ঢাকাWednesday , 5 July 2017
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অ-স্বাধীনতার পথে ভারত

Link Copied!

অমর্ত্য সেন
ভারতের সহিষ্ণুতা ও ধর্মবৈচিত্র্য কি এখনও অক্ষুণ্ন? আজকের ভারতে যখন আমরা চারপাশে তাকাই, সহিষ্ণুতার চিহ্নগুলো যেন দ্রুতই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। যে দেশ অতীতে বিদেশে প্রাণভয়ে ভীত জনগোষ্ঠীকে নিজেদের বিশ্বাস, চর্চা ও খাদ্যাভ্যাসসহ এখানে অভিবাসনের সুযোগ দিয়েছে, সেই দেশে এখন উন্মত্ত মানুষের পাল গরু-খাওয়া মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং তাদের হত্যা করছে। হত্যার শিকার মানুষগুলো খুবই দরিদ্র। চামড়া শিল্পে তাদের কর্মসংস্থানও যেন গরুর পবিত্রতায় বিশ্বাসীদের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বলা হয়ে থাকে, বিশ্বাসের শক্তিতে নাকি পর্বতও নড়ানো যায়। আমাদের যখন আসলেই পর্বত নড়ানো দরকার_ তখন বিশ্বাসের এই ভূমিকা উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু আমাদের নিত্যদিনের জীবনে যুক্তির বদলে প্রশ্নহীন বিশ্বাসের ওপর নির্ভরতা আধুনিক জীবনযাপনের জন্য বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধও বিষয়টি বলে গেছেন। এ ছাড়া পরস্পর আলোচনা এবং বিতর্ক লড়াই ও রক্তপাতও কমাতে পারে। নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাস উত্তম বিষয়, দান ও সমাজসেবার মতো অনেক কিছু অর্জন হতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে বিশ্বাস অন্যের কথা শোনার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। নেতিবাচক বিষয়ে বিশ্বাস নৃশংসতা ও পাইকারি হত্যাকাণ্ড উস্কে দিতে পারে।
যে দীর্ঘ কালো অধ্যায় পাঁচ শতকের বেশি সময় মধ্যযুগীয় ইউরোপকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তা উৎসারিত হয়েছিল বিশ্বাস থেকে_ নিজের ধর্মীয় মতের বাইরের অন্যদের শাস্তি দেওয়ার ও এর হোতাদের হত্যা করতে স্বভাবিত দায়িত্ব থেকে। আমি বিভিন্ন সময় যুক্তি দেখাতে চেয়েছি, সুনির্দিষ্টভাবে একটি বিতর্কপ্রিয় সংস্কৃতির বাহক ভারতীয় উপমহাদেশ সেদিক থেকে সৌভাগ্যবান। ভারতীয়দের বিতর্কপ্রিয়তা হয়তো ধর্মবৈচিত্র্যের প্রতি সহিষ্ণুতা উৎসাহিত করে থাকতে পারে, বিতর্ক ও আলোচনা সহিংস সংঘাত হ্রাস করে থাকে।
ঐতিহাসিকভাবেই ভারত বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাণভয়ে ভীত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। প্রথম শতক থেকে তাড়া খাওয়া ইহুদিদের, চতুর্থ শতক থেকে নিগৃহীত খ্রিস্টানদের, সপ্তম শতক থেকে পলায়নপর পার্সিয়ানদের এবং উনিশ শতক থেকে নিপীড়িত বাহাই সম্প্রদায়ের মানুষকে আশ্রয় ও মাথার ওপর নতুন ছাদ দিয়েছে ভারত।
প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের সহিষ্ণুতা ও ধর্মবৈচিত্র্য কি এখনও অক্ষুণ্ন? আজকের ভারতে যখন আমরা চারপাশে তাকাই, সহিষ্ণুতার চিহ্নগুলো যেন দ্রুতই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। যে দেশ অতীতে বিদেশে প্রাণভয়ে ভীত জনগোষ্ঠীকে নিজেদের বিশ্বাস, চর্চা ও খাদ্যাভ্যাসসহ এখানে অভিবাসনের সুযোগ দিয়েছে, সেই দেশে এখন উন্মত্ত মানুষের পাল গরু-খাওয়া মানুষকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং তাদের হত্যা করছে। হত্যার শিকার মানুষগুলো খুবই দরিদ্র। চামড়া শিল্পে তাদের কর্মসংস্থানও যেন গরুর পবিত্রতায় বিশ্বাসীদের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এমনকি ক্রিকেট ম্যাচে আপনি কোন পক্ষের, সেটাও ‘রাষ্ট্রদ্রোহে’র অবিশ্বাস্য অভিযোগে আপনার আটকের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই রাষ্ট্রদ্রোহের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা, যারা পুলিশকেও নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ এটা সুপ্রিম কোর্টের সেই আদেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন; যেখানে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের সহিংসতা বরং রাষ্ট্রদ্রোহ হতে পারে। পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের বদান্যতায় আমরা প্রচুর রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা পাচ্ছি। উপরন্তু সেই মামলায় পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থাতেও আপনি প্রহারের শিকার হতে পারেন। কীভাবে, সেটা কানাইয়া কুমার বলতে পারবেন।
সহিষ্ণুতার ভারতীয় ঐতিহ্যের এই অবদমনে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি স্পষ্টতই বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এখন এটাই বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে ভারতের রাজনৈতিক আবহাওয়া কতটা অসহিষ্ণুতা সহ্য করতে পারে! মনে হচ্ছে যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষ কিছু একটা ঘটার জন্য হাত-পা গুটিয়ে অপেক্ষা করছে। উপরন্তু স্পষ্টতই উদার কিছু মানুষও বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এই প্রত্যাশায় যে নরেন্দ্র মোদি সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার থেকে ভালো কিছু হবে। যে অর্থনৈতিক সংস্কারকে দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে ‘সংস্কারের ভ্রান্তি’। অন্যদিকে দেশটি অসহিষ্ণুতা ও অ-স্বাধীনতার মইয়ে ক্রমেই নিচের ধাপে নেমে যাচ্ছে।
আমাদের স্বীকার করতে হবে যে ভারতীয় সমাজ বিশ্বাস ও চর্চার যে স্বাধীনতা ভোগ করে, তার সবসময়ই প্রতিরক্ষা ও সমর্থনের প্রয়োজন হয়। এখানে আইন লঙ্ঘনের বিরোধিতা করেই আইন রক্ষা করতে হয়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ভারত সেটা করেছেও। চলি্লশের দশকের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ভয়াবহ রক্তপাত দেখে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা প্রতিরোধ গড়েছেন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েছেন। বিশেষভাবে মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন; বড় ধরনের ব্যক্তিগত ত্যাগ ও বিপুল ঝুঁকি নিয়ে। তিনি নিজের জীবন দিয়ে লড়েছেন এবং বিজয়ী হয়েছেন।
আমাদের এখন মহাত্মা গান্ধী বা জওহরলাল নেহরুর মতো নেতা নেই; জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো নেতাও নেই। কিন্তু এখন বিরোধী দলে যারা আছেন, তারাই কি যথেষ্ট নন? তারা কি ভারতের সহিষ্ণুতা ও ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারেন না? মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও কংগ্রেস তার প্রতিবাদী ভূমিকার পুরস্কার পেয়েছে। এখন যে দলটি সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত, পরিস্থিতি কি এতটাই পাল্টে গেছে?
ভারতে এখন যে লড়াইয়ের দরকার, তা হচ্ছে অন্তর্দৃষ্টির লড়াই। কিছু চালাকির লড়াই নয়। গণতন্ত্র, সহিষুষ্ণতা, সমমর্যাদার লড়াই। এর পেছনে থাকে যুক্তি ও ঐতিহ্য।

লেখক : নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তরিত