ঢাকাWednesday , 22 June 2016
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বীজের প্রকৃত চাহিদা নির্ণয় এবং করণীয়

Link Copied!

ড. মো. শাফায়েত হোসেন
বীজের চাহিদা নিরুপণ একটি দেশের কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনীতিতে চাহিদার সাথে পণ্যের সরবরাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চাহিদা বেশি কিন্তু পণ্যের সরবরাহ কম হলে যেমন সংকট সৃষ্টি হয় তেমনি চাহিদার তুলনায় পন্যের সরবরাহ বেশি হলেও সমস্যা সৃষ্টি করে। কৃষি পণ্যের মধ্যে বীজ অন্যান্য অকৃষিজ পণ্য থেকে বৈশিষ্টগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। একে অন্যান্য পণ্যের মত অবিক্রিত অবস্থায় দীর্ঘদিন গুদামজাত করে রাখা যায় না। ফসল উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে বীজই একমাত্র জীবন্ত উপকরণ (Living input) যাকে একটি মানব শিশুর সঙ্গে তুলনা করা যায়; পরবর্তী ফসল মৌসুম পর্যন্ত একে লালন-পালন করতে হয়। সাধারণত ফসলভেদে বীজ সর্বাধিক দু’বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে, অন্যথায় সংরক্ষণকাল বৃদ্ধির সাথে সাথে বীজের গুণগতমান হ্রাস পেতে থাকে। সাধারণত প্রত্যেক বছরের মোট ফসলি জমির পরিমাণ নির্ধারণ করে বীজ হার দিয়ে গুণ করে ওই বছরের বীজের কৃষিতাত্ত্বিক চাহিদা (Agronomic Requirement) নিরুপণ করা হয়। আর যদি এই  ফসলি জমির পরিসংখ্যানগত তথ্য সঠিক না হয় তবে বীজের চাহিদা নিরুপণও যে সঠিক হবে না তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফসলি জমির বার্ষিক পরিসংখ্যান তৈরি করে থাকে। প্রতিষ্ঠান দু’টির মধ্যে মাঝেমধ্যে তথ্যগত গড়মিল লক্ষ্য করা যায় যা বীজের চাহিদা নিরুপণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। সঠিকভাবে বীজের চাহিদা নিরুপণে ব্যর্থ হলে বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা কৃষককে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়; ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। বীজের কৃষিতাত্ত্বিক চাহিদা নিরুপণের সাথে সাথে বাজারজাতযোগ্য বীজের চাহিদা অবশ্যই নিরুপণ করতে হবে।  সরকারিভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং প্রায় তিন শতাধিক বীজ কোম্পানি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন এবং আমদানির সঙ্গে জড়িত। বিএডিসি ছাড়া অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানই বাণিজ্যিকভিত্তিতে বীজ ব্যবসার সাথে জড়িত। দেখা যায় যে, এ সকল প্রতিষ্ঠানের বীজ অনেক সময় অবিক্রিত থেকে যায়, ফলে তাদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়। সাম্প্রতিক দু’এক বছরে বিএডিসিরও কিছু বীজ অবিক্রিত থাকার কারণে অবীজ হিসেবে বিক্রি করতে হয়েছে। আবার অনেক সময় অত্যধিক চাহিদার কারণে বীজ সরবরাহ করতে না পারায় ওই সকল প্রতিষ্ঠান একদিকে যেমন অধিক লাভ থেকে হয় বঞ্চিত অন্যদিকে পরিমাণমত ভাল বীজ না পেয়ে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ব্যাহত হয়। তাই সঠিকভাবে বীজের চাহিদা নিরুপণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দেশে ভাল বীজের ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও বীজ অবিক্রিত থাকা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। বীজের ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও বীজ অবিক্রিত থাকলে কারণগুলো খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তবে এটি অনস্বীকার্য যে, সরকারের উদার বীজ নীতির কারণে পূর্বের তুলনায় ভাল বীজ সরবরাহ ও ব্যবহারের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে যেমন বিএডিসি’র মাধ্যমে বীজ সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বীজ কোম্পানি অনুমোদনের ফলে বীজ সরবরাহের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২০১৪-১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, দেশে আউশ, আমন, বোরো ও বোরো হাইব্রিড ধানের জমির পরিমাণ যথাক্রমে ৯.০, ৪০.১৫, ৪০.৭৫ এবং ৬.৬০ লাখ হেক্টর এবং একই জমির বিপরীতে উক্ত ধান বীজের কৃষিতাত্ত্বিক চাহিদা যথাক্রমে ০.২২৫, ১.০০৪, ১.০১৮ এবং ০.১১২ লাখ মে. টন, সে হিসেবে বিএডিসি ২০১৪-১৫ সালের মোট আউশ ধান বীজের চাহিদার ৫.৯২% (১,৩৩২.২৪ মে. টন), আমন ধান বীজের ২০.৭৯%(২০,৮৭৫.৭১ মে. টন), বোরো ধান বীজের ৫৪.১৩% (৫৫,১৪৫.১৫ মে. টন) ও বোরো হাইব্রিড ধান বীজের ৯.৪১%(১,০৫৬.০৯) সরবরাহ করেছে। উক্ত প্রতিবেদন থেকে এও জানা যায় যে, বিএডিসি বীজের মোট চাহিদার ৪৭.৮৫% গম বীজ, ৩.৭৬% আলু বীজ, ১.৮৪% ভূট্টা বীজ, ২৩.৫১% ডাল বীজ, ৯.১৫% তৈল বীজ,  ১৪.৮৯% পাট বীজ, ২.৫০% সবজি বীজ ও ০.০৬% মসলাজাতীয় বীজ সরবরাহ করেছে। ২০১১ সালে ‘সার্ক কৃষি কেন্দ্র’ থেকে প্রকাশিত  Quality Seed in SAARC Countries শীর্ষক পুস্তক থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে দেশে মোট বীজের চাহিদার ১৮% সরকারি ও বেসরকারি প্রাতিষ্ঠান কর্তৃক পূরণ করা হচ্ছে এবং বাকি ৮২% পূরণ করা হচ্ছে কৃষকের বাড়িতে সংরক্ষিত বীজ থেকে যা গুণগতমান সম্পন্ন নয়। কৃষকের বাড়িতে সংরক্ষিত এ বীজের পরিমাণ কতটুকু তথ্যভিত্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

SEED
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ক্রমান্বয়ে আবাদি জমি ১.০% হারে কমে যাচ্ছে, এ তথ্য সঠিক হলে বীজের কৃষিতাত্ত্বিক চাহিদা কম হওয়ার কথা, সে হিসেবে কৃষকের সংরক্ষিত বীজের পরিমাণ কমে যাবে এবং আনুপাতিকহারে প্রাতিষ্ঠানিক বীজের পরিমাণ অবশ্যই বেড়ে যাবে, কারণ আবাদি জমি, সরবরাহকৃত প্রাতিষ্ঠানিক বীজ ও কৃষকের সংরক্ষিত বীজের পরিমাণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা বীজ কোম্পানি কর্তৃক উৎপাদিত এবং বাজারজাতকৃত বীজের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ব্যবসায়িক নীতির কারণে হয়তো তারা সঠিক তথ্য প্রকাশ না-ও করতে পারে। সাম্প্রতিককালে এলাকা বিশেষ ফসলের চাষ পদ্ধতিতে (Cropping Pattern) কিছুটা পরিবর্তন আসায় নিট ফসলি জমির (Net Cropped Area) পরিমাণ হ্রাস পেলেও মোট ফসলি জমির (Total Cropped Area) পরিমাণ হ্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবিএস-২০১০ অনুযায়ী ২০০৬-০৭, ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ সালে নিট ফসলি জমির পরিমাণ যথাক্রমে ৭৮.০, ৭৭.৬৮ এবং ৭৯.৪৩ লাখ হেক্টর হলেও একই বছরে মোট ফসলি জমির পরিমাণ যথাক্রমে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩৭.৩৪, ১৩৮.৭৮ ও ১৪৪.১৯ লাখ হেক্টরে এবং বিবিএস-২০১২ অনুযায়ী, দেশের মোট ফসলি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৯.৫০ লাখ হেক্টরে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কৃষি জমি হ্রাসের পরিমাণ মাত্র ০.২৪%, ওই প্রতিবেদনে এ-ও উল্লেখ আছে, ১.০% হারে কৃষি জমি হ্রাসের বহুল প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয় (NFPCSP/FAO Research Report, ঢাকা-২০১৩)।
এমতাবস্থায় বীজের প্রকৃত চাহিদা নিরুপণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ চাহিদা নিরুপণ হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী সময়ের জন্য। স্বল্পমেয়াদী সময়ের জন্য বীজ সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে সাধারণত এক বছর পূর্বে বীজের চাহিদার পূর্বাভাস করতে হবে। চাহিদার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে বীজ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলো হচ্ছে-আবহাওয়াজনিত পরিবর্তন, কৃষিপণ্যের বাজারদর, পূর্ববর্তী বছরে ফসলের ফলন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যান্য কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা, কৃষকের স্বচ্ছলতা, বীজ প্রতিস্থাপন হার (Seed Replacement Rate), বীজ পরিবর্ধন হার (Seed Multiplication Rate) ইত্যাদি। বছরওয়ারি বীজ উৎপাদন, সরবরাহ ও আমদানির ক্ষেত্রে বীজ উৎপাদনকারী ও বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং বীজ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নিতে পারে।

(লেখক : উপব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, মুঠোফোন : ০১৭২১-৭১৪৮১৩)