০টি, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ৫১টি, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫টি ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১টি সর্বমোট ৬৭টি রাবার ড্যাম নির্মাণ করেছে।
বিএডিসি ২০১২-১৩ হতে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত নির্মাণকৃত রাবার ড্যামের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মিছাখালী নদীতে নির্মিত রাবার ড্যামটি শুধুমাত্র আগাম বন্যা হতে ৭,০০০ হেক্টর জমির ফসল রক্ষা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭,০০০ হেক্টর জমির ফসল আগাম বন্যা হতে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। অপর ৯টি রাবার ড্যামের মাধ্যমে প্রায় ৮,৩০০ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এ যাবৎ বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৩টি প্রকল্প ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর’ এর অঙ্গ হিসেবে এবং ৩টি প্রকল্প ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ট্রাস্ট ফান্ড’ এর আওতায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও বিএডিসি’র আওতায় বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন ‘কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহারের জন্য রাবার ড্যাম নির্মাণ প্রকল্প’-এ ৮টি রাবার ড্যাম ও ২টি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণের সংস্থান রয়েছে। তন্মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ৪টি রাবার ড্যাম ও ২টি হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪টি রাবার ড্যাম নির্মাণ কাজ আগামী জুন/২০২১ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
সেচকাজে ভূগর্ভস্থ ও ভূপরিস্থ পানির পরিমিত ব্যবহার না হওয়ায় অর্থাৎ অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের ফলে দিন দিন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থানভেদে নিম্নগামী হচ্ছে। এ নিম্নগামিতা রোধকল্পে প্রবাহমান ছোট নদী বা খালে রাবার ড্যাম নির্মাণপূর্বক সেচকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে ও কৃষক পর্যায়ে সমাদৃত হয়েছে। উক্ত রাবার ড্যামগুলো নির্মাণের ফলে একদিকে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অপরদিকে রাবার ড্যাম সাইটগুলোতে কৃষক দল গঠন এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আরো রাবার ড্যাম নির্মাণের লক্ষ্যে বিএডিসি সাইটের সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম চলমান রেখেছে যা অনতিবিলম্বে প্রকল্প আকারে কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত হবে। বর্তমান প্রকল্প ও প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সাল নাগাদ সেচকাজে ভূপরিস্থ পানির ব্যবহার ২৬.৬২% হতে ৩০% এ উন্নিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।
“রাবার ড্যামের আশীর্বাদ, পতিত জমি করি চাষাবাদ”
লেখক : প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কৃষি ভবন, ঢাকা।

