ড. মো. শাফায়েত হোসেন
বীজ কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা কৃষির সামগ্রিক উন্নতি নির্ভর করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের উপর। যদিও এদেশে কৃষকের দ্বারা পূর্ববর্তী বছরে উৎপাদিত ফসলের রেখে দেয়া একটা অংশ পরবর্তী বছর বীজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে; কিন্তু বীজের সংজ্ঞামতে একে বীজ না বলাই ভাল। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ভাল বীজের গুরুত্ব উপলব্ধি করছেন দেশের সচেতন কৃষক সমাজ। ক্রমবর্ধমান হারে চাহিদা বাড়ছে ভাল বীজের। বীজ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সরকার তথা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিস্তৃতি লাভ করেছে প্রাইভেট সেক্টরেও। যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন বীজ কোম্পানি ও বেসরকারি সংস্থা। ইতোমধ্যে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষ করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশ আণবিক কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট ফসলের নতুন নতুন জাত তথা বীজ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবনে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছে। উদ্ভাবিত এ সকল প্রযুক্তি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণে অবদান রাখছে। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও সামগ্রিকভাবে বীজের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির ভূমিকাও কম নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং সরকারি-বেসরকারি বীজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিককালে বীজ উইং-এর কর্মকাণ্ড লক্ষ্যণীয়। বীজ এখন শুধু কৃষি উপকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বীজ একটি আধুনিক প্রযুক্তি (Modern Technology), একটি শিল্প (Industry) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর বীজকে অগ্রগণ্য শিল্প (Thrust Sector) হিসেবে সরকারি পর্যায়ে স্বীকৃতি প্রদান এখন সংশ্লিষ্ট সবার দাবি।

জাতীয় শিল্পনীতি-২০১০ এ বলা হয়েছে Thrust Sector হচ্ছে ঐ সকল সম্ভাবনাময় শিল্প বা শিল্প উপখাত (Industries/Industrial sub-sectors) যা ইতোমধ্যে GDP বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন (Industrialization) এবং দারিদ্র বিমোচনে (Poverty alleviation) সফলভাবে অবদান রেখেছে। উক্ত শিল্পনীতিতে কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড (Agro-based activity)/কৃষি-পণ্য (Agro-commodity)/খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প (Food processing industries) এর আওতায় ৩৬টি শিল্পকে তালিকাভুক্ত করা হলেও ‘বীজ শিল্প’কে এ তালিকায় রাখা হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রণীত আর্থিক নীতিমালা-২০০৮ (Financial policy-2008) এ তালিকাভুক্ত ৩৪টি শিল্পকে কৃষিভিত্তিক শিল্প (Agro-based industries) গ্রুপের আওতাভুক্ত করা হলেও বীজকে অন্তর্ভুক্ত না করে ‘বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ’ নামে ‘কৃষিভিত্তিক শিল্প’ (Agro-based industries) গ্রুপের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক হাইব্রিড বীজ উৎপাদনকে (ধান, ভূট্টা, সবজি ও তরমুজ) Thrust Sector হিসেবে তালিকাভুক্ত করায় বীজ শিল্প নিয়ে এক ধরণের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
‘বীজ শিল্প’কে Thrust Sector হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রয়োজন কেন : প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসা/শিল্পে বীজের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। GDP বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন এবং দারিদ্র বিমোচনে বীজের বিভিন্ন খাতওয়ারী কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ইতোমধ্যে বীজ শিল্প Thrust Sector হিসেবে যথেষ্ট যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রায় ৫০ হাজার চুক্তিবদ্ধ চাষী (Contract Growers) বীজ উৎপাদনের কাজে জড়িত। প্রায় ৫ লক্ষ শ্রমিক বীজ উৎপাদন ও বিতরণ কাজে নিয়োজিত। ১৬ হাজার বীজ ডিলার বীজ ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তাদের সঙ্গে আরো জড়িত আছেন প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার খুচরা বীজ বিক্রেতা। তাছাড়া প্রায় ৩শ’ প্রাইভেট সীড কোম্পানি বীজ আমদানি, বীজ উৎপাদন ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত। প্রায় ৩০টি প্রাইভেট সীড কোম্পানিসহ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বীজ শিল্প সংশ্লিষ্ট সুবিধাদী যেমন বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ (ড্রাইং, ক্লিনিং, গ্রেডিং), সংরক্ষণ ও বীজের মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু উদ্যোক্তা বীজ আলু, খাবার আলু ও সবজি সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন করেছেন।
বীজ ও বীজ থেকে উৎপাদিত পণ্য কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্প উন্নয়নে অবদান রাখছে। ফসলের জমি থেকে বীজ সংরক্ষণ পর্যন্ত বেশ কিছু শিল্প জড়িত। খামারে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাওয়ার টিলার, উইডার, হারভেস্টার, থ্রেসার ইত্যাদি। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণে বহুল ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি হচ্ছে প্রি-ক্লিনার, ক্লিনার কাম গ্রেডার, ড্রায়ার, ডিহিউমিডিফায়ার মেশিন প্রভৃতি। অতি সম্প্রতি দানাজাতীয় বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণে বিএডিসি’র ৩টি বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে অটো সীড প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে, বাংলাদেশে বীজ শিল্পে এটি একটি নতুন সংযোজন। বীজ প্যাকেজিং-এ ব্যবহৃত দ্রব্যাদি যেমন চটের ব্যাগ, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিইথিলিন, এ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এবং বীজ পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যেমন ময়েশ্চার মিটার, জার্মিনেটর, এ্যানালাইটিকাল ব্যালান্স, বিভিন্ন গ্লাসওয়ার সংশ্লিষ্ট শিল্প বিকাশে অবদান রাখছে। বীজ গুদামে সীড লট ফিউমিগেশনের জন্য বিভিন্ন ফিউমিগেন্টস এবং ফিউমিগেশন সীট-এর ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য, তা ছাড়া বীজ পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত এয়ার কন্ডিশনার, জেনারেটর প্রভৃতি মেশিনারিজ সংশ্লিষ্ট শিল্প বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এসব শিল্প বীজ শিল্পে শুধু যন্ত্রপাতিই সরবরাহ করছে না বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি তথা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র/আলু বীজ হিমাগারে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বা ডিজেলের মাধ্যমে প্রদেয় কর/ভ্যাটের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।
ফসলভিত্তিক বীজের অবদান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, শুধু হাইব্রিড ধান বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ধানের ফলন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৯ হাজার ৩ শ’ ৯৪ মেট্রিক টন হাইব্রিড ধান বীজ ব্যবহৃত হচ্ছে। উচ্চ ফলনশীল এবং মানসম্পন্ন বীজ আলুর ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে আলুর ফলন ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। ২০১০-১১ মৌসুমে আলুর ফলন হয়েছে ৮০ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি। ক্রমবর্ধমান হারে উৎপাদিত ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধান ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া আলুভিত্তিক বেশ কিছু খাদ্য শিল্প দেশে স্থাপিত হয়েছে (ফ্লেকস, স্টার্স, চিপস, ফ্রেন্স ফ্রাই, ময়দা ইত্যাদি) যা অর্থনীতিতে গুরুত্ব¡পূর্ণ অবদান রাখছে। পোলট্রি শিল্পে ভূট্টার ব্যবহার এখন যথেষ্ট ব্যাপকতা পেয়েছে। আর এসব হচ্ছে ভাল বীজের ব্যবহার বৃদ্ধির ফল। অতএব বীজ শিল্পকে Thrust Sector হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
বীজ শিল্পকে Thrust Sector ঘোষণা : বীজ শিল্পের উন্নতিকল্পে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কাজ করছে ‘বাংলাদেশ সোসাইটি অব সীড টেকনোলজি’। বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইং এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব সীড টেকনোলজি’র যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী জনাব দিলীপ বড়ুয়া বীজকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন; সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে তখন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন মন্ত্রী মহোদয়ের ঘোষণার দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হলেও বীজ শিল্পকে Thrust Sector হিসেবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেয়া হয়নি। তাই বীজশিল্পকে Thrust Sector হিসেবে দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট সকলের দাবি। এক্ষেত্রে দরকার কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা।
লেখক : উপ-ব্যবস্থাপক (বীপ্রস), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, কৃষি ভবন, ঢাকা।

