কৃষিবিদ মুহা. আজহারুল ইসলাম
কৃষি আবহমান বাংলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মূল চালিকাশক্তি। খাদ্য শক্তি, শ্রমশক্তি, প্রাণশক্তি ও মেধাশক্তি একটি অন্যটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং এসব শক্তির প্রধান উৎস হলো কৃষি। এ দেশের উর্বর পলি মাটি ও জলবায়ু ফলস উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এদেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৪ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষিখাতের অবদান প্রায় ১৫.১৬ শতাংশ। এছাড়া সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এখাতে পরোক্ষ অবদানও রয়েছে। কৃষক ও কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সরাসরি জড়িত। তাই খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও মাঠ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কৃষির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।
কৃষি খাত আজ বহুবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি কৃষির অগ্রগতিতে বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ করে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কৃষি খাতকে অধিকতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করছে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্পদশালী অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফসল-আকস্মিক বন্যা, বিলম্বিত বর্ষা, হঠাৎ অতিবর্ষণ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সংকুচিত শীত মৌসুম, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাবে বিপর্যয় মারাত্মক আকার ধারন করছে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেড়ে যাচ্ছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেড়ে গেলে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। গ্রিনহাউজ ইফেক্টের ফলে ওজন স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে দশমিক চার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বাড়ছে যার ফলে ঘূর্ণিঝড়ের মাত্রাও বাড়ছে। তাছাড়া সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর চার মিলিমিটার বাড়ছে যা বিশ্ব হারের চেয়ে বেশি।
কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন এবং গণমানুষের ক্ষুধা নিবারন ও জীবন যাত্রার মান বাড়ানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন-সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষির উন্নতি ছাড়া মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হবে না। কৃষকেরাই এদেশের প্রাণ। রৌদ্রতাপে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রম করে বাংলার প্রত্যেকটি মানুষের মুখে অন্নের যোগান দেয় এদেশের হতদরিদ্র কৃষকেরা। তাই বঙ্গবন্ধু কৃষক-শ্রমিকদের সবসময় স্থান দিয়েছেন নিজের মনের মনিকোঠায়, সর্বোচ্চ স্তরে। বাংলার প্রত্যেক মানুষের জীবনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের জন্য সার্বক্ষণিক ভাবনা ছিল রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে। আজীবন সংগ্রাম করেছেন এদেশের শোষিত, বঞ্চিত, অবহেলিত কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। নিজের স্বপ্নের উত্তর নিজের কথাতেই প্রতিধ্বনিত হয়-১৯৭২ সালের মে মাসে রাজশাহীর এক সভায় ‘আমি কি চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কি চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কি চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসে-খেলে বেড়াক। আমি কি চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’
স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার প্রথম সভায় কৃষকদের জন্য নিলেন এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। তাদের সমস্ত বকেয়া খাজনা ও সুদ মওকুফ করে দিলেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরতরে মওকুফ করার ঘোষণা দিলেন। দেশের সর্বত্র ভূমিহীন ও দরিদ্র চাষিদের মধ্যে চার বিঘা করে খাস জমির বন্দোবস্ত করা, পাকিস্তান আমলের ঋণগ্রস্ত কৃষকদের উপর জারি করা ১০ লক্ষাধিক সার্টিফিকেট মামলা তুলে কৃষককুলের ভাগ্য উন্নয়নে রাখলেন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার ২২ লাখ কৃষককে পুনর্বাসিত করেছিলেন। কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া আনার পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ব জার্মানি থেকে ৩৮,০০০ সেচ যন্ত্র আমদানি করা হয়। ৪০,০০০ শক্তি চালিত লো লিফ্ট পাম্প, ২৯০০টি গভীর নলকূপ ও ৩,০০০টি অগভীর নলকূপ স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া ফিলিপাইন থেকে আইআর-৮ জাতের উচ্চ ফলনশীল ধানের ১৬,১২৫ টন উচ্চ ফলনশীল ধান বীজ আমদানি করা হয়। অন্যান্য দেশ থেকে ১,০৩৭ টন উফশী গম বীজ আমদানি করে কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়। কৃষকরা যাতে সহজভাবে কৃষি ঋণ পেতে পারে এ লক্ষ্যে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় এ দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও সেচ সুবিধা উন্নয়নের জন্য নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এ দেশের গরীব কৃষকদের কথা চিন্তা করে গরু আমদানির কথা বলেছিলেন। তাঁর সময়ে জমি চাষাবাদের জন্য বিদেশ হতে উন্নতমানের ট্রাক্টর আমদানি করা হয়েছিল এবং খণ্ড বিখণ্ড জমি একীভূত করে সমবায় পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। তিনি জনগণকে বৃক্ষ রোপণ, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন, মাছ চাষসহ নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর সময় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (জুলাই ১৯৭৩-জুন ১৯৭৮) প্রণয়ন করা হয়। এতে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করায় এ দেশের সার্বিক কৃষি ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। তার সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে শতকরা ৩১ ভাগ অর্থ কৃষি খাতে ব্যয় করেছিরেন। বঙ্গবন্ধুর বাস্তব ও গতিশীল পদক্ষেপের ফলে মাত্র দু’বছরের মধ্যে কৃষিতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছিলো ৭ শতাংশ। ১৯৭১-৭২ সালে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৮৭.৫ লাখ টন যা ১৯৭৫-৭৬ সালে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১৩ লাখ টন। সদ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর সেই উচ্চারণ ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের মতো এত উচ্চমূল্যে, এতো ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় জীবন ও দুর্ভোগ আর কোন দেশের মানুষকে ভোগ আর করতে হয় নাই। আপনারা সবাই মিলেমিশে কাজ করুন। তাহলেই দেশে সুখ-স্বাচছন্দ্য ও শান্তি আসবে। বাংলাদেশে এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি রাখা হবে না। নিরসল কাজ করে দেশে কৃষি কাজ দেশে কৃষি বিপ্লব সাধন করুন।’ বঙ্গবন্ধুর এ কথার প্রতিফলন বাঙালি জাতি দিতে শুরু করে।
শত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে দেশ যখন সোনার বাংলা নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছিল তাকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে সপরিবাররে নিহত হন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু। প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, ক্ষমতালিপ্সু পাকিস্তানি প্রেতাত্মার পরিবিষ্ট সেনাবাহিনীর একাংশ স্বাধীনতার চেতনাকে ধ্বংসের নানান কৌশল অবলম্বন করে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশটাকেই ধ্বংসের চক্রান্ত করতে থাকে সামরিক, বেসামরিক, মেকি গণতন্ত্রের মুখোশধারী আমলারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাংলাদেশ যাতে পুনরুজ্জীবিত হতে না পারে এ জন্য বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব শূন্য করার অশুভ পদক্ষেপ নিতে থাকে। ফিরে আসে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাময় ভবিষ্যৎবাণীঃ ‘ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবেই বাংলাদেশ টিকে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে এমন কোন শক্তি নেই।’ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্ব ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই শুরু হয় নতুন উদ্যমে পথ চলা। ১৩ কোটি মানুষের দুর্ভাগা হাভাতের দেশে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেন উন্নয়নের। ফলে ২০০০ সালের মধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় বাংলাদেশ। বাড়তে থাকে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা। বাঙালি জাতি ফিরে পায় হৃত গৌরব। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত করে। এর স্বীকৃতিস্বরূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষিসংস্থা কর্তৃক ‘সেরেস’ পদকে ভূষিত করা হয়।
২০০২ সালে আবারো স্বাধীনতা বিরোধী, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের চক্রান্তে ৭ বছরের জন্য পিছিয়ে যায় বাংলাদেশ।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সারের দাম প্রায় ৭৫ ভাগ কমিয়ে দেন। সরকার সার ব্যবহার সুষম ও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে দাম ভর্তুকিমূল্য নির্ধারণ করেছে যা বর্তমানে নিম্নরূপঃ
বীজ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, শস্য বহুমুখিকরণসহ নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ৬০% ভর্তুকি, জলাবদ্ধ হাওড় ও দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষুদ্রসেচ ব্যবস্থা চালু, আইলা পুনর্বাসন, আউশ প্রণোদনা প্যাকেজ, কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তি জনগণের দোরগোড়ায় নেয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অভিযোজন কার্যক্রম, পাট ও পাটের রোগের জেনোম সিকোয়েন্স, ট্রান্সজেনিক আলু, বেগুন, ধান ও তুলার জাত উদ্ভাবন করা হয়। কৃষকের জন্য ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ১ কোটি ৪০ লাখ কৃষক পরিবারকে দেয়া হয়েছে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড। ফলে খাদ্য শস্যের উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। বিশ্বে চাল উৎপাদনে চতুর্থ, পাট উৎপাদনে ২য়, আলু উৎপাদনে ১০ম, সবজি আবাদে ৩য়, ফল আবাদে ৫ম, মাছ উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ স্থান দখল করেছে। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণে এগিয়েছে বাংলাদেশ। নিচের সারণিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বৃদ্ধির তথ্য দেখা যেতে পারেঃ
মেধাসম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে উঠেছে নতুন প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধু আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ ও স্বপ্ন বেঁচে আছে। আর আছে সোনার বাংলাদেশ এবং তার সাহসী কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতা এনে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, রক্তে অর্জিত দেশটি আমরা সোনার বাংলায় পরিণত করবো। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নকে আমাদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গঠনের লক্ষ্যে গৃহীত পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে সুবিধাবঞ্চিত ও সম্ভবনাময় জনশক্তিকে উন্নয়ের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য।
‘আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পিছনে নিয়োজিত করতে হবে।’- বঙ্গবন্ধুর এ অমর কথার স্বার্থক বাস্তবায়নে নিবেদিত ভূমিকা রেখে চলেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আমাদের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী যথার্থভাবেই নির্বাচন করেছেন একজন যোগ্য সহকর্মী। বঙ্গবন্ধুর সেই অমীয় বাণী নিশ্চয়ই মনে রেখেছিলেন ‘আন্দোলন গাছের ফল নয়। আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের নিঃস্বার্থ কর্মী থাকতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার। আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার।’
নিঃস্বার্থ, ত্যাগী একজন সহকর্মী কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কাজগুলো সহজতর হচ্ছে। আমাদের বিজ্ঞানী-প্রযুক্তিবিদ, কৃষক এবং সরকার এই তিনের চমৎকার বোঝাপড়ায় কৃষিখাত এগিয়ে চলছে। গবেষণাকেন্দ্রসমূহ যেমনঃ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট জিঙ্ক সমৃদ্ধ জাতসহ নানাবিধ নতুন ৩০টি ধানের জাত ছাড় করেছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ৯০টি ফসলের জাত ও ১১০টি সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। জিএমও ফসলের মাধ্যমে বালাইনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ ঠিক রাখছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ধানসহ নয়টি বিভিন্ন ফসলের ৩৪টি জাত, বাংলাদেশ চিনিশস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) ৬টি নতুন জাতের আখ, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট জেনোম সিকোয়েসিংসহ ৬টি নতুন জাতের পাট, তুলা উন্নয়ন বোর্ড তুলার কয়েকটি জাত ছাড় করেছে এ সময়কালে। বিএডিসি দেশের চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উন্নতমানের বীজ সরবরাহ করে চলেছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, এনজিও বীজ উৎপাদন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর ও বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার: রাশিয়া, থাইল্যান্ড, ভুটান, বেলারুশ, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, আমেরিকা, জর্ডান, শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, নেদারল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত রয়েছে।
জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের যে বিষয়গুলো সামনে রেখে লক্ষ্য অর্জনে এগেিয় যাচ্ছে সেগুলো হলো:
কৃষিশিক্ষা গবেষণা এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা,
আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে পেশা হিসেবে কৃষি জীবিকা নির্বাহে স্তর থেকে বাণিজ্যিক স্তরে উন্নীত হওয়া,
ভূগর্ভস্থ পানি এবং কৃষি রসায়ন (কীটনাশক, বালাইনাশক, আগাছানাশক) ব্যবহারে সাবধানী হওয়া,
বৈরী পরিবেশে অভিযোজন উপযোগী এবং এলাকা-উপযোগী ফসল ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা,
হাওর ও জলাবদ্ধ পরিবেশ দূরীকরণে লাগসই এবং সুদূর প্রসারী পানি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা,
মাটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সাপেক্ষে বহুবিধ ফসলবিন্যাস চালু করা,
শস্যবীমা, হাঁস, মুরগি ও গবাদিপশু বীমার ব্যবস্থা করা,
যথাযথ কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনা চালু করা,
খামার যান্ত্রিকীকরণ ও যান্ত্রিক কৃষি শিল্প গড়ে তোলা,
দুধ, ডিম, মাংস, মাছ, দুগ্ধজাত পণ্যসামগ্রী, মুরগি, গবাদিপ্রাণী উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীল হওয়া,
কৃষি এবং কৃষিজাত পণ্য রপ্তানীকরণে বিশেষ উদ্যোগী হওয়া।
বঙ্গবন্ধু কন্যা তার বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত জমির দেখভাল করেন। তাকে সহযোগিতা করেন মি. বৈকুণ্ঠ নাথ বিশ্বাস। টুঙ্গীপাড়ায় সরকারিকাজে এবং সাংগঠনিক কাজে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সুযোগ হয়েছিল কৃষকরতœ শেখ হাসিনা জমিতে সার, বীজ, সেচ ও ফসলের তথ্য নেন। মাটির কাছাকাছি যিনি থাকেন তার চেয়ে কে বেশি কৃষক দরদী হতে পারে?
কৃষিখাতের উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে যে বিনিয়োগ এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দরকার সেক্ষেত্রে আরও উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। দেশের খাদ্য চাহিদাপূরণ, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে আমাদের কৃষিখাতকে আধুনিকায়ন, কৃষিতে মূল্যসংযোজন বৃদ্ধি, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের সমস্যাগুলোর সমাধান ও ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ আবশ্যক। জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশের হাল ধরেছেন। তিনি সব হারিয়ে আমাদের মাঝে একজন এতিম মমতাময়ী রাষ্ট্রনায়ক। আমাদের উচিত তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে এগিয়ে নেয়া। আমাদের ধর্মে আছে ‘এতিমের হক যারা তসরুফ করে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ পাবে না।’ এতিমদের সম্পদ গ্রাস না করতে ইসলাম বার বার তাগাদা দিয়েছে। আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করার যে সংগ্রাম চলছে তাতে শরীক হই। আমরা এমন একজন দেশপ্রেমিক নেত্রী পেয়েছি যাকে নিয়ে কবি লিখেন-
‘শেখ হাসিনা, হাসতে জানে, কাঁদতে জানে, ছল জানে না, দেশের তরে দশের তরে, আপোষ করে না।’
লেখক : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ বিএডিসি ও সভাপতি, বিএডিসি কৃষিবিদ সমিতি।

