জাকারীয়া আহাম্মেদ খালিদ
জঙ্গিবাদ! বর্তমান বিশ্বের এক ভয়াবহ সমস্যার নাম। পৃথিবীর বিশাল ভূখণ্ড আজ জঙ্গিবাদ নামক ভয়াবহ মহামারিতে আক্রান্ত। মুসলিম দেশগুলি ছাড়াও পৃথিবীর বড় বড় মোড়লদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এই জঙ্গিবাদ। প্রত্যেকটি দেশের রাষ্ট্রনায়করা চিন্তিত ও শঙ্কিত। ব্যয় করা হচ্ছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। প্রণয়ন করা হচ্ছে নতুন নুতন আইন। তারপরেও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে একজন জঙ্গি মরলে অন্যদিকে দশজন তৈরি হচ্ছে। গত ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিসানে মারা গেলো ৬ জঙ্গি এর ঠিক ২৬ দিন পরেই কল্যাণপুরে মারা গেল ৯ জঙ্গি। বেড়েই চলেছে তাদের সংখ্যা। কিন্তু কেন?
পবিত্র ইসলাম ধর্মে জ্ঞান অর্জন করাকে ফরজ করা হয়েছে। এখন কেউ যদি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা বিজ্ঞানী হয়ে বলে, আমি তো আমার ফরজ আদায় করে ফেলেছি তবে সেটা হবে মূর্খতার পরিচায়ক। কারণ, ইসলামে ঐসব জ্ঞান অর্জন করাকে ফরজ করা হয়েছে যে জ্ঞান অর্জন করলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সকল হুকুম আহকাম সঠিকভাবে পালন করার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। কিন্তু আজ আমরা ইসলামিক জ্ঞান অর্জনকে বাদ দিয়ে সাধারণ জ্ঞান অর্জনকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে রেখেছি। আজ সেই ইসলামিক জ্ঞানের অভাবেই খোদ মুসলমানদের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে বিভেদ। আর এই বিভেদের সুযোগ নিয়ে মাস্টারমাইন্ডরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে যাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে সকল মুসলিমের জন্য ফরজ করেছেন। কখন কোন পরিস্থিতিতে কাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে সেটা আগে জানতে হবে। আমার জানামতে ইসলামের কোথাও কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে জিহাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। কেউ যদি আপনাকে যেকোনোভাবেই হো কনা কেন বোঝানোর চেষ্টা করে যে ওরা নামধারী মুসলিম, তাদের মধ্যে প্রকৃত ইসলামের কিছুই নেই, তারা কাফির মুশরিকদের গোলামে পরিণত হয়েছে। তাদেরকে হত্যা করলে ইসলামের কল্যাণ হবে, তবে জেনে রাখুন সে আপনাকে ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করছে। ইসলামে নিরপরাধ একজন মানুষকে (সে যে কোনো ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন) হত্যা করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল।
আমার ছোটবেলার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় ময়না পাখি পোষার খুব শখ ছিলো। যাকেই পেতাম তার কাছেই ময়না পাখি এনে দেয়ার আবদার করতাম। এই অবস্থা যখন চলছিল তখন আমাদের এলাকায় মুন্সি নামে একজন লোক ছিল, যে ছিল সকল কাজের কাজী। মাটির কামলা দেয়া থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি কাঠমিস্ত্রির সকল কাজই করতো। সে একদিন আমাদের জন্য দুইটা ময়না পাখির ছাঁনা নিয়ে আসলো। আমরাতো মহা খুশি, পাখির ছাঁনা দুইটা নিয়ে আমাদের সে কী আনন্দ আর উচ্ছাস। খাওয়া ঘুম লেখাপড়া বাদ দিয়ে পাখির ছানা দুইটার যত্নে বিভোর হয়ে থাকতাম। কিছুদিন যাওয়ার পর একটা ছানা মারা গেল, আরেকটা বেশ বড় হতে লাগল এবং একটু একটু উড়তেও শিখে গেল। আরও কিছুদিন যাওয়ার পর কেউ একজন আমাদের জানাল আমরা যেটাকে ময়না পাখির ছানা ভেবে পুষছি সেটা আসলে শালিকের ছানা। মনটা তখন বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শালিক পুষে তো লাভ নেই, এটা বড় হয়তো আর কথা বলতে পারবে না তাই ওটাকে বাড়ির চালের উপড় ছেড়ে দিলাম। ভাবলাম উড়ে কোথাও চলে যাবে। কিন্তু ছেড়ে দেয়ার একটু পড়েই কোথা থেকে একটা বিড়াল এসে ছোঁ মেরে শালিকের ছানাটাকে নিয়ে চলে গেল।
বাংলাদেশে কিছুদিন যাবতৎ শুরু হওয়া কথিত আইএস নামক জিহাদিদের দেখে আমার উপরোক্ত ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। আসলে তারা ময়না ভেবে সব কিছু ছেড়েছুড়ে যেটাকে লালন পালন করছে সেটা আসলে ময়না নয়, শালিকের ছানা। অবশ্য তাদেরকেও সম্পূর্ণ দোষ দিয়ে লাভ নেই। কোনটা ময়না আর কোনটা শালিক সেটা তাকে তার ফ্যামিলি থেকে কখনও শেখানো হয়নি।
ইদানিং জঙ্গি কার্যক্রম করতে গিয়ে যারা মারা যাচ্ছে বা ধরা পড়ছে তাদের প্রায় সকলেই উচ্চ শিক্ষিত, স্মার্ট ও সমাজের এলিট শ্রেণির ফ্যামিলির সন্তান। জঙ্গি কার্যক্রম করতে গিয়ে মারা যাওয়াদের নিয়ে সমাজের মানুষরা এমনকি তাদের পরিবারও ছি ছি করছে। কিন্তু আমি এর কিছুটা হলেও বিপরীত মনোভাব পোষণ করছি। কারণ আজ যারা তাদের ছি ছি করছে তাদের এই পথে যাওয়ার জন্য ৮০ ভাগ তারাই দায়ী বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে তাদের পরিবার। পরিবার থেকে তারা যদি ইসলামের সঠিক শিক্ষা ছোটবেলা থেকে পেয়ে আসত তাহলে আজ আইএস/ জেএমবি/ হুজি/ আনসারুল্লা বাংলাটিম/ হিজবুত তাহরিরের মতো সংগঠনের কথায় তারা কখনই প্রভাবিত হত না। আমাদের সমাজের এলিট শ্রেণির ফ্যামিলির সন্তানরা বলতে গেলে একা একাই বড় হয়। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই সারা বছর প্রচণ্ড ডিপ্রেসনে ভোগে। স্কুল/কলেজ বা ইউনিভার্সিটির বাইরে তাদের তেমন কোনো বন্ধু থাকেনা। বাড়ির পাশেই হয়তো ছোট্ট মাঠ রয়েছে, সেখানে প্রতিদিন এলাকার ছেলেরা দল বেঁধে খেলা করছে কিন্তু এলিট শ্রেণির সন্তানটা চাইলেও তাদের সাথে গিয়ে খেলায় অংশ গ্রহন করতে পারে না, কারণ এতে করে যে তাদের সোসাইটির ইজ্জত চলে যাবে! তাই সোসাইটির ইজ্জত বাঁচানোর জন্য ঘরে বসে হয়তো তারা জুলভার্ন, জিম করবেট, কেনেথ এন্ডারসন, মার্ক টোয়েন, হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড, এরিক ফন দানিকেনের মতো লেখকদের বই পড়ছে না হয় কল অফ ডিউটি /স্টার ওয়ার্স টাই ফাইটার /এক্স-কম : ইউএফও ডিফেন্স/ মেক ওয়ারিওর ২: থার্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি কমব্যাট/রোম টোটাল ওয়ার /সিড মেয়ার’স পাইরেটস/হাফ লাইফ/ব্যাটলফিল্ড ১৯৪২ টাইপের গেইমে বিভোর হয়ে আছে। এইসব শ্যুটিং গেমস খেলতে খেলতে স্বাভাবিক ভাবেই মনের ভেতর জন্ম নিতে পারে সুপ্ত বাসনা। ইস! আমিও যদি এই ধরনের হেভি হেভি গা গুলি একটু ছুঁয়ে দেখতে পারতাম, এইসব গান যদি মাত্র একটাবার চালনা করার সুযোগ পেতাম অথবা এই ধরনের গান দিয়ে গেইমসের হিরোদের মতো কোথাও ফাইট করতে পারতাম।
এইসব ঘরবন্দি সন্তানরা খোলা আকাশে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে। এই অবস্থায় কেউ যদি তাদেরকে খোলা আকাশ দেখানোর স্বপ্ন দেখায় অথবা পিসিতে খেলা গেইমসের সেই আধুনিক Uzi Sub-machine Gun/Kalashnikov AK-47 Assault Rifle অথবা AK-22 assault rifle চালানোর সুযোগ করে দিতে চায় তাহলে এইসব ছেলেরা এক কথায় খুশিতে লাফিয়ে উঠবে। আর সেটা পাওয়ার জন্য তারা সব কিছু ছাড়তে তৈরি হয়ে যাবে। তারা চাইবে একটু রোমাঞ্চের স্বাদ। পানসে হয়ে যাওয়া জীবনে তারা নিয়ে আসতে চাইবে একটু ভিন্নতা। ঠিক এটাকে পুঁজি করে আর তার সাথে তাদের ধর্মীয় জ্ঞানে দুর্বলতার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ময়না পাখির কথা বলে শালিকের ছানা ধরিয়ে দিচ্ছে। তারা বুঝতেও পারছে না তারা ময়নার বদলে শালিকের ছানা পুষে চলেছে।
জঙ্গিবাদীদের মাস্টারমাইন্ডরা মাদরাসায় পড়ুয়া ছাত্রদের ছেড়ে এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেটে পরিণত করেছে। কারণ মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্ররা প্রকৃত জিহাদ সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করে। কখন কার বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা জিহাদ ফরজ করেছে সেটা তারা ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা পেয়ে এসেছে। তাই ভালো মন্দের তফাত তারা সহজেই ধরতে পারে। তবে তারা যে একেবারেই জিহাদ বিমুখ এমনটা ভাবাও সঠিক নয়। তারা এবং সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিমরাই ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে শাহাদাত বরণ করার আকাংখা পোষন করে থাকে। তবে সেটা আল্লাহর সঠিক হুকুম আহকাম মোতাবেক। অনেক মাদরাসার ছাত্রদের ফিলিস্তিন গিয়ে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে, মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে, কাশ্মিরে বছরের পর বছর জুলুমের স্বিকার হওয়া মুসলমানদের হয়ে অথবা ফিলিপাইনের মিন্দানাওয়ের নিপিড়িত মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে জিহাদ করে হয় শহীদ না হয় গাজি হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে থাকে। তারপরও তাদেরকে বর্তমানের এইসব কথিত জিহাদে শরিক করতে পারছে না। শুধুমাত্র তাদের মাঝে ইসলামের সঠিক জ্ঞান থাকার কারণে।
বর্তমানের এইসব কথিত জিহাদি নামক জঙ্গিদের কালো থাবা থেকে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করতে তাদের প্রয়োজন সঠিক ধর্মীয় শিক্ষা। আর এই ধর্মীয় শিক্ষাই রক্ষা করতে পারে আমাদের সন্তানদের ও আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমিকে। তাই আসুন সন্তানদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনি আর চেষ্টা করি যতটুকু সম্ভব তাদেরকে সময় দেয়ার। আর সেইসাথে তাদেরকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলি।
লেখক: কলাম লেখক

