সৈয়দ আশেক মাহমুদ
পথবাসীরা এ দেশের নাগরিক, এ সমাজেরই অংশ। একজন মানুষ হিসেবে পথবাসীদের উপেক্ষা না করে তাদের অধিকার আদায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এদের অবদান ও নগরবাসীর স্বীকৃতি দিয়ে উন্নয়ন, কল্যাণমূলক কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব।
বাংলাদেশে নগরবাসী জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ দরিদ্র। নগরদারিদ্র্য বলতে আমরা সাধারণত নিম্নআয়ের পেশাজীবী এবং বস্তিবাসী মানুষকে বুঝিয়ে থাকি। আমরা খেয়াল করি না, বস্তিবাসীদের চেয়েও অধিক দুর্দশাগ্রস্ত এবং হতদরিদ্র মানুষ এই নগরীতে রয়েছে। আমাদের দৃষ্টির সম্মুখে অথচ আমরা তাদের দেখেও দেখি না অথবা অবজ্ঞা করে যাই। কখনো তাদের দেখে দৃষ্টি হোঁচট খেলে আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে বলি, ওরা এই সুরম্য সুসজ্জিত নগরীর সৌন্দর্যহানির কারণ, তাদের জন্য বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়। রূপসী নগরীর অঙ্গে এরা যেন ক্ষতচিহ্ন। এরা কারা! এরা হলো পথবাসী মানুষ। বাড়িঘর নেই, পথই যাদের ঠিকানা, ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে সংসার-গৃহস্থালি, জীবনযাপন; মাথার ওপর কোনো স্থায়ী আচ্ছাদন নেই যাদের তারাই পথবাসী। যারা রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, নদীবন্দর, খোলা মাঠ-ময়দান, স্টেডিয়াম, পার্ক, মুক্ত প্রাঙ্গণ, হাটবাজার, শপিং মল, দরবার, মাজার এবং বিভিন্ন স্থাপনার সিঁড়ি ও বারান্দায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করে, তাদেরও আমরা পথবাসী বলে অভিহিত করি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়, ভূমিহীনতা, জমির উত্পাদনক্ষমতা হ্রাস, উত্পাদনমুখী কর্মকাণ্ডের বিস্তার, বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়া, বেকারত্ব, শোষণ-বঞ্চনা, প্রভাবশালীদের অত্যাচার, মহাজনী ঋণ প্রভৃতি কারণে সর্বস্বহারা মানুষ জীবিকার অন্বেষণে ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসে। দিশাহারা মানুষের মিছিলটা ক্রমে দীর্ঘ হয়। তাদের মধ্যে যাদের ভাগ্য প্রসন্ন, তারা কোনো বস্তিতে আশ্রয় পায় আর অন্যরা হয় আশ্রয়হীন পথবাসী। স্বল্প আয়ের চাকরিচ্যুত ও বস্তি থেকে উচ্ছেদের কারণেও অনেকে পথবাসী হয়। সরকারের বিভিন্ন নীতিমালায় ও নথিপত্রে তাদের ভাসমান, চালচুলাহীন মানুষ বলে গণ্য করা হয়েছে। এরা সাধারণ পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী, রিকশা, ভ্যান ও ঠেলাগাড়ি চালক, ভাঙাড়ি, কুলিমজুর, হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিক, হাটবাজারের মিন্তি, টোকাই ও ফেরিওয়ালার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পথবাসীদের মধ্য থেকে মুষ্টিমেয় কয়েকজন কোনো কাজের সন্ধান না পেয়ে, উপায়ন্তর না দেখে যৌনকর্মী, মাদক ব্যবসায়ী, কেউ কেউ ছিঁচকে চোর এবং পাতি মাস্তানদের সাগরেদ হিসেবেও কাজ করতে বাধ্য হয়। এসব পেশার বাইরে অনেকে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে।
ব্যাপক অর্থে পথবাসীদের দ্বারা নগরবাসী উপকৃত হয়। নগর পরিচ্ছন্নতায় পথবাসীদের ভূমিকা অপরিসীম। গৃহকর্মী, মুটেমজুর, পরিবহন শ্রমিক ইত্যাদি পেশায় তারা আমাদের যে সেবা ও পরিচর্যা করে, তা নগরবাসীর জন্য অপরিহার্য এবং আয়েশি ও বিলাসী জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। সুতরাং আমাদের স্বার্থেই পথবাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে নিরাপদ আশ্রয়সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আয়োজন করা সবার কর্তব্য এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নগর উন্নয়নে পথবাসীদের অপরিমেয় অবদানের স্বীকৃতি প্রদান।
তাদের উন্নয়নে কতিপয় সুপারিশ হলো— বাংলাদেশের নগরবাসী হিসেবে পথবাসীদের পরিসংখ্যান তৈরি ও তালিকা প্রণয়ন, নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা এলাকাভিত্তিক পথবাসীদের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, নগরের অঞ্চল/এলাকাভিত্তিক পথবাসীদের স্থায়ী/অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন, পথবাসীদের জন্য জন্মনিবন্ধন পত্র, ভোটার আইডি কার্ড এবং জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রমের আওতায় পথবাসীদের সম্পৃক্তকরণ, সরকারি-বেসরকারি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পথবাসীদের সম্পৃক্তকরণ ও পথবাসীদের গ্রামে প্রত্যাবর্তনের জন্য গ্রামভিত্তিক আর্থ-সামাজিক ও অন্যান্য কার্যক্রমে সম্পৃক্তকরণ প্রভৃতি।
লেখক : গবেষক

