বদরুদ্দীন উমর
গত ১ জুলাই গুলশানের একটি মহার্ঘ রেস্তোরাঁয় এক সন্ত্রাসী হামলায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। এটা এমনভাবে এখন প্রায় দৈনন্দিন ব্যাপারে পরিণত হয়েছে, যাতে অধিকাংশ মানুষের মনে এটা কোনো আবেগ-অনুভূতির সঞ্চার করে না। সোজা কথায় যাকে বলে এই নিয়মিত হত্যাকাণ্ড মানুষের গা সওয়া হয়ে গেছে! কিন্তু তা সত্ত্বেও ১ জুলাই তারিখে যে সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে এর প্রতিক্রিয়া জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। এটাই এখন সব থেকে বেশি আলোচিত বিষয়। কারণ এটা বড় আতঙ্কের বিষয়ও বটে। এই সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশে নতুন না হলেও এর তিনটি দিক বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো। ইতিপূর্বে ধর্মীয় জঙ্গিসহ অন্য ক্রিমিনালরা ব্লগার, সাধারণ নিরীহ হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান ধর্মযাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষু, মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, চিকিৎসক, ছাত্রসহ নিরীহ লোকদের চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে হত্যা করে এসেছে। ১ জুলাইয়ের সন্ত্রাসী হামলা এ ধরনের নয়। এর ধরন আলাদা। এর চরিত্র অন্য রকম। এই প্রথম শুধু দুই-একজন নয়, একগুচ্ছ বিদেশির ওপর সংগঠিতভাবে সশস্ত্র হামলা করেছে কয়েকজন সন্ত্রাসীর একটি গ্রুপ এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে। দু’জন পুলিশের মৃত্যু হয়েছে এই ঘটনায়। হামলাকারীরাও সকলে নিহত হয়েছে।
এই হামলার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটা মাদ্রাসার ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিতদের দ্বারা পরিচালিত হয়নি। এটা পরিচালিত হয়েছে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত অল্প বয়স্কদের দ্বারা। এরা সকলেই ধনী ও সম্পন্ন পরিবারের সন্তান। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্র এরা। কেউ কেউ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যয়নরত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার উচ্ছেদের জন্য তালেবানদের অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিচ্ছিল সে সময়ই তারা পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসাকে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল কায়দার সদস্য তৈরির কারখানায় পরিণত করেছিল। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইসলামের নামে যে সন্ত্রাসী তৎপরতা এখন দেখা যাচ্ছে, এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার উদ্ভবে সহায়তা করেছিল। ইসলামের সুনাম নষ্ট করে যারা ইসলামকে সন্ত্রাসের সমার্থক করে নতুন সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়েছিল, সেই সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই পরবর্তীকালেও এ ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠনকে ব্যবহার করেছে। তাদেরকে অর্থ-অস্ত্র ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করছে। এই সত্য এখন আর লুকিয়ে রাখার উপায় নেই। কয়েক দিন আগেই এক ব্রিটিশ মন্ত্রী ইরাকে আইএস সৃষ্টির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে বক্তব্য প্রদান করেছেন। এ বিষয়টি প্রথম থেকে জানা থাকলেও সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের স্বার্থের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই এই সত্য এখন উঁকি-ঝুঁকি মারছে।
প্রথম দিকে মাদ্রাসার ছাত্রদের মধ্যে আল কায়দার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতা সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে সেটা তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতদেরও তারা নিজেদের সন্ত্রাসী বলয়ের মধ্যে টেনে এনেছে। তারাই এখন মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আল কায়দা, আইএস, আল নুসরত, বাংলাদেশে জেএমবি ইত্যাদি সংগঠনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছে। বাংলাদেশে ইতিপূর্বে এটা দেখা যায়নি। এ কারণে যা কিছু ধর্মীয় সন্ত্রাসী তৎপরতা এখানে দেখা যেত তার জন্য মাদ্রাসার গরিব ছাত্র এবং মাদ্রাসাকেই দায়ী করা হতো। এটা ঠিক যে, এ ধরনের সন্ত্রাসী সংগ্রহের একটা ক্ষেত্র মাদ্রাসা বটে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এটা মাদ্রাসার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ধনী ও সম্পন্ন পরিবারের সন্তানরা পর্যন্ত এই জালে জড়িয়ে পড়ছে। এটা যে শুধু একটা নতুন ব্যাপার তাই নয়, একটা বড় আতঙ্কের ব্যাপারও বটে। এই আতঙ্ক এখন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে বেশ ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে।
১ জুলাইয়ের হামলার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই হামলা পরিচালিত হয়েছে আত্মহননের জন্য প্রস্তুত জঙ্গিদের দ্বারা। অর্থাৎ এই হামলা যারা পরিচালনা করেছে তারা শুধু অন্যদের জীবন শেষ করার জন্যই কাজ করেছে তাই নয়, নিজেদের জীবন দেওয়ার জন্যও তৈরি থেকেছে। এ ধরনের আত্মঘাতী জঙ্গি ইতিপূর্বে বাংলাদেশে দেখা যায়নি। যারা ব্লগার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় লোক এবং নানা পেশায় নিযুক্ত লোকদের ওপর সশস্ত্র হামলা করে তাদেরকে হত্যা করেছে, তারা চোরাগোপ্তাভাবে হামলা চালিয়ে পালিয়ে গিয়ে নিজেদের জীবন রক্ষা করেছে। জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য বানিয়ে যারা ভাবনাহীন চিত্তে ধর্মের নামে এই সন্ত্রাস করেছে তারা একেবারে অন্য ধরনের উপাদান। এই আত্মঘাতীরা আপাতদৃষ্টিতে বিরাট ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে মনে হলেও তা ঠিক নয় এ জন্য যে, এরা এই হত্যাকাণ্ড করছে একে তথাকথিত নেক বা পুণ্যের কাজ মনে করে; নিজেরা বেহেশতে যাওয়ার জন্য! কোন মন্ত্র দিয়ে এই জঙ্গিদের এভাবে তৈরি করা হয়েছে_ এটা খুবই গভীর ভাবনার বিষয়। কিন্তু এটা যে অতি বিপজ্জনক ব্যাপার এতে সন্দেহ নেই। এতদিন বাংলাদেশে এই বিপদ ছিল না। এখন আত্মঘাতী জঙ্গিদের যে আবির্ভাব বাংলাদেশে হয়েছে এটা এক বড় আতঙ্কের বিষয় এ কারণে যে, এর পর এ ধরনের আক্রমণ অন্যত্র এবং ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার শর্তই এর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। কাজেই এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মোকাবেলা করা দেশের জনগণের জন্য এখন পরিণত হয়েছে এক গুরুতর কর্তব্যে।
সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য নানা ব্যবস্থার কথা বলছে। তারা প্রত্যেক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র উপস্থিতি-অনুপস্থিতির হিসাব দেওয়ার কথা বলছে। দেশে কোথায় কোথায় যুবক ও তরুণরা কিছুদিন ধরে নিরুদ্দেশ রয়েছে তার খোঁজখবর ও তালিকা প্রস্তুতের কথা বলছে। তারা গুলশানের আবাসিক এলাকা থেকে রেস্তোরাঁসহ অন্য বাণিজ্যিক স্থাপনা উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এসব দিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা যে করা যায় না এটা বোঝার জন্য কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। কোন বাড়ি থেকে কোন ছেলে কবে উধাও হয়েছে, কোন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ছাত্র অনুপস্থিত রয়েছে, এসব দেখে এ ধরনের শিক্ষিত জঙ্গি চিহ্নিত করা যে বাংলাদেশের পুলিশের এবং সরকারের কোনো এজেন্সির ক্ষমতা নেই, এটা বলাই বাহুল্য। যারা দেশজুড়ে নিয়মিতভাবে সংঘটিত শত শত হত্যাকাণ্ডের কোনো হদিস বের করতে পারে না, যারা এই অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারে না, এর ফলে যেখানে অপরাধীরা অবাধে পুলিশের সামনেই ঘোরাফেরা করে, সেখানে নিরুদ্দেশের তালিকা দেখে পুলিশ জঙ্গি চিহ্নিত করবে, সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করবে, এটা সিরিয়াসলি বা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কোনো ব্যাপার নয়। এসব প্রচেষ্টার পরিণতি শূন্য ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। কাজেই এ ধরনের আত্মঘাতীদের হামলা প্রতিরোধের জন্য সঠিক এবং উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকার যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে এদিক দিয়ে পরিস্থিতির অবনতি রোধ করা যে তাদের দ্বারা সম্ভব হবে না, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
লেখক : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

