ড. মো. তাসদিকুর রহমান
ঢাকার মসলিন নিয়ে গল্পের কোন শেষ নেই। ছোট বেলা থেকে এর অনেক গল্প শুনেছি বড়দের কাছে-দিয়াশলাইয়ের বাক্সে মসলিনের একটি শাড়ি রাখা যেত। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মেয়ে এই শাড়ি পরে বাবার সামনে এসেছিলেন, বাবা তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার এত বড় সাহস নগ্ন অবস্থায় আমার সামনে হাজির হয়েছো’। ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে এসব গল্পের। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল, আরব পর্যটক ইবনে বতুতা, ফরাসি পর্যটক ট্যাগনিরেসহ আরো অনেকের কথায় উঠে এসেছে মসলিনের কথা। তাঁদের কথায় জানা যায়, ঢাকা জেলার প্রতিটি গ্রামে কম বেশি তাঁতের কাজ হতো। কিন্তু সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মসলিন তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল সোনারগাঁ, ধামরাই, তিতবাড়ী, জঙ্গলবাড়ী, ও বাজিতপুর।
শুধু মসলিনের জন্যই সতেরো শতাব্দীতে ব্যবসা বাণিজ্যে দ্বাদশতম নগরী ছিল ঢাকা। এই সময়ে সমগ্র বিশ্বের বিত্তশালীদের পছন্দের কাপড় ছিল মসলিন। ব্রিটিশ আমলে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে তৈরি সস্তা সুতা বাংলার মসলিন শিল্পের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশরা কম দামে এদেশে সুতা রপ্তানির পাশাপাশি দেশীয় তাঁত শিল্পে ৭০-৮০ শতাংশ করারোপ করে। তা ছাড়া এ শিল্পের সাথে যে সকল তাঁতী জড়িত ছিলেন তাদের আঙুল কেটে দেয়া হতো। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের এই ঐতিহ্য ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
গত ৫-৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘর, দৃক গ্যালারি ও আড়ং-এর যৌথ উদ্যোগে ‘মসলিন ফেস্টিভাল-২০১৬’ অনুষ্ঠিত হলো। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ অনেক দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ এই ফেস্টিভালে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় যাদুঘরে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত, এমপি। ঐ দিন থেকে ‘মসলিন এক্সিভিশন’ এর পাশাপাশি ৬ ফেব্রুয়ারি আহসান মঞ্জিলে ‘মসলিন নাইট’ আয়োজন করা হয়। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা, রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন পেশা-শ্রেণির বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। সব শেষে ৭ ফেব্রুয়ারি দিনব্যাপী ‘রিভাইভ্যাল অফ মসলিন টেক্সটাইল ইন বাংলাদেশ’ নামে জাতীয় যাদুঘরে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এই সেমিনারে ৪টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। উপস্থাপকদের মধ্যে মিস রোজমেরি ক্রিল, সিনিয়র কিউরেটর, ভিক্টোরিয়া এন্ড আলবার্ট মিউজিয়াম যুক্তরাজ্য ‘রিভাইভাল অফ মসলিন-পলিসিস এন্ড ইনস্টিটিউশন’ বিষয়ে; ড. সোনিয়া আশমোর, রিসার্চ ফেলো মসলিন ট্রাস্ট ‘মসলিন রিস্টোরিং আওয়ার হেরিটেজ’ বিষয়ে; ড. মো. ফরিদ উদ্দিন, নির্বাহী পরিচালক, তুলা উন্নয়ন বোর্ড ‘ম্যানুফ্যাকচারিং মসলিন-চ্যালেঞ্জস ইন কটন গ্রোয়িং, স্পিনিং এন্ড ওয়েভিং’ শিরোনামে এবং সবশেষে মিস. দর্শন শাহ, ওয়েভার স্টুডিও, কলকাতা ‘মার্কেটিং মসলিন- ফাইন্ডিং ওয়েজ অফ সেলিং দ্যা নিউ মসলিন’ শিরোনামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। চেয়ারপারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক জনাব ফাইজুল লতিফ চৌধুরী, এনবিআর চেয়ারম্যান জনাব মো. নজিবুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জনাব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন এনডিসি, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মোশারফ হোসেন ভুইঞা। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, ভারতের টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ মিস রুবি পাল চৌধুরী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ড. হামিদা হোসেন, বিবি রাসেল, তামারা আবেদ, দৃক’র সিইও জনাব সাইফুল ইসলাম প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। মসলিনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গুণীজনেরা আলোচনা করেন।
কীভাবে এই মসলিন আবার আমরা ফিরে পেতে পারি সে বিষয়ে কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণ কর্মী হিসেবে আমার কিছু মতামত তুলে ধরতে চাই। আমরা যদি কয়েকশ’ বছর পূর্বে হারিয়ে যাওয়া সেই মসলিন তুলা ফিরে পেতে চাই তা অতীব কষ্টকর ও দুঃসাধ্য-তবে আমরা চেষ্টা করতে পারি। এ জন্য প্রয়োজন হবে-
প্রথমত, আমাদের দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মসলিনের তুলা গাছ খুঁজে পেতে সার্ভে করা যেতে পারে। সেই সময়ে বিশ্বের যে সব স্থানে উন্নতমানের জিন ব্যাংক ছিল সেই সব প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ এবং নামী-দামী যাদুঘরগুলোতে অনুসন্ধান করা। যদি কোন জীন ব্যাংক বা যাদুঘরে এর কোন জীবন্ত অংশ পাওয়া যায় তবে তা থেকে মসলিন পুনরুদ্ধার হতে পারে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের জিন ব্যাংকে সংগৃহীত বীজগুলো থেকে স্ক্রিনিং করে আবার দেখা যেতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে এ বিষয়ে সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সম্প্রতি ভারতে ২০০-৩০০ কাউন্টের সুতা উৎপাদিত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করেন। যা মসলিনের জন্য একটি সাফল্য। তবে এ বিষয়ে বিবি রাসেল একটি উক্তি প্রদান করেছেন, ‘মসলিন অবশ্যই চরকায় তৈরি কাপড় হতে হবে। যান্ত্রিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি কাপড়কে মসলিন হিসাবে স্বীকৃত দেওয়া ঠিক হবে না।’ তার বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করছি। তবে মি. দর্শন শাহ ‘নিউ মসলিন’-এর কথা বলেছেন-সেটি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করতে পারি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে কৃষি মেলায় তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একটি স্টলে এসে মসলিন পুনরুদ্ধারে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে মসলিনের পুনরুজ্জীবনের প্রযুক্তি আবিষ্কারের জন্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ প্রদান করেন। তার নির্দেশে একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে তাঁত বোর্ড। এ ছাড়া দৃক গ্যালারি ও তুলা উন্নয়ন বোর্ড বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা মসলিনের জাত সংগ্রহ করে তুলা গবেষণাগারে এর পরীক্ষা চালানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দৃক কর্তৃক সরবরাহকৃত বীজতুলা ভালোভাবে পরীক্ষা করে হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগে অর্থাৎ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)’র মাধ্যমে কাজ শুরু করা অতীব জরুরি। সচেতনতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে আমাদের কাজের পরিধি আলাদা করে নিতে হবে।
* গবেষণা ও সম্প্রসারণের কাজটি তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপর ন্যস্ত থাকবে।
* জাতীয় যাদুঘর ও দৃক গ্যালারির যৌথ উদ্যোগে মসলিনের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করবে।
* তাঁত বোর্ড তাতীদের উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা প্রদান ও সার্ভে করবে।
* সিডিবি, জাতীয় যাদুঘর, তাঁত বোর্ড, দৃক গ্যালারীর যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের মসলিন অধ্যুষিত এলাকায় স্লাইড শো, মোটিভেশনাল ওয়ার্ক, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচারাভিযান চালাবে।
* তবে সবার একটি বিষয়ে নজর দিতে হবে-যে কাজটি অতীব কঠিন। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং স্বীয় অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হওয়া। আমরা হারানো এই ঐতিহ্যের অধিকার যেমন ফিরে পেতে চাচ্ছি, তেমনি এই ঐতিহ্য যাদের কারণে বিলুপ্ত হয়েছে তাদের কাছে সরকারের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি আমাদের দেশ থেকে নেয়া এই সকল সম্পত্তিও ফেরত প্রদানের দাবি জানাতে হবে।
যদিও মসলিন পুনরুদ্ধারের কাজটি অনেক কষ্টসাধ্য; তবু আমরা যদি এটি নাও পারি তবে বাণিজ্যিকভাবে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ-এর মাধ্যমে ‘নিউ মসলিন’ বা ‘এজ মসলিন’ নামে এটির আবির্ভাব ঘটানো সম্ভব।
লেখক : উপ-পরিচালক, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, খামারবাড়ি, ঢাকা।

