ড. মো. শাফায়েত হোসেন
বীজ কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা কৃষির সামগ্রিক উন্নতি নির্ভর করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের উপর। যদিও এদেশের কৃষকগণ পূর্ববর্তী বছরে উৎপাদিত ফসলের রেখে দেয়া একটা অংশ পরবর্তী বছর বীজ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন; কিন্তু সব সময় এ বীজের গুণাগুণ অক্ষুন্ন থাকে না। সময়ের পরিবর্তন এসেছে। ভাল বীজের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারছেন এদেশের সচেতন কৃষক সমাজ। ক্রমবর্ধমান হারে ভাল বীজের চাহিদা বাড়তে থাকে। আর এসবের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে আসছে দেশের অন্যতম প্রধান কৃষি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)।
উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ উৎপাদন বর্ষে ৯৮,২২২ মে. টন দানাশস্য বীজ, ২৬,৩১৫ মে. টন বীজআলুসহ বিভিন্ন ফসলের ১,২৮,৮৬৫ মে. টন বীজ উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়েছে। চলতি ২০১৬-১৭ উৎপাদন বর্ষে মোট বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৩৬,০০০ মে. টন এবং ২০২০-২১ সালে ২,৪৯,৮০০ মে. টন। বীজ নীতির আলোকে বিএডিসি প্রাইভেট সেক্টরে কারিগরি সেবা প্রদানের মাধ্যমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। বীজের বিপুল চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বীজ উৎপাদন ও বিতরণ এখন সরকার তথা বিএডিসি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর বিস্তৃতি ঘটেছে বেসরকারি খাতেও। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন বীজ কোম্পানি ও বীজ সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থা। এক্ষেত্রে বিএডিসি’র অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ কৃষিবিদ কর্মকর্তাদের অবদান অনস্বীকার্য। এদিকে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষ করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশ আণবিক কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ফসলের নতুন নতুন জাত তথা বীজ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবনে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উদ্ভাবিত এ সব প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণে অবদান রেখে চলেছে। সামগ্রিকভাবে বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির ভূমিকাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং সরকারি-বেসরকারি বীজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিককালে বীজ উইংয়ের কর্মকাণ্ড লক্ষ্যণীয়। বীজ এখন শুধু কৃষি উপকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বীজ একটি আধুনিক প্রযুক্তি, একটি শিল্প (Industry) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
তাই বীজকে অগ্রগণ্য শিল্প বা থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে সরকারি পর্যায়ে স্বীকৃতি প্রদান ছিল সংশ্লিষ্ট সকলের দাবি। জাতীয় শিল্পনীতি-২০১০ এ বলা হয়েছে, অগ্রগণ্য শিল্প বা থ্রাস্ট সেক্টর হচ্ছে ঐসব সম্ভাবনাময় শিল্প বা শিল্প উপখাত যা ইতোমধ্যে জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন এবং দারিদ্র বিমোচনে সফলভাবে অবদান রেখেছে। উক্ত শিল্পনীতিতে কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড (Agro-based activity)/ কৃষি-পণ্য (Agro-commodity)/ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প (Food processing industries) এর আওতায় ৩৬টি শিল্পকে তালিকাভুক্ত করা হলেও ‘বীজ শিল্প’কে এ তালিকায় রাখা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত আর্থিক নীতিমালা-২০০৮ এ তালিকাভুক্ত ৩৪টি শিল্পকে কৃষিভিত্তিক শিল্প (Agro-based industries) গ্রুপের আওতাভুক্ত করা হলেও বীজকে অন্তর্ভুক্ত না করে ‘বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ’ নামে ‘কৃষিভিত্তিক শিল্প’ (Agro-based industries) গ্রুপের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক হাইব্রিড বীজ উৎপাদনকে (ধান, ভুট্টা, সবজি ও তরমুজ) অগ্রগণ্য শিল্প (Thrust Sector) হিসেবে তালিকাভুক্ত করায় বীজ শিল্প নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
বীজ শিল্পকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রয়োজন কেন : প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসা/শিল্পে বীজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন এবং দারিদ্র বিমোচনে বীজের বিভিন্ন খাতওয়ারি কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ইতোমধ্যে বীজ শিল্প থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে যথেষ্ট যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রায় ৫০ হাজার চুক্তিবদ্ধ চাষি বা কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার্স বীজ উৎপাদনের কাজে জড়িত। প্রায় ৫ লাখ শ্রমিক বীজ উৎপাদন এবং বিতরণ কাজে নিয়োজিত। ১৬ হাজার বীজ ডিলার বীজ ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তাদের সাথে আরো জড়িত আছেন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার খুচরা বীজ বিক্রেতা। এছাড়া প্রায় ৩শ’ বেসরকারি বীজ কোম্পানি বীজ আমদানি, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ কাজে নিয়োজিত। প্রায় ৩০টি বেসরকারি বীজ কোম্পানিসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বীজ শিল্প সংশ্লিষ্ট সুবিধাদি যেমন বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ (ড্রাইং, ক্লিনিং, গ্রেডিং), সংরক্ষণ ও বীজের মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তা বীজআলু, খাবার আলু ও সবজি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন করেছেন। দেশে ইতোমধ্যে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বীজআলু উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে যা বিদেশ থেকে বীজআলু আমদানিকে নিরুৎসাহিত করছে। টিস্যু কালচার স্থাপনের মাধ্যমে ল্যাবরেটরি সম্পৃক্ত শিল্প যেমন- গ্লাস-ওয়্যার (টেস্ট টিউব, পেট্রিডিস), গ্রোথ-মিডিয়া, ইলাইজা কেমিক্যালস, ডিস্টিল্ট ওয়াটার প্রভৃতি শিল্প উৎসাহিত হচ্ছে। বীজ ও বীজ থেকে উৎপাদিত পণ্য কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্প উন্নয়নে অবদান রাখছে; যেমন-পোলট্রি শিল্পে ভুট্টার ব্যবহার এখন যথেষ্ট ব্যাপকতা পেয়েছে। ফসলের জমি থেকে বীজ সংরক্ষণ পর্যন্ত বেশকিছু শিল্প জড়িত যেমন, খামারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাওয়ার টিলার, উইডার, হারভেস্টার, থ্রেসার ইত্যাদি। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণে বহুল ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি হচ্ছে প্রি-ক্লিনার, ক্লিনার কাম গ্রেডার, ড্রায়ার, ডিহিউমিডিফায়ার মেশিন প্রভৃতি। অতি সম্প্রতি দানাজাতীয় বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণে বিএডিসি’র ৩টি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে অটো সীড প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে, বাংলাদেশে বীজ শিল্পে এটি একটি নতুন সংযোজন। বীজ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি যেমন চটের ব্যাগ, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিইথিলিন, এ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং বীজ পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যেমন ময়েশ্চার মিটার, জার্মিনেটর, এ্যানালাইটিক্যাল ব্যালান্স, বিভিন্ন গ্লাসওয়ার সংশ্লিষ্ট শিল্প বিকাশে অবদান রাখছে। বীজ গুদামে বীজ লট ফিউমিগেশনের জন্য বিভিন্ন ফিউমিগেন্টস এবং ফিউমিগেশন শিটের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বীজ পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত এয়ার কন্ডিশনার, জেনারেটর প্রভৃতি মেশিনারিজ সংশ্লিষ্ট শিল্প বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এসব শিল্প বীজ শিল্পে শুধু যন্ত্রপাতিই সরবরাহ করছে না বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি তথা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র/আলু বীজ হিমাগারে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বা ডিজেলের মাধ্যমে প্রদেয় কর/ভ্যাটের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।
ফসলভিত্তিক বীজের অবদান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, শুধু হাইব্রিড ধানবীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ১০,০০০ মে. টন হাইব্রিড ধানবীজ ব্যবহৃত হচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল এবং মানসম্পন্ন বীজআলুর ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে আলুর ফলন ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। ২০১০-১১ মৌসুমে আলুর ফলন হয়েছে ৮০ লক্ষ মে. টনের বেশি; পরের অর্থবছর থেকে আলুর ফলন বেড়েই চলেছে। ক্রমবর্ধমান হারে উৎপাদিত ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্ব¡পূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া আলুভিত্তিক বেশ কিছু খাদ্য শিল্প দেশে স্থাপিত হয়েছে (ফ্লেকস, স্টার্চ, চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ময়দা ইত্যাদি) যা অর্থনীতিতে গুরুত্ব¡পূর্ণ অবদান রাখছে। আর এসব হচ্ছে ভাল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধির ফল।
অতএব, বীজ শিল্পকে Thrust Sector হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বীজ শিল্পের উন্নতিকল্পে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কাজ করছে ‘বাংলাদেশ সোসাইটি অব সিড টেকনোলজি’। বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব সিড টেকনোলজি’র যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী জনাব দিলীপ বড়–য়া বীজকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দেন যা তখন সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও বীজ শিল্পকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ এখনও নেয়া হয়নি। তাই প্রয়োজন বীজ শিল্পকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন করা। এক্ষেত্রে কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দরকার। উল্লেখ্য, বীজকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে ঘোষণা করা হলে উল্লেখিত অন্যান্য পণ্যের ন্যায় বীজ উৎপাদন ও বীজ শিল্প স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি এবং বীজ রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা/প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এতে বীজ শিল্পের বিকাশ ঘটবে ফলে বিএডিসি কর্তৃক বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বিশেষ করে ভিত্তিবীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাবে; যা দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : উপব্যবস্থাপক (বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিভাগ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন।

