মহসীন কাজী
ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খ্রিস্টানদের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসবের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে বিপনী কেন্দ্রগুলোতে পণ্যমূল্য ছাড়ের উৎসব শুরু হয়। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতেও এ ছাড়ের উৎসব চলে হিন্দুদের দুর্গাপূজা ও দেওয়ালির সময়। উৎসবকে ঘিরে দেশগুলোতে দেখা যায়, বেশির ভাগ পণ্যের উপর মূল্য ছাড়ের পরিমাণ ৫০ ভাগের বেশি। কাপড়চোপড়, খাবারদাবার, প্রসাধনী, বাহারি, আসবাব, ইলেকট্রনিক্সসহ সবধরণের পণ্যকে ঘিরে ছাড়ের উৎসব চলে। সঙ্গে পণ্য প্রতি ফ্রি অফার তো থাকেই।
সামনে আমাদের দেশে আসছে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। এখন চলছে সংযমের মাস পবিত্র মাহে রমজান। বাংলাদেশে মুসলমানদের পবিত্র এ উৎসব আর বরকতময় মাসকে ঘিরে কি দেখছি আমরা। ইউরোপ, আমেরিকা আর ভারতের উল্টো চিত্র। খ্রিস্টানদের বড়দিন আর হিন্দুদের দুর্গাপূজাকে ঘিরে যেখানে চলে মূল্য ছাড়ের উৎসব সেখানে আমাদের এই মুসলিম দেশে রমজান আর ঈদকে ঘিরে চলছে পণ্য বিক্রির নামে তুঘলগি কারবার। এখন পণ্য বিক্রি হচ্ছে তিন চারগুণ বেশি দামে। ব্যবসায়িরা শুরু করেছে ‘গলাকাটা’ কারবার।
যার প্রমাণ মিলেছে ইতিমধ্যেই। চট্টগ্রাম তথা দেশে পাইকারী বাজারের মূল মোকাম খাতুনগঞ্জে চিনির দামের কারসাজি করে ধরা পড়েছে মীর গ্রুপ। মিল থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন চিনি মজুদ করে প্রতিকেজিতে বাড়তি ১২ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল গ্রুপটি। রমজানের শুরুতে কারসাজিতে হাতেনাতে ধরা পড়ে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতে মোটা অংকের জরিমানা দিতে হয়েছে মীর গ্রুপকে। মূল্য কারসাজিতে এই ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত হলেও ভোগ্যপণ্যের অন্যান্য শাখায় মজুদদারি করে রমজান শুরুর আগে পার পেয়েছে অনেকে। তবে মীর গ্রুপের কারসাজি ধরা পড়ার পর কমোডিটির অন্যান্য নাটের গুরুরা সতর্ক হওয়ায় রমজানের দ্বিতীয় সপ্তায় দাম নিয়ে আর বাড়তি নয়ছয় করার সাহস পায়নি।
এতদিন ধরে রমজান আসলে শুরু হত ভেজাল বিরোধী অভিযান। রমজান আর ঈদে পণ্য ভেজালমুক্ত রাখতে জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালতের রুটিন ওয়ার্কটি করে আসত। এবার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজের পরিধি বাড়িয়ে পণ্যমূল্যের সঙ্গে কাপড়ের বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়টিও সংযুক্ত করেছে। শুরুতেই জেলা প্রশাসনের জালে ধরা পড়েছে চিনির মজুদদারের কারসাজি। এখন বেরিয়ে আসছে কাপড়ের বাজারের দুই নম্বরি।
‘ঈদ বাজারে অভিযান, এক পোশাকে ১২ হাজার ৫০৫ টাকা লাভ!’ (দৈনিক আজাদী, শেষপৃষ্ঠা, ১৭ জুন)। খবরটি আসলেই পিলে চমকানোর মতো। চট্টগ্রামের কাপড়ের মার্কেটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের দ্বিতীয় দিন এই চিত্র উঠে এসেছে নগরীর অভিজাত বিপনী মিমি সুপার মার্কেট থেকে।
খবরে বলা হয়, মার্কেটটির ইয়াং লেডি নামের এক দোকানে মেয়েদের ফ্লোর টাচ ব্রান্ডের ড্রেসটির দাম লেখা হয় ১৯ হাজার ৫০০ টাকা। আদালতের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে কাপড়টির প্রকৃত ক্রয়মূল্য ৬ হাজার ৯৯৫ টাকা। এভাবে প্রতি কাপড়ের দাম তিনগুণেরও বেশিদামে হাকার চিত্র বেরিয়ে এসেছে অভিযানে। মিমিসুপার মার্কেটের নিচ তলায় অবস্থিত আচঁল নামের শাড়ির দোকানটির মালিক ওই মার্কেট ব্যবসায়ি সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীনের। দোকানটিতে একটি শাড়ি ৪১ হাজার টাকা বিক্রি করলে শাড়িটির কোনো ক্রয় রশিদ দেখাতে পারেননি এই ব্যবসায়ি নেতা (প্রথম আলো-১৭ জুন)। পাশাপাশি মার্কেটটিতে টেরিবাজার থেকে কাপড় কিনে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা পোশাককে ভারতীয় বলে চালিয়ে দেয়ার জালিয়াতিও ধরা পড়েছে।
১৬ জুন পরিচালিত অভিযানে মিমি সুপার মার্কেট, আফমি প্লাজা, সানমান ওশান সিটির কাপড়ের দোকানে দামের বড়ধরণের তারতম্য পরিলক্ষিত হলেও আদালত কোনো জরিমানা না সতর্ক করেছে। ব্যবসায়িদের ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিক্রয় মূল্য নির্ধারণের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে প্রত্যেক মার্কেটে অভিযোগ বাক্স রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমান অভিযান শেষে সাংবাদিকদের কাছে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় কাপড় বিক্রিতে দামের এই কারসাজিকে ‘ডাকাতি’ বলে মন্তব্য করেছেন (দৈনিক আজাদী-১৭ জুন)।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত ১৮ মে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ব্যবসায়িদের সঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এবারের রমজান ও ঈদে ভোগ্যপণ্যের মতো কাপড়ের বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার কাপড়ের দোকানে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুাব করেন। তিনি বলেন, মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে অভিজাত মার্কেটগুলোতে পোশাকের গলাকাটা দাম রাখা হয়। মধ্যবিত্ত লোকজন এ কারণে বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে হিমশিম খান। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১০ হাজার টাকার শাড়ি বিক্রয় করা হয় লাখ টাকায়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন গত সপ্তায় কাপড়ের বাজার মনিটরিং বিষয়ে অভিজাত মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ি সমিতির নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় করেন। সেখানেও ক্রয় মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পোশাক ও কাপড় বিক্রির পরামর্শ দেয়া হয়। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, বৈঠকটিতে চট্টগ্রাম প্রায় সকল মার্কেটের ব্যবসায়ি নেতারা উপস্থিত থাকলেও মিমি সুপার মার্কেটের কেউ উপস্থিত হননি।
ভোগ্যপণ্যের পাশাপাশি কাপড়ের বাজারে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের সার্বিক নির্দেশনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের যে অভিযান শুরু হয়েছে তা ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বেরিয়ে এসেছে ব্যবসায়িদের অসদুপায়ে মুনাফা অর্জনের বিশাল ফাঁদ।এর মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি কেটে যাবে মধ্যবিক্ত ও নিম্নবিত্তের উদ্বেগ আর অস্থিরতা।
রমজান ও ঈদে বাজার মনিটরিং শুধু জেলা প্রশাসনের কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি পরিচালিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভূমিকা থাকার কথা। কিন্তু সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই নিরব। যদিও অন্যান্য বছর এসব ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনকেই অগ্রণী ভূমিকায় দেখা যেত। এবারের ভূমিকায় নগরবাসীকে কি জবাব দেবেন নগরীর মেয়র। সে প্রশ্নটি জোরালো হচ্ছে নগরবাসীর মনে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: গত বছর দেওয়ালির সময় ছিলাম ভারতের বাণিজ্য নগরী খ্যাত মুম্বাইতে। শিবাজী বিমান বন্দর থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের সর্বত্র পণ্যমূল্যে ছাড়ের অফার। যেখানে চোখ পড়ছিল বেশির ভাগ ছাড়ের পরিমাণ ৫০ এর নিচে নয়। আমার মুম্বাইয়ের বন্ধু মনসুরের কাছে জানতে চাইলাম বিষয়টি। তিনি জানালেন, প্রতিবছর অক্টোবর মাস জুড়ে মুম্বাইতে হিন্দুদের দেওয়ালি উপলক্ষ্যে সবধরণের পণ্যে ছাড় দেয়া হয়। সাধারণ মানুষও এ সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। কারণ এ সময় পণ্য কিনলে সুবিধা দুটি। প্রথমত; বিশাল ছাড়, দ্বিতীয় ওয়ান বাই ওয়ান অথবা টু ফ্রি। আমার প্রশ্ন শুনে মনসুরের পাল্টা জিজ্ঞাসা, তোমাদের দেশেও তো ঈদের সময় এভাবে ছাড় দেয় মনে হয়। যেভাবে বড়দিনে দেয় ইউরোপ ও আমেরিকা। কথা না বাড়িয়ে প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে পড়লাম কৌশলে। তার সাথে চালিয়ে গেলে বাস্তব কথায় বেরিয়ে আসত আমার দেশের দুর্বলতা।
ব্যবসায়ি না ‘ডাকাত’: ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসাকে উত্তম পেশা এবং ব্যবসায়িকে উত্তম ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন, সত্যিকার ব্যবসায়ি কেয়ামতের ময়দানে নবী, শহীদ ও সালেহীনদের কাতারে থাকবে। তিনি এও বলেছেন, যে মুসলমান অধিক মুনাফা করবে, ঠকানোর নিয়তে ব্যবসা করবে, মজুদদারি ও ভেজাল করবে সে ব্যক্তি আমার দলের অন্তর্র্ভূক্ত থাকবেনা (সূত্র: মুফতি আবুল কালাম)।
চলতি পবিত্র রমজান মাস ও আগামী ঈদকে সামনে রেখে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ইতিমধ্যে যেসব ব্যবসায়ি অতি মুনাফালোভী ও মজুদদার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তারা প্রত্যেকেই মুসলমান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে এদেশের অন্যান্য ব্যবসায়িদের সিংহভাগই মুসলমান। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৎ এবং অসৎ ব্যবসায়িদের স্থান কোথায় তা নির্ধারিত। তদুপরি অসৎ ব্যবসায়িরা দেশের বিদ্যমান আইনেও দোষী। মানুষের দৃষ্টিতে ঘৃণিত। এ সত্বেও ব্যবসা ও ব্যবসায়ির মতো সম্মানিত শব্দকে যারা কলঙ্কিত করে চলেছে তাদের ব্যবসায়ি না বলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিলুর রহমানের ভাষায় ‘ডাকাত’ বলাই শ্রেয়।
লেখক : লেখক ,কলামিস্ট

