ফাইজুল ইসলাম
একজন কৃষক দেশ ও দেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধু। শত দুর্যোগ, খরা, বৃষ্টির মধ্যেও দেশের মাটিকে শস্য শ্যামলে ভরে রাখতে বদ্ধপরিকর। একজন কৃষক সারাটি জীবন নিজের পরিবারের পরেই দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবে। নিরলস পরিশ্রম করে যায় দেশকে ক্ষুধামুক্ত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে। কৃষিনির্ভর এ দেশ কৃষকের উপরই নির্ভরশীল। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, চৈত্রের তাপদাহ সহ্য করে, আষাঢ়ের বৃষ্টিকে মাথার উপর রেখে এ দেশের কৃষকই অর্থনীতির চাকাকে দিনের পর দিন বেগবান করছে। দেশের অর্থনীতির ভিত কৃষকের হাতেই তৈরি। কৃষক অক্লান্ত পরিশ্রম করে খাদ্য উৎপাদন করে আপামর জনগণের মৌলিক চাহিদা খাদ্যের যোগান দেয় এবং খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করে। বাংলাদেশ বিশ্বে ধান উৎপাদনে ৪র্থ, মাছ উৎপাদনে ৪র্থ এবং সবজি উৎপাদনে ৩য়। বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের দরবারে এ দেশকে মাথা উঁচু করে কথা বলার ভীত কৃষকই করে দিয়েছে; ভিন্ন মাত্রায় বিশ্বের দরবারে একটি নতুন বাংলাদেশ। এ অবদান আমার দেশের কৃষকের; যার শরীরের চামড়া রোদের তাপে কালো হয়েছে। কবি জসিম উদ্দিন যাকে ‘রুপাই’ বলেই সম্বোধন করেছেন।
স্বাধীনতার ঠিক পরে ১৯৭২ সালে দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি দশ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য ওই খাদ্য পর্যাপ্ত ছিল না। আজকের কৃষি কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। মানুষ বেড়েছে দ্বিগুনেরও বেশি আর আবাদি জমি কমেছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ; তারপরেও বাংলাদেশ খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। ২০১৫-১৬ সালে নীট খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ৩১,৬৯১ মেট্রিক টন। নীট খাদ্যশস্য প্রয়োজন ছিল ২৯,৭২৬ মেট্রিক টন। খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত ছিল ১৯৬৫ মেট্রিক টন (সূত্র : বিবিএস)। ১৯৮০-৮১ এর দশকে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের অবদান ছিল যথাক্রমে ৩৩.০৭, ১৭.৩১ এবং ৪৯.৬২ শতাংশ যা ক্রমাগতভাবে পরিবর্তিত হয়ে ২০১৫-১৬ হয়েছে যথাক্রমে ১৫.৩৩, ৩১.২৮ এবং ৫৩.৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মোট জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমেছে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমলেও অন্যান্য খাতের বিকাশে কৃষি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। প্রায় সব শিল্পই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। এদেশের শিল্পোন্নয়নে কৃষি ও কৃষকের অবদান অনস্বীকার্য। অর্থনীতির কৃষিসহ অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধির গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে যার ফলশ্রুতিতে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা মেয়াদকালে বিদ্যমান ৮২.১ শতাংশ দারিদ্রতার হার ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী মেয়াদকালে ২৪.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দারিদ্রতার হার কমিয়ে আনার এ সফলতায় কৃষকের অবদান সবচেয়ে বেশি।
হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যে কৃষক ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াসে অর্থনীতির চাকাকে দিনের পর দিন শাণিত করছে তারাই অনেকাংশে সুবিধাবঞ্চিত। স্বপ্ন নিয়ে ফসল বোনে আর কান্না নিয়ে ঘরে ফিরে এ জাতির কারিগরেরা। ২০১৬ সালে আমরা দেখেছি আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল বটে কিন্তু কৃষক উৎপাদন খরচের কমে বা সমান খরচে আলু বিক্রি করেছে। লাভের খাতা একেবারেই শূন্য। অন্যদিকে কৃষকেরা টমেটো উৎপাদন করে পাচ্ছে না ন্যায্যমূল্য। কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে কৃষক।
কৃষককে বাঁচাতে সরকারকে পথ খুঁজে বের করতে হবে। কৃষক ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার পিছনে বড় ও প্রধান কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে, কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সমন্বয়হীনতা। কৃষক উৎপাদন করছে এবং এই উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তদারকি করছে; কিন্তু উৎপাদন পরবর্তী বাজারজাতকরণের মত বড় অংশটি তদারকি করার মত সকারের তেমন কোন দক্ষ জনবল নেই। ন্যায্য মূল্য নিশ্চয়তার অন্যতম শর্ত হল সঠিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। সঠিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের মত করে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে করে কৃষি পণ্যের দাম অনিশ্চিতভাবে ওঠানামা করছে। তাই কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ ও কৃষি পণ্যের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে হলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের অধীনে প্রত্যেক উপজেলায় কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নিয়োগে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতকেরা দক্ষ জনবল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। কৃষি অর্থনীতি ডিগ্রির লক্ষ্যই হলো দেশের কৃষি পণ্যের বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পলিসি ও প্লানিং করা এবং তা বাস্তবায়নে কাজ করা। কৃষক তথা দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিবে বলেই আশা করছি। কৃষক এ দেশের প্রাণ। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।
(লেখক : শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতি ছাত্র সমিতির সভাপতি)

