খালিদ হোসেন
গুলশানের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। উদ্দেশ্য বিএনপি চেয়ারপারসনের বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়। সেখানে চীনের সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করছেন বিএনপি নেত্রী। রাত ৮টা ৭ মিনিটে বড় বোনের ফোন। বললেন, ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছে। জবাবে বললাম, রাস্তায় হাঁটছি, টের পাইনি। চারদিকে দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম। পেশাগত কাজে এ পথ দিয়ে অনেকদিন ধরে হাটছি। শেষ বিকেলে, সন্ধ্যায় গুলশানের ফুটপাতে, রাস্তায় লোকজনের সমাগম বেশি থাকে। এটা স্বাভাবিক, ‘গা সওয়া’ হয়ে গেছে অনেকটা।
বোনের ফোন পাওয়ার পর খেয়াল করে দেখলাম। ফুটপাতে, রাস্তায় লোকজনের উপস্থিতি অন্যদিনের চেয়ে বেশি। তাদের চোখে-মুখে অস্থিরতা, আতংকের ভাবও দেখলাম। আশপাশে বাড়ির নিচের খালি জায়গায় নারী-পুরুষের বেশ ভিড়। প্রায় সবাই ঘরোয়া পোশাকে।
প্রথমে বাংলা বছরের শেষ দিনের কিংবা বর্ষবরণের কোন আয়োজন বলে মনে হলেও পরে সে ধারণা কেটে গেল। বোনের ফোনে নিশ্চিত হলাম ভুমিকম্পের ঝাঁকুনিতে বাসা-বাড়ি ছেড়ে নিচে নেমে এসেছে এসব বাসিন্দারা।
সংবাদ সংগ্রহ এবং তা অফিসে পাঠিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। পথে বাংলামোটর গিয়ে এক চায়ের দোকানে বসলাম।
দোকানে বসতেই একজন বলে উঠলো, ‘আজ নাকি ভূমিকম্প হইছে?’ আরেকজন উত্তর দিল, ‘মিয়া তুমি কই পাও ভূমিকম্প! হুদাই এগুলা মিডিয়ার সৃষ্টি! আমরা সবাই এহন মিডিয়া নির্ভর। মিডিয়ার খবর দেইখা সবাই ভূমিকম্প টের পাইছে। দেশের মানুষ কিন্তু ভূমিকম্প টের পাই নাই। যে সব জায়গায় ভবন ধসে পড়ছে তা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।’
আরেক জনের উত্তর এল, ‘ব্যাটা তোমারে শয়তানে গুতায়! সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনে ভয় পেয়ে ভূমিকম্প নাটক করছে! আর মিডিয়া তা প্রচার করতে বাধ্য হইছে। বোঝো কিছু ! শুধু তাই নয় সরকার জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ঘোরাতে তারা এই ভূমিকম্প নাটক ব্যবহার করছে।
অপরজন বললো, ‘তোমার মিয়া মাথা ঠিক আছে, এটা হচ্ছে বিএনপি-জামায়াত জোটের নাটক! সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিক প্রাকৃতিক ফ্লেভার অংশ!’
আলোচনা বেশ জমে গেছে। চায়ের বিক্রিও কিছুটা বাড়লো বলে মনে হচ্ছে। আলোচনায় যুক্ত হলেন চশমা পরা এক ভদ্রলোক। তিনি বসতে বসতে বললেন, ‘ভাই, বিএনপি-আওয়ামী লীগের ডাকে এখন মানুষ সাড়া দেয় না! তাদের কর্মসূচিতে ভাড়া করে লোক আনতে হয়! কিন্তু ‘তাহায় দ্যাখছেন’ (খেয়াল করে দেখেছেন) গণজাগরণমঞ্চ, হেফাজত এদের কর্মসূচি! এদের সেন্টিমেন্টের বাজার খুব শক্তিশালী! যার মধ্যে দেশ প্রেমের দেও নাই সেও গণজাগরণের ডাকে তার ঘরে পতাকার প্রতিকৃতি উড়াইছে। আবার যে প্রসাব করে পানি ব্যবহার করে না সেও ধর্মীয় ফ্লেভার লাগানোর চেষ্টা করেছে। কি বুঝলেন?’
এবার প্রশ্ন এলো, তাহলে এই ভূমিকম্পের পেছনে গণজাগরণ না হেফাজত জড়িত? আমি আর আলোচনায় যোগ দিলাম না। বাজার করতে হবে। আলোচনায় খ্যান্ত দিয়ে চায়ের দোকান থেকে গেলাম মুদি দোকানে। বৃষ্টি আসবে আসবে ভাব। কাল পহেলা বৈশাখ। দোকানদারকে মজা করেই শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম, শুভ নববর্ষ। স্মিত হেসে দোকানদার বললেন, ‘সব কিছু এখন আর মনে থাকে না। দেখেন না, একটু আগে ভূমিকম্প হয়েছে তা সবাই ভুলে গেছি!’
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমাত্রা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। যে কোনো সময় হতে পারে ভয়াবহ ভূমিকম্প। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে রাজধানী ঢাকা। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী নগরীর গড়ে ওঠা ৫ ভাগের অন্তত ১ ভাগ ভবন ঝুঁকির মধ্যে অথচ এ ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এ বিষয়ে সচেতনতা কতটা প্রয়োজন সহজেই অনুমেয়।

