ড. মো. শাফায়েত হোসেন
ফসলের মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চাষি পর্যায়ে সরবরাহের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন করাই হচ্ছে বীজ প্রযুক্তির মূল কথা। মানসম্পন্ন বীজ হতে হবে সম্পূর্ণ জীবানুমুক্ত এবং বীজমানের উপাদানসমূহ থাকতে হবে নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমার (স্ট্যান্ডার্ড) মধ্যে। ফসলের মাঠমান ও বীজমান জাতীয় বীজ বোর্ড (এনএসবি) কর্তৃক নির্ধারিত। বিদ্যমান নিয়মে বীজ প্রত্যয়নের জন্য কোন বীজলটের বীজের বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা এবং আর্দ্রতার পরিমাণ বিবেচনায় নেয়া হলেও বীজের স্বাস্থ্যকে বিবেচনায় নেয়া হয় না। বীজের স্বাস্থ্য বিবেচনায় নেয়া না হলে বিদ্যমান মাঠমান এবং বীজমান দ্বারা বীজের মান নিশ্চিত করা যায় না; কারণ বীজ ক্ষতিকর রোগের জীবাণু বহন করলে ফসলের সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে (ফকির এবং আলী ২০০৯)। ১০ অক্টোবর ২০১০ কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশ গেজেট নং ১৫৯ এ ৭টি নোটিফাইড এবং ৭৩ টি নন-নোটিফাইড ফসলের মাঠমান এবং বীজমান নির্ধারণ করা হলেও বীজমানের ক্ষেত্রে বীজের স্বাস্থ্য (Seed Health) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এখানে স্মর্তব্য যে, নির্ধারিত মাঠমান মোতাবেক এবং বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির প্রত্যয়নের ভিত্তিতে গুনগত মানসম্পন্ন ভিত্তি ও প্রত্যায়িত বীজ উৎপাদন করা হয়। সঠিকভাবে মাঠমান অনুসরণ করে বীজ উৎপাদনপূর্বক সংগ্রহ করা হলে বীজবাহিত রোগের উপস্থিতি একেবারেই কম বা না থাকারই কথা। বর্তমানে বীজবাহিত রোগ দ্বারা বিভিন্ন ফসল আক্রান্ত হওয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে, এমতাবস্থায় বীজের স্বাস্থ্যকে বিবেচনায় নিয়ে বীজমান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বীজের স্বাস্থ্যকে বীজমানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বীজ শোধনের জন্য আইনগত ভিত্তি তৈরি হবে।
বীজ প্রযুক্তিতে বীজ শোধন (Seed Treatment) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ ফসল বিভিন্ন বীজবাহিত রোগ (Seed Borne Disease) দ্বারা আক্রান্ত হয়। এক হিসেবে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে বীজবাহিত রোগ দ্বারা বছরে শতকরা দশভাগ ফসলের ক্ষতি হয় যার অর্থমূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকার সমান (ফকির ১৯৯৭)। সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং বেসরকারি পর্যায়ে তিনশত এর অধিক বীজ কোম্পানি এবং এনজিও বীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও আমদানির সঙ্গে জড়িত। বিএডিসি কর্তৃক উৎপাদিত ও সংরক্ষিত বিভিন্ন বীজের মধ্যে বিগত কয়েক বছর থেকে বীজ বিতরণ মৌসুমের শুরুতে দানাশস্য বীজ বিশেষ করে ধান ও গম বীজ শোধনপূর্বক বিতরণ করা হচ্ছে। যদিও অনেক আগে থেকেই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ফিউমিগেন্টস দ্বারা ফিউমিগেশন বা কীটনাশক দ্বারা স্প্রে-এর মাধ্যমে বীজ সংরক্ষণাগারে সংরক্ষিত অবস্থায় বীজ পোকামুক্ত রাখার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বীজ বিশেষজ্ঞ বা কৃষি বিজ্ঞানীগণ বীজবাহিত রোগ বিশেষ করে ছত্রাকজনিত রোগ দমনের জন্য সরবরাহের পূর্বেই বীজ শোধনের উপর জোর দিয়ে থাকেন। বিএডিসিতে কর্মরত বীজ বিজ্ঞানীগণও এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন না। তবে কখন, কোন পদ্ধতিতে, কোন ফসলের বীজ, কোন শ্রেণির বীজ, কোন উৎসের বীজ, সুনির্দিষ্ট কোন ছত্রাকের বিপরীতে বীজ শোধন করা প্রয়োজন, ছত্রাকের উপস্থিতির পরিমাণ, ছত্রাকনাশকটি তরল নাকি পাউডারজাতীয় এ ব্যাপারে মতামত রয়েছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে বীজ শোধন করাই যুক্তিযুক্ত। উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে ঢালাওভাবে সকল বীজ শোধন করা যেমন অনুচিত তেমন অবৈজ্ঞানিক। ছত্রাকনাশকভেদে বীজ শোধনের জন্য কেজি প্রতি খরচ বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচ্য। হিসেব করে দেখা যায় যে, বর্তমানে বিএডিসিতে বীজ শোধনের ফলে কেজি প্রতি বীজে ৮-১০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয় যা মোট বীজ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে। এখানে প্রাসঙ্গিক একটি বিষয় বলে রাখা ভাল তা হচ্ছে চুক্তিবদ্ধ চাষি কর্তৃক উৎপাদিত বীজের মূল্যসহ আনুষঙ্গিক খরচ পরিশোধে বিএডিসিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতি বছরই বীজ ও উদ্যান উইংয়ের অধীন বীজের সাতটি স্থায়ীধর্মী কার্যক্রমের আওতায় বাজেট ঘাটতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মন্ত্রণালয় থেকে বীজের মূল্য পরিশোধের নিমিত্ত বরাদ্দপ্রাপ্ত অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে চুক্তিবদ্ধ চাষিদের বীজের মূল্য সময়মত পরিশোধ করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। বীজ শোধনে আর্থিক সংশ্লিষ্টতাসহ অন্যান্য ঝুঁকি থাকলেও বীজবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বীজ শোধনের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা যায় না। তরল ছত্রাকনাশক দ্বারা বীজ শোধনের সময় বীজের আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঐ বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমনকি পূর্বের চেয়ে আর্দ্রতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। আবার কোন কারণে শোধিত বীজ অবিক্রিত থেকে গেলে এবং তা অবীজ হিসেবে বিক্রি করলে মানুষ বা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার উপযোগী নাও থাকতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৬ মার্চ ২০১৫ তারিখের ১৩৪নং স্মারক মোতাবেক বিএডিসি’র বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত ‘Manual for Seed Processing and Preservation’ যথাযথভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। উক্ত ম্যানুয়ালে উল্লেখ আছে যে, একটি আদর্শ বীজ শোধক (Seed Treating Chemicals) হতে হবে রোগদমনে কার্যকর, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়, সহজে প্রয়োগযোগ্য এবং আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী। এক্ষেত্রে বিএডিসিতে বর্তমানে বীজ শোধনে ব্যবহৃত বীজ শোধক রাসায়নিক দ্রব্য কতটুকু আদর্শ তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে ভাবতে হবে। দেখা যাচ্ছে, শোধিত বীজ কোন কারণে অবিক্রিত থাকলে এবং তা অবীজ হিসেবে বিক্রি করলে মানুষ বা পশুখাদ্য হিসেবে উপযোগিতা থাকে না। বিএডিসিতে ২০১৪-১৫ বছরে প্রোভেক্স ২০০ ডব্লিউপি এবং ভিটাফ্লো ২০০ এফএফ নামক ছত্রাকনাশক দ্বারা শোধিত গম বীজের মধ্যে ১৬০ টন গম বীজ অবিক্রিত অবস্থায় থেকে যায়। এ অবিক্রিত শোধিত গম বীজ খাবার উপযোগী কিনা তা পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিক্যাল রিসার্স সেন্টারে পাঠানো হয়। পরীক্ষান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জানানো হয় যে, এ বীজ পশু-পাখি এবং মানুষের খাবার অনুপযোগী। এমনকি সরাসরি মাটিতে না মিশিয়ে পুড়িয়ে বিনষ্ট করতে হবে যাতে মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষণ না হয়। এ ছত্রাকনাশকের অনুমোদন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং বিভিন্ন বালাইনাশকের একমাত্র অনুমোদনকারী প্রতিষ্ঠান। উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং-এর স্মারক নং-৯৭৮, তারিখ-০২/০৮/২০১০ মোতাবেক ভিটাফ্লো ২০০ এফএফ পাট ও গম বীজ শোধনের জন্য অনুমোদিত বলে উল্লেখ রয়েছে; আবার একই দপ্তরের স্মারক নং-১১৫, তারিখ-২৩/০১/২০১২ মোতাবেক ছত্রাকনাশকটিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার বীজে বীজ শোধন বালাইনাশক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রবীণ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আনসার আলী বলেন, ভিত্তিবীজে প্রাকৃতিকভাবেই রোগের মাত্রা খুবই কম থাকে তাই বীজ শোধক ব্যবহার করে ছত্রাক দমন করার প্রয়োজন নেই। বীজ বিধিমালা, ১৯৯৮ এর বিধি-৯ মোতাবেক বীজকে ৪ শ্রেণি যথা- মৌলবীজ, ভিত্তিবীজ, প্রত্যায়িত বীজ এবং মানঘোষিত বীজে ভাগ করা হয়েছে। এসব বীজের মধ্যে বিএডিসি ভিত্তিবীজ, প্রত্যায়িত বীজ এবং মানঘোষিত বীজ উৎপাদনপূর্বক সরবরাহ করে থাকে। জাতীয় বীজনীতি ও বিধিমালায় (The National Seed Policy, Seed Acts & Rules) বীজ শোধন সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ না থাকলেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং এর স্মারক নং-কৃষি/বীজ উইং/বিবিধ-৭/২০০৭/২৭৯, তারিখ-২৯/০৯/২০০৮ মোতাবেক বিএডিসি’র বীজ কার্যক্রমে শুধু ভিত্তি ও প্রত্যায়িত মানের ধান, গম ও ভুট্টাবীজ শোধনের অনুমোদন রয়েছে। তবে কি ধরণের বালাই বিশেষ করে ছত্রাকের বিপরীতে কোন ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা নেই। যৌক্তিক কারণে ভিত্তিবীজের চেয়ে প্রত্যায়িত বীজ শোধন করা অধিকতর প্রয়োজন; কারণ প্রত্যায়িত বীজের চেয়ে ভিত্তিবীজ অধিক নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদন করা হয়। তবে এ সকল ফসলের মৌলবীজ শোধনের জন্য কোন নির্দেশনা রয়েছে কিনা তা জানা নেই। বীজবাহিত হওয়ার কারণে এ রোগ তো প্রজনন বীজ বা মৌলবীজ থেকেও ভিত্তিবীজে সংক্রমিত হতে পারে। তাই প্রজনন বীজ বা মৌলবীজ শোধনের উপরও জোর দিতে হবে। এমতাবস্থায় বীজমানে বীজের স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্তকরত বীজশোধনের নিমিত্ত সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা জারি করা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : উপব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), ঢাকা।

