ড. মো. রেজাউল করিম
বাংলাদেশে আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ফসল। রপ্তানি হওয়ায় বর্তমান আলু অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে চিপস্, ক্রিপস, ফ্লাক্স, ফ্রান্স ফ্রাই ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য আলু শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। আলু নানাভাবে খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে খাদ্য নিরাপত্তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রপ্তানিযোগ্য মানসম্পন্ন আলু উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ অনেকাংশে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কলাকৌশলের উপর নির্ভর করে। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের প্রতিটি ধাপে রপ্তানিযোগ্য আলুর মান নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। আলু উৎপাদন হতে শুরু করে বিদেশে রপ্তানি ও তা উক্ত দেশে ভাল মানের খাবার আলু হিসেবে বিবেচিত হওয়া পর্যন্ত সার্বিক দায়িত্ব রপ্তানিকারককে বহন করতে হয়। অতএব প্রযুক্তি জেনে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে একজন আলু রপ্তানিকারণ কৃতকার্য হতে পারেন।
জমি নির্বাচন : বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটিতে আলুর আবাদ করা উত্তম। তবে ছায়াযুক্ত জমি পরিহার করা উচিত। মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমি আলু চাষের জন্য উপযুক্ত। পানি সেচের ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়।
জমি তৈরি : জমিতে জো আসার পর ভালভাবে চাষ করতে হবে। ট্রাক্টর/পাওয়ার টিলার দিয়ে লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি ৪/৫টি গভীর চাষের মাধ্যমে প্লাউপ্ল্যান ভেঙ্গে দিতে হবে ও মই দিয়ে জমির মাটি ঝুর ঝুরে করতে হবে যেন মাটির মধ্যে বাতাস চলাচল করতে পারে। মাটি ঝুরঝুরে হলে আলুর ফলন বৃদ্ধি পায়। জমিতে পূর্ববর্তী ফসলের অবশিষ্টাংশ অপসারণ ও আইলের পার্শ্ববর্তী আবর্জনা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। মাটির ঢেলা ভেঙ্গে দিতে হবে। মাটির ঢেলা আলুর বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টিসহ আকার অসম ও বিকৃত করে। সুষম সেচের জন্য জমি সমতল করতে হবে।
জাত নির্বাচন : বাংলাদেশে বর্তমানে আগাম, নাবি, রপ্তানিযোগ্য ও শিল্পে ব্যবহার উপযোগী জাতের আলু রয়েছে। রপ্তানির জন্য জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। আগাম জাত, নাবি জাত, তাপমাত্রা সহিষ্ণু জাত ইত্যাদি। এ ছাড়া আগাম টিউবার গঠন (Early Tuberization), আগাম আলু বৃদ্ধি (Early Bulking), দ্রুত আলু বৃদ্ধি (Quick bulking), সুপ্তাবস্থা (Dormancy), সংরক্ষণ গুনাগুণ (keeping quality) ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হবে। আরও উল্লেখ্য, কোন দেশে কোন জাতের চাহিদা রয়েছে সে বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে। কৃষক পর্যায়ে বেশি জনপ্রিয় কয়েকটি জাতের বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হলো:
রোপনের সময় : বীজআলু হিমাগারে সংরক্ষণ না করে প্রকৃতিক অবস্থায় (Ambient condition) দীর্ঘ সময়ব্যাপি রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখার জন্য রোপন সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে দেশে স্বল্প শীতকাল (Short winter) বিরাজ করায় এ ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা (Limitation) রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি রোপন সময় উল্লেখ করা হলো :
রোপন সময় ১ম-২০ সেপ্টেম্বর হতে ৩০ সেপ্টেম্বর
রোপন সময় ২য় -১ নভেম্বর হতে ১০ নভেম্বর
রোপন সময় ৩য় -১১ নভেম্বর হতে ২০ নভেম্বর
রোপন সময় ৪র্থ- ২১ নভেম্বর হতে ৩০ নভেম্বর
রোপন সময় ৫ম-১ ডিসেম্বর হতে ১০ ডিসেম্বর
রোপন সময় ৬ষ্ঠ-১১ ডিসেম্বর হতে ২০ ডিসেম্বর
উত্তরবঙ্গের উঁচু জমিতে আগাম রোপন সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে ফলন কিছুটা কম হবে। তবে ছোট আলুগুলো আগাম সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং বড় আকারের আলুগুলো রপ্তানি করা যেতে পারে। উপরোক্ত রোপন সময় অনুসরণ করলে আলু ২০ ডিসেম্বর হতে আমদানি শুরু করা যাবে এবং ২০ মে পর্যন্ত আলু হিমাগারে সংরক্ষণ না করে এ্যামবিয়েন্ট অবস্থায় রপ্তানি করা হবে। এতে খরচ কম হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দেশের রপ্তানিকারকগণ প্রতিযোগিতা করতে পারবেন।
বীজের হার :
বীজ প্রস্তুতকরণ :
বীজআলু অংকুরায়ণ : বীজআলু হিমাগার হতে বের করার পর বীজের শীর্ষাংকুর ভাঙ্গতে হয়। এতে গ্রোথ হরমোন সকল চোখে (Eye) ছড়িয়ে যায় এবং অংকুর সুষম হতে সহায়তা করে। বীজ অংকুরিত করে রোপন করতে হবে। অংকুরোদগমের জন্য বীজআলু শুষ্ক ঘরের মেঝেতে আবছা আলোয় অংকুরায়ণ হওয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে রাখতে হবে। কারণ আবছা আলো (Defuesed light) দ্রুত অংকুরায়নের জন্য সহায়ক। এতে অংকুর সুষম হয় ও গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে টিউবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ও ফলন বেশি হয়।
বীজআলু কর্তন : বীজআলু আড়াআড়ি না কেটে লম্বালম্বি কাটতে হবে। কর্তিত বীজের টুকরায় কমপক্ষে দু’টি সক্রিয় চোখ থাকতে হবে। বীজআলু ছোট করে কেটে খাবার আলু বের করা উচিত নয়। কাটার পূর্বে এবং মাঝে মাঝে হাত, চাকু, দা, বটি ইত্যাদি জীবানুনাশক (স্যাভলন/ডেটল) মিশ্রিত পানিতে ধুয়ে কাপড়ের টুকরা দ্বারা মুছে নিতে হবে। কাটার পর বীজ খণ্ডগুলো ঠান্ডা, খোলামেলা ঘরে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা বিছিয়ে রেখে ক্ষত শুকিয়ে নিতে হবে। বীজের কর্তিত টুকরা স্তুপ করে রাখা যাবে না। বীজ খণ্ডগুলো জমিতে নেয়ার সময় টুকরির মধ্যে বস্তা বিছিয়ে নিতে হবে। কর্তিত বীজখণ্ড বস্তায় ভর্তি করে মাঠে নেয়া ঠিক নয়।
বীজআলুর রোপন দূরত্ব : বীজ থেকে বীজ ৮ ইঞ্চি বা ২০ সে.মি.। সারি থেকে সারি ২৪ ইঞ্চি বা ৬০ সে.মি.। আলু বেশি বড় করার উদ্দেশ্য থাকলে বীজ থেকে বীজের দূরত্ব আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
রোপন পদ্ধতি : সারি উত্তর-দক্ষিণে হতে হবে। রোপন কাজ শুরু করার পূর্বে সুতলী ধরে সোজা করে ২-৩ ইঞ্চি গভীর রোপন নালা তৈরি করে নিতে হবে। বীজখণ্ডের ত্বক ও চোখ উপরে রেখে লম্বালম্বি হালকা চাপ দিয়ে বীজ লাগাতে হবে। ২০ সে.মি. (৮ ইঞ্চি) মাপকাঠি দিয়ে মাঝে মাঝে বীজ থেকে বীজের দূরত্ব মেপে নিতে হবে। বীজ বসানোর পর পর ৩-৪ ইঞ্চি গভীর সারের নালা তৈরি করে নালায় সার প্রয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে।
সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি : সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। আলু ফসলে অসম হারে মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে মূল্যবান সারের অপচয় হয় এবং মাটির গুনাগুণ নষ্ট হয়। তবে মাটি পরীক্ষা করে সার ব্যবহার করা উত্তম।
* চাষ শুরুর আগে বা এক চাষ দেয়ার পর গোবর সার সমস্ত জমিতে ছড়িয়ে দিতে হবে অথবা গুড়ো করা খৈল শেষ চাষের আগে ছিটিয়ে বপন করা যেতে পারে।
* জিংক সালফেট, জিপসাম ও বোরাক্স সার শেষ চাষের আগে ছিটিয়ে বপন করতে হবে। জমিতে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি থাকলে শেষ চাষের আগে ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ছিটিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
* অর্ধেক ইউরিয়া ও অর্ধেক এমপি সার বীজ রোপনের সময় সারের নালায় এবং বাকি অর্ধেক সার বীজ রোপনের ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
সারের নালা তৈরি : বীজ রোপনের পর রোপন নালার উভয় পার্শ্ব বরাবর হাত লাঙ্গল দিয়ে সারের নালা তৈরি করতে হবে। সারের নালা রোপন নালার চেয়ে কিছুটা গভীর হবে। সারের নালা টানা হলে দেখা যাবে রোপন নালার সম্পূর্ণ বীজ প্রায় ঢেকে গেছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সারের নালা টানার সময় যেন রোপনকৃত বীজ রোপন নালা থেকে সরে না যায়। রোপন করা বীজ আলুর লাইন থেকে সারের নালা ৭-১০ সে.মি. অর্থাৎ ৩-৪ ইঞ্চি দূরে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা :
সারের উপরি প্রয়োগ : বীজ রোপনের ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে অবশিষ্ট ইউরিয়া ও এমপি সার দুই সারির মধ্যবর্তী স্থান কুপিয়ে ও আগাছা পরিষ্কার করে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। সার মিশ্রিত কোপানো মাটি গাছের গোড়ায় দিতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, কোপানোর সময় শিকড় ও আলুর ষ্টোলন যাতে না কাটে এবং মাটি দেয়ার সময় গাছের পাতা যেন মাটিতে চাপা না পড়ে। সারের উপরি প্রয়োগ ও আলু গাছের গোড়ায় মাটি দেয়া শেষ হলে সেচ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

সার প্রয়োগের নালা এবং বীজআলু রোপনের সারির নক্সা
পানি সেচ : জমিতে রস না থাকলে প্রয়োজনমত সেচ দিয়ে মাটির জো আনা আবশ্যক। পানির অভাব হলে আলুর ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। রোপনের পর ১ম সেচ কেইলের অর্ধেক অংশ ও গাছের পূর্ণ বৃদ্ধির সময়ে ২য়, ৩য়, ৪র্থ সেচ (প্রয়োজনে) কেইলের তিন ভাগের দুই ভাগ এবং শেষ সেচের সময় কেইলের অর্ধেক অংশ পানি দ্বারা ভেজাতে হবে। পরিমিত পানি সেচে ফলন বৃদ্ধি পায় আবার অতিরিক্ত সেচ দিলে আলু ফসলের ক্ষতি হয়। তবে খেয়াল রাখা দরকার সেচের পানি যেন আলু ক্ষেতে দাঁড়িয়ে না থাকে। আলু ফসল দাঁড়ানো পানি সহ্য করতে পারে না। প্রয়োজনে ক্ষেত থেকে সেচের অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে। জমিতে সেচ দেয়ার সময় কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়। পরিপক্ক গাছ উপড়ে ফেলার অন্তত ১০ দিন পূর্বে সেচ বন্ধ করা উচিত।
আলুর রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন :
কাটুই পোকা দমন : কাটুই পোকা চারা গাছ কাটে এবং আলু ছিদ্র করে খেয়ে থাকে। কাটুই পোকা দমনের জন্য বীজ রোপনের ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে সারের উপরি প্রয়োগের পর সেচ প্রদানের আগে ক্লোরোপাইরিফস বা সাইপারমেথ্রিন জাতীয় ঔষধ অনুমোদিত মাত্রায় কেবলমাত্র গাছের গোড়ায় আলুর কেইল (Ridge) বরাবর স্প্রে করতে হবে। ভাইরাসের বাহক পোকা অর্থাৎ জাব পোকা দমনের জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয় ঔষধ সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করতে হবে।
আলুর মড়ক রোগের প্রতিকার : আলুর মড়ক বা লেট ব্লাইট একটি মারাত্মক রোগ। ফসলে এ রোগের আক্রমন হলে আর্দ্র আবহাওয়ায় ২/৩ দিনের মধ্যে সমস্ত ক্ষেতের ফসল বিনাশ হয়ে যেতে পারে। ঘন কুয়াশা, মেঘলা আবহাওয়া, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আলু ফসলের জন্য অনুমোদিত মেনকোজেব এর সাথে ডাইমেথোমরফ বা ফেনামিডন বা মেটালেক্সিল মিশ্রিত যে কোন রোগনাশক ঔষধ নির্ধারিত মাত্রায় ৭-১০ দিন অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। ঘন কুয়াশা, মেঘলা আবহাওয়া, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে ২-৩ দিন অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। তবে পরিষ্কার আবহাওয়ায় প্রতিদিন রোদ থাকলে ২/১ বার ঔষধ ব্যবহার না করলেও চলে।
ব্যাকটেরিয়াল উইল্ট : ব্যাকটেরিয়ার উইল্ট একটি মারাত্মক রোগ। এটি বীজবাহিত ও মাটিবাহিত রোগ। এ রোগ Ralstonia solanacearum জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়। বাংলাদেশের যে সকল এলাকায় আলু চাষ হয় তার অধিকাংশ মাটিতে এ রোগের ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। তবে সকল ব্যাকটেরিয়া প্যাথোজেনিক নয়। মাটি শোধন করে রোগমুক্ত বীজ রোপন ও পরিচ্ছন্ন চাষাবাদের (Clean cultivation) মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াল উইল্টযুক্ত আলু উৎপাদন করা সম্ভব। নিম্নের বিষয়গুলো অনুসরণ করে এ রোগ দমন করা যায়।
১। শস্যপর্যায় : শস্য পর্যায় অনুসরণ করলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কমে যায়। আমন, বোরো/গম এর সঙ্গে শস্যপর্যায় অনুসরণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
২। জমি পানির নীচে রাখা : এটা এরোবিক (Aerobic) ব্যাকটেরিয়া অর্থাৎ মুক্ত অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে। যদি ফ্লাড কন্ডিশনে জমি ৪-৫ মাস রাখা যায় তবে এনএরোবিক কন্ডিশনে (Anaerobic condition) ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে যায় ও এর প্রাদুর্ভাব কমে যায়।
৩। মাটি শোধন : আলু উৎপাদনের জন্য নির্বাচিত জমিতে আমন ধান রোপনের সময় কাদা মাটিতে একর প্রতি ১০-১৫ কেজি স্ট্যাবল ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগ করে মিশিয়ে দিতে হবে। কাদা পানিতে এনএরোবিক (Anaerobic) অবস্থায় ও ব্লিচিং পাউডারের ক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে যাবে। যদি তা সম্ভব না হয় তবে আলু রোপনের এক মাস পূর্বে ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগ করতে হবে। তা সম্ভব না হলে বীজআলু রোপনের নিমিত্ত জমি তৈরির সময় ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগ করতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে মাটিতে ভালভাবে ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে দিতে হবে।
রগিং : রগিং হলো ভাইরাস রোগসহ অন্যান্য রোগ ও অনাকাক্সিক্ষত গাছ তুলে ফেলা। রগিং একটি চলমান প্রক্রিয়া। বীজআলু গজানোর পর তিন পাতা প্রকাশ পেলে তখন থেকে হামপুলিং এর পূর্ব পর্যন্ত রগিং চালিয়ে যেতে হবে। রগিং করে রোগের উৎস সরিয় ফেললে সুস্থ গাছে রোগ সংক্রমণ করতে পারে না।
রগিং পদ্ধতি : সকালে এবং বিকাল রগিং এর জন্য উপযুক্ত সময়। সূর্যের বিপরীত দিকে মুখ করে রগিং করতে হবে যেন পাতায় সকল লক্ষণ স্পষ্ট বোঝা যায়। রগিংকৃত গাছ থলের মধ্যে বা কোন ব্যাগে রাখতে হবে এবং তা জমির বাইরে মাটিতে পুতে/পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আলুর গাছআলুসহ এবং ব্যাকটেরিয়াল রোগ হলে মাটিসহ তুলে ফেলতে হবে। রগিং এর জন্য দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে হবে। রগিং-এ নিয়োজিত ব্যক্তিদের পায়ে গামবুট ও এপ্রোন ব্যবহার করা ভাল। তবে গামবুট জীবাণুনাশক পানিতে ধৌত করে নিতে হবে।
হামপুলিং বা গাছ উপড়ে ফেলা : হামপুলিং হলো গাছ টেনে উপড়ে ফেলা। হামপুলিং এর ৭-১০ দিন পূর্ব হতে সেচ বন্ধ করতে হবে। তবে বালি মাটি হলে ৫-৭ দিন পূর্বে সেচ বন্ধ করা ভাল। বেশি দিন পূর্বে সেচ বন্ধ করলে বালি মাটির আলুতে হিট ইনজুরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফসল কর্তন (Crop Culting) করে আলুর আকার ও ফলন দেখে হামপুলিং এর তারিখ নির্ধারণ করতে হবে।
মাটির নিচে কিউরিং : হামপুলিং এর পর মাটি ও আলুর অবস্থার উপর নির্ভর করে ৭-১০ দিন পর্যন্ত মাটি নিচে রেখে আলুর ত্বক শক্ত করতে হবে (Skin Hardening)। আলুর ত্বক শক্ত হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা আলুর ত্বকে চাপ দিতে হবে। চামড়া না উঠলে বুঝা যাবে কিউরিং হয়েছে। অথবা চটের বস্তায় ২/৩ কেজি আলু উঠিয়ে ঝাকুনি দিতে হবে। যদি ছাল না উঠে তবে বোঝা যাবে কিউরিং হয়েছে। বীজআলু মাটির নিচে থাকা অবস্থায় প্রয়োজনে লাইনে মাটি দিয়ে আলু ঢেকে দিতে হবে যেন সূর্যালোকের কারণে আলুতে সবুজায়ন (Greening) ও হিট ইনজুরি না হতে পারে।
আলু উঠানো/সংগ্রহ : শুষ্ক, উজ্জ্বল ও ভাল আবহাওয়াতে আলু উত্তোলন করতে হবে। এক সারির পর পর কোদাল বা লাঙ্গল দিয়ে আলু উঠাতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আলু আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। আলু উঠানোর পর প্রখর রোদে রাখা যাবে না। মাঠে প্রাথমিক বাছাইয়ের মাধ্যমে কাটা, ফাটা, আংশিক পচা আলু বাতিল হিসাবে পৃথক করতে হবে যেন ভাল আলুর গাদার সাথে মিশ্রিত হতে না পারে। মাঠে বস্তায় অথবা চট দ্বারা আবৃত ঝুড়িতে ভরে সতর্কতার সাথে অস্থায়ী শেডে পরিবহন করে আনতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন আলুর বস্তা বা ঝুড়ি আছড়ে ফেলার কারণে আলুর ছাল উঠে না যায় অথবা আলুর ছাল উঠে থেতলে না যায়।
অস্থায়ী শেডে কিউরিং : ছায়াযুক্ত ঠাণ্ডা ও সহজে বাতাস চলাচল করে এমন উপযোগী করে অস্থায়ী শেড তৈরি করতে হবে। মাঠ থেকে কেবলমাত্র প্রাথমিক বাছাইকৃত আলু শেডের মেঝেতে বিছিয়ে রাথতে হবে যেন আলুর স্তুপ ৪৫ সে.মি.-এর বেশি উঁচু না হয়। এ অবস্থায় কমপক্ষে ৩-৫ দিন কিউরিং করতে হবে।
সর্টিং-গ্রেডিং : বাছাই ভাল হলে রপ্তানিযোগ্য আলুর মান ভাল হবে। রোগাক্রান্ত, আঘাতপ্রাপ্ত, আংশিক কাটা, ফাটা, অসম আকৃতির ও অতীব সবুজায়নকৃত আলু সঠিকভাবে বাছাই করে বস্তাবন্দি করতে হবে। বাছাইকৃত আলুতে দু’-একটি রোগাক্রান্ত বা খারাপ আলু থাকলে অবশিষ্ট আলুর মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আলু রপ্তানির সময় জাহাজেই পচে নষ্ট হবে। ভালভাবে বাছাই করে আলু রপ্তানিকারকের নির্দেশনা মোতাবেক গ্রেডিং করতে হবে। ক্রেতার চাহিদা অনুসারে আলুর আকার ও ওজন নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই মোতাবেক গ্রেডিং করে রপ্তানিকারক কর্তৃক সরবরাহকৃত বা বর্ণিত ব্যাগে আলু ভর্তি করতে হবে। তবে বিভিন্ন দেশের চাহিদা ভেদে ৭০-১১০ গ্রাম, ৯০-১৫০ গ্রাম বা ১২০ গ্রাম এর চেয়ে বেশি ওজন সম্পন্ন আলু রপ্তানির জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়।
সুপারিশ :
১। দেশের আবহাওয়ার পেক্ষাপটে আগাম (Early), নাবি (Late), আগাম টিউবার গঠন (Early tuberization), আগাম ও দ্রুত আলু আকার বৃদ্ধি (Early & quick bulking) ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে রপ্তানিযোগ্য আলু উৎপাদনের একটি প্যাকেজ টেকনোলজি প্রদান করা দরকার।
২। দেশের আবহাওয়া (Weather) ও জলবায়ু (Climate) বিবেচনা করে জাতের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন রোপনকাল (planting time) ও হার্ভেস্টিং সময় (Harvesting time) নির্ধারণ করতে হবে যেন আলু প্রাকৃতিক অবস্থায়/স্বাভাবিক অবস্থায় (Natural condition/Ambient codition) দীর্ঘ সময় ব্যাপি রপ্তানি করা যায়।
৩। আলুর জাত ছাড়করণের সময় বিভিন্ন দেশের চাহিদা বিবেচনা করে সেই মোতাবেক ভ্যারাইটাল ট্রায়ালের প্যারামিটার নির্ধারণ করতে হবে এবং ডাটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণপূর্বক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
লেখক : যুগ্ম পরিচালক (মান নিয়ন্ত্রণ) ও প্রকল্প পরিচালক (জীপ্রকৃবীউবমানিপ্র), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)

