কর্নেল (অব.) অধ্যাপক ডা. জেহাদ খান
যুগে যুগে সাধারণ মানুষ নবীদের কাছে তাদের সত্যবাদিতার প্রমাণ হিসাবে অলৌকিক জিনিস দাবী করেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা তার জবাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলি মানুষকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে বলেছেন। যেমন মেঘ থেকে বৃষ্টি হওয়া, পাহাড় সৃষ্টি, গাছ থেকে ফল হওয়া, মায়ের পেটে মানব শিশুর বিকাশ। তেমনি একটি নিদর্শনের কথা তিনি বলেছেন মরুভূমির উট (সূরা গাসিয়া, আয়াত-১৭)। এর শারিরিক গঠন ও চালচলন মরুভূমির জন্য খুবই উপযোগী এবং মহান সৃষ্টিকর্তার এক অপূর্ব নিদর্শন।
এর বৈশিষ্টগুলো সংক্ষেপে নিন্মরূপ:
কুজ্ব (Hump) : চর্বি দিয়ে পূর্ন থাকে যার উচ্চতা ৩০ইঞ্চি ও ওজন ৩৬ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এটা তার খাদ্য ভান্ডার যার বদৌলতে সে এক মাস খাবার ছাড়া এবং দু-তিন সপ্তাহ পানি ছাড়া চলতে পারে। এ অবস্থায় তার ৩৩% পর্যন্ত শরীরের ওজন কমতে পারে। অথচ একই রকম পরিস্থিতিতে মানুষের ৮% ওজন কমলে ৩৬ ঘন্টার মধ্যে সে মৃত্যূবরন করতে পারে।
মাথা : অন্য গৃহপালিত প্রাণীর তুলনায় ছোট, কোন শিং নেই, ছোট কান এবং বড় বড় চোখ যা অনেক দূরে এবং বিভিন্ন দিকে দেখতে পারে (মরুভূমির জন্য উপযোগী)।
ঘাড় : লম্বা ও বাকা যেন উচু গাছের নাগাল পেতে পারে।
মুখ : মুখে কোন গ্রন্থি (Gland) নেই এবং খুবই শক্ত যা মরুভূমির কাঁটাযুক্ত গাছ খেতে পারে। উপরের ঠোট ভাগ করা যা পৃথকভাবে খোলা ও বন্ধ করা যায়(কাঁটাযুক্ত গাছ বাছার ক্ষেত্রে সহায়ক)।
চোখের ভ্রু : চোখের ভ্রু খুব ঘন এবং দুই স্তরের লম্বা Eye lash আছে যা চোখকে মরুভূমির বালি থেকে রক্ষা করে।
নাকের ছিদ্র : বেশ মাংসল। সম্ভবত একমাত্র প্রাণী যে তা ইচ্ছামত খুলতে পারে ও বন্ধ করতে পারে, যা মরুঝড়ে ধুলাবালি থেকে প্রতিরোধ করে।
চর্ম : বেশ পুরু এবং শক্তভাবে নীচের tissue র সাথে সংযুক্ত, যা সূর্য রশ্মি প্রতিফলিত করে এবং মরুভূমির প্রচন্ড তাপ থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়। অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর শরীরের চর্বি সমস্ত দেহে চামড়ার নিচে ছড়ানো থাকে। উটের চামড়ার নিচে চর্বি থাকে না, যা ঘাম নিঃস্বরন ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনে সহায়তা করে।
পায়ের পাতা : দুটি শক্ত আঙ্গুলের উপর ভর করে হাটে। আঙ্গুলের সাথে চারটি চর্বিযুক্ত বল সংযুক্ত যা হাটার সময় ছড়িয়ে পড়ে এবং বালির ভিতর পা আটকে যাওয়া প্রতিরোধ করে।
লম্বা পা : মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর গরম থেকে আরোহীকে দূরে রাখে। এর চলার ভঙ্গি অন্য চতুষ্পদ জন্তু থেকে আলাদা। এক সাইডের দুই পা একই সময় সামনে যায় তারপর অন্য সাইডের দুই পা সামনে যায়, যা মরুভূমির বালুতে চলতে সহায়ক। উটের পা খুবই শক্তিশালী যার ফলে সে ১০০০পাউন্ড ওজন বহন করতে পারে। দিনে ১০০মাইল পর্যন্ত হাটতে পারে এবং ঘন্টায় ২৫ মাইল দৌড়াতে পারে।
জিহ্বা : জিহ্বার উপরে ও চারপাশে ছোট অসংখ্য শক্ত papillae দিয়ে ঢাকা যেন মরুভূমির কাঁটাযুক্ত খাবারে তা ক্ষত বিক্ষত না হয়।
পাকস্থলী : পাকস্থলী তিন প্রকোষ্ট বিশিষ্ট। অন্যান্য জাবর কাটা প্রাণীর পাকস্থলী চার প্রকোষ্টের। উটের তিনটি প্রকোষ্ট কেন তার কারণ জানা যায় নাই।
কিডনী : খুবই শক্তিশালী। পেশাবে পানি খুব কম বের হয় এবং তা ঘন সিরাপের মত।মল : এত শুকনা যে তা দিয়ে আগুন জালানো যায় (পানিশূন্য)।
ব্রেইন : ঘাড়ে rate mirabile নামক আরটারী ও ভেইনের সংমিশ্রন আছে যা শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রাতে ও ব্রেইনের তাপমাত্রাকে সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রন করে ঠান্ডা রাখে।
লোহিত কনিকা : স্তন্যপায়ীর লোহিত কনিকা গোলাকার। শুধু উটের লোহিত কনিকা ডিম্বাকৃতির (oval) যা পানিশুন্য অবস্থায় রক্ত চলাচলে সহায়তা করে। এর আবরনীও বেশ মজবুত যা অল্প সময়ে উট অনেক পানি পান করলে যে osmotic variation হয় তা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে ও আবরনী ফেটে যায় না।
শরীরের তাপমাত্রা : যখন বাইরের তাপমাত্রা শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়, তখন অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর ঘাম নির্গত হয়ে শরীর ঠান্ডা হয়। কিন্তু উট এর ব্যতিক্রম। বাইরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে এর শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় (সর্বোচ্চ ১১˚সেঃ পর্যন্ত)। এটাই হচ্ছে প্রধান উপায় যার মাধ্যমে উট মরুভূমিতে তার শরীরের পানি সংরক্ষন করে থাকে। মরুভূমির চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় উটের শরীরের তাপমাত্রা রাতে ৩৪˚সেঃ এ নেমে আসে এবং দিনে ৪১˚সেঃ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অন্যান্য প্রাণীর পক্ষে শরীরের তাপমাত্রার এত তারতম্য হলে জীবন বিপন্ন হতে পারে।
পানিশূন্যতা : অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে পানি শূন্যতায়, পানি শরীরের tissue এবং blood plasma থেকে বের হয়ে আসে। ফলে রক্তের ঘনত্ব বেড়ে যায় এবং হৃদপিন্ডের পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। উটের বেলায় খুব কম পানি রক্ত থেকে বের হয়, ফলে রক্ত তরল থাকে। উট ৩০% পর্যন্ত পানি শূন্যতায় চলাচলে সক্ষম যা অন্যান্য প্রাণীর পক্ষে অসম্ভব। উটের শরীরের পানি পূরনের ক্ষমতাও প্রচন্ড। একমাত্র উটই এক মিনিটে ১০-২০ লিটার পানি পান করতে সক্ষম। পানি শূন্যতায় অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় উট শ্বাস-নিঃশ্বাস কম নিয়ে থাকে যাতে পানি শরীর থেকে বের হতে না পারে।উটের নাকের ঝিল্লিতে নিঃশ্বাসের সাথে নির্গত অনেক জলীয় বাষ্প আটকে যায় এবং শরীরে আবার ফিরে আসে। এভাবে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে যে পানি নির্গত হয় তা কমে আসে।
উটের দুধ : বেদুঈনদের পছন্দনীয় পানীয়। গরুর দুধের চেয়ে বেশী পুষ্টিকর, এতে পটাশিয়াম, আয়রন এবং গরুর দুধের চেয়ে ৩গুন ভিটামিন সি আছে। মরুঅঞ্চলে ফল ও সবজি খুবই অপ্রতুল। কাজেই উটের দুধ মানুষের ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ করে থাকে। পানিশূন্য অবস্থায় মরুভূমিতে দীর্ঘ পথ চলার পরও উটের দুধে পানির পরিমান হ্রাস পায় না। উট শাবক যথেষ্ট দুধ পান করার পরেও উটনী ৪-৯ লিটার অতিরিক্ত দুধ দিয়ে থাকে। উট মরু অঞ্চলের মানুষের জন্য দুধ, মাংস ও বাহন এই তিনটি কাজেই উপকারী জন্তু হিসাবে বিবেচিত।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune system) : গরু এবং ছাগলের তুলনায় উটের রোগ অনেক কম হয়ে থাকে। এর Immune system খুবই ব্যতিক্রমধর্মী। এর Immunoglobulin দিয়ে যে antibody তৈরি হয় তাতে light chain থাকেনা। এটা কিভাবে মরুভূমির কঠিন পরিবেশে উটের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ঠিক রাখে তা এখনও জানা যায় নাই। “তোমাদেরকে খুবই কম জ্ঞান দান করা হয়েছে” (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-৮৫)
উটের বিশেষ ব্যবহারিক বৈশিষ্ট: উট অতি প্রত্যুষে মরুভূমির বালি গরম হওয়ার পূর্বে মাটিতে বসে। বসার সময় পাগুলো শরীরের নিচে বিছিয়ে দেয় যেন মাটি থেকে তাপ শরীরে আসতে না পারে। সে সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে যাতে শরীরের নূনতম অংশ উত্তপ্ত হয়। একপাল উট বিশ্রাম করার সময় পাশাপাশি শুয়ে থাকে যেন শরীরের অল্প অংশ তাপ গ্রহন করতে পারে। শরীরের উচ্চ তাপমাত্রাতেও এর metabolic rate স্বাভাবিক থাকে।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, উটকে মরুভূমির কঠিন পরিবেশে চলার জন্য বিশেষভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। একজন বুদ্ধিমান লোকের জন্য উটের অপূর্ব সৃষ্টি তার মহান স্রষ্টাকে চেনার জন্য যথেষ্ট। ‘নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৯০)।
লেখক : এমডি, এমসিপিএস, এফসিপিএস, এফআরসিপি (গ্লাসকো), এফএসিসি (ইউএসএ)
পোস্ট ফেলোশিপ ট্রেনিং ইন কার্ডিওলজি (জার্মানি ও ইন্ডিয়া), মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও কার্ডিওলজিস্ট
এক্স ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট অ্যান্ড ইলেকট্রোফিজিওলজিস্ট, সিএমএইচ, ঢাকা।

