ড. মো. শাফায়েত হোসেন
বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নতি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষির প্রযুক্তিগত মান উন্নয়নে মূল উপাদান হিসাবে বীজের ভূমিকা অপরিসীম। দেশে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে উন্নতমানের বীজ অন্যতম মৌলিক উপাদান। অন্যান্য কৃষি উপকরণ, যেমন সার ও সেচ ইত্যাদি প্রয়োগে আশানুরূপ ফল প্রাপ্তিও উন্নতমানের বীজ ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। দেশের বীজ নীতি কৃষক পর্যায়ে বিভিন্ন ফসলের মানসম্পন্ন বীজের সহজলভ্যতার নিশ্চয়তা বিধান করে। বীজ নীতির উদ্দেশ্য হলো ফসলের উৎপাদন, কৃষকদের উৎপাদনশীলতা, মাথাপিছু আয় এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে সর্বোচ্চমানের উন্নত জাতের ফসলের বীজ কৃষকদের নিকট সহজে ও দক্ষতার সাথে পৌঁছে দেয়া।
উন্নতমানের বীজ কৃষি উৎপাদনের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলেও দেশের কৃষিক্ষেত্রে উন্নতমানের বীজের ব্যবহার এখনও অত্যন্ত সীমিত। এর প্রধান দু’টি কারণ হিসেবে বলা যায় (ক) সরকারি খাতে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও বিতরণ চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম এবং (খ) বেসরকারি খাতে উন্নতমানের বীজ উৎপাদনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। সরকারি ও বেসরকারি খাতে সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করে কৃষকের নিকট সঠিক সময়ে ও যৌক্তিক মূল্যে পৌঁছে দেয়া অতীব জরুরি। বীজ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জাতীয় বীজ নীতিতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। জাতীয় বীজ নীতির ১১নং ধারায় বীজ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য শক্তিশালীকরণের আওতায় জাতীয় বীজ বোর্ড পুনর্গঠনসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ে একটি বীজ উইং প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’র বীজ উইং এবং বীজ অনুমোদন সংস্থা বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (এসসিএ) শক্তিশালীকরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বিএডিসি’র বীজ ও উদ্যান উইং এবং বীজ অনুমোদন সংস্থা (এসসিএ) শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।
বিএডিসি’র বীজ ও উদ্যান উইং শক্তিশালীকরণের অংশ হিসাবে সরকারের নির্দেশনায় “বিএডিসি’র বিদ্যমান সমস্যাসমূহ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন-২০১০”-এর ১৪ জুলাই কৃষি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিএডিসি’র কাজ ন্যায্যমূল্যে মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ বিশেষ করে বীজ, সার, সেচ সেবা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও বীজের মত সংবেদনশীল কৃষি উপকরণ দেশের দরিদ্র কৃষকের নিকট সহজলভ্য করা এবং এর মূল্য কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা জরুরি। অথচ বীজ নীতিতে বলা হয়েছে বিএডিসি’র বীজ উইং যথাসম্ভব বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। বাণিজ্য ও সেবা দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বাণিজ্যের সঙ্গে লাভ বা মুনাফার (Profit) বিষয়টি মুখ্য। সেবার ক্ষেত্রে লাভের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হলেও মুখ্য নয়। একদিকে বলা হচ্ছে বিএডিসি’র বীজ উইং যথাসম্ভব বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে অন্যদিকে বীজের মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি রাখতে হবে-বিষয় দু’টি পরস্পর বিরোধী। বীজ নীতির ১১.২.২ ধারায় বলা হয়েছে-বেসরকারি খাতের সাথে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অন্যান্য বীজ উৎপাদন করতে হবে। এটি কিভাবে সম্ভব? যেখানে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই ভিন্ন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্যই হচ্ছে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে সেবা প্রদান, আর তা করতে হয় জনগনের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা থেকে। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য ব্যবসা করা অর্থাৎ লাভের বিষয়টি সেখানে বিশেষভাবে জড়িত এবং জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা নেই বললেই চলে। যদিও প্রত্যক্ষভাবে তারাও দেশের অর্থনীতিতে যথেষ্ট অবদান রাখছে।
নীতি বা আইন দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা সৃষ্টি করা যায় না, এটি সম্ভব সেবা বা পণ্যের গুনগতমান দিয়ে। বীজের মান খারাপ হলে ভোক্তা তথা কৃষকই বিএডিসিকে প্রত্যাখ্যান করবে। পণ্যের মান ভাল হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে কিনা সেটিও বিবেচ্য। বেসরকারি বীজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রায়শই সরকারি-বেসরকারি বীজ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর কথা বলা হয়। এ দাবিটি কতটুকু যৌক্তিক তা-ও ভাববার বিষয়। প্রসঙ্গত বলা যায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের বিস্তৃতির কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠান টিএন্ডটি’র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত টেলিফোনের ব্যবহার বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তেমনিভাবে ডাক বিভাগের গুরুত্বও বহুলাংশে কমে গেছে বিভিন্ন বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিস কর্তৃক তুলনামূলক দ্রুত সেবা প্রদানের জন্য। এ অবস্থার জন্য কিন্তু আইন প্রয়োগের প্রয়োজন হয়নি।
বীজ নীতির ১১.২.৩ ধারায় বীজের মূল্য নির্ধারণ এবং ভর্তুকির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বিএডিসি’র বীজের মূল্য যথাসম্ভব উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি থাকতে হবে এবং ভর্তুকি ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করতে হবে। বীজের বিক্রয় মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি রাখার বিষয়টি প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবতা বিবর্জিত। বীজ উৎপাদনের জন্য কেজি প্রতি যে খরচ হয় তার সাথে বীজের আনুসঙ্গিক খরচ অর্থাৎ বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বীজ পরীক্ষণ ও বিতরণের কাজে ব্যয়িত খরচ যোগ করলে বীজের বিক্রয় মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি রাখা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বিএডিসি কর্তৃক বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে যে, বীজ সরবরাহের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে এবং ২০২০ সালের মধ্যে জাতীয় চাহিদার ১,২০,০০০ মে. টন (৪০%) দানাজাতীয় শস্যবীজসহ অন্যান্য মোট ১,৯২,২০০ মে. টন মানসম্মত বীজ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্ধিত পরিমাণ এ বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের সিংহভাগ ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে বীজ বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত নিজস্ব আয় থেকে।
বিএডিসি’র ক্ষুদ্রসেচ ও সার ব্যবস্থাপনা উইং-এর সঙ্গে বীজ ও উদ্যান উইং-এর বাজেট তুলনা করলে দেখা যাবে, বীজ ও উদ্যান উইং-এর বাজেটে বীজ বিক্রি থেকে নিজস্ব আয়ের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। উল্লেখ্য, বীজ ক্রয় ও বীজের আনুসঙ্গিক খরচ নির্বাহ ছাড়াও অন্যান্য সকল ব্যয় যেমন অফিস পরিচালনা, মেরামত, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন, সম্পদ সংগ্রহ/ক্রয়, নির্মাণ ও পূর্ত ইত্যাদি খরচও নিজস্ব ঐ আয় থেকেই নির্বাহ করা হয়। অথচ বীজ ও বীজের আনুসঙ্গিক খরচ খাতে সরকার থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য বরং দিন দিন তা আরো কমে যাচ্ছে। এতে প্রতিবছরই বর্ধিত বীজ ক্রয় ও অন্যান্য খরচ মিটাতে বিএডিসি’র বীজ ও উদ্যান উইংকে বাজেট ঘাটতিতে পড়তে হচ্ছে অথচ কৃষির অন্যতম এবং সংবেদনশীল এ উপকরণের ক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বরং বৃদ্ধিই পাওয়ার কথা ছিল। প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ খাত থেকে বাজেট কর্তন করে হলেও বীজের মূল্য কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখা জরুরি নয় কি! মনে রাখতে হবে, আমাদের অর্থনীতি এখনও কৃষি নির্ভর; তাই সংশ্লিষ্ট সকলের বীজ নীতির এ সকল দিক পুণর্বিবেচনা করার এখনই সময়।
লেখক : উপ-ব্যবস্থাপক (বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ বিভাগ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন।

