ঢাকাWednesday , 16 December 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অপসংস্কৃতিকে পদাঘাত করে উড়ুক সংস্কৃতির বিজয় কেতন

Link Copied!

Kamal Lohani
কামাল লোহানী
রক্তস্বাক্ষরের সিমন্তিনী এই বাংলা। এই বাংলার মানুষ শক, হর্ষ, মোঘল, পাঠান কিংবা বেনিয়া ইংরেজ শাসনেও কোনভাবেই আত্ম-সম্মানবোধ বিসর্জন দেননি। কখনো কখনো পিছু হটতে হয়েছে, কিংবা চলার পথে হোঁচট খেয়েছেন, কিন্তু কোনদিনও আঘাতে-আগ্রাসনে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-উত্তরাধিকারকে পরশক্তি অথবা পরাশক্তির কাছে পরাভূত হতে দেননি। রক্তিম বাংলার প্রতিটি মানুষ গর্বভরে আপন ঐশ্বর্যকে লালন করেছেন, এগিয়ে নিয়ে গেছেন লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে। বাংলার গণমানুষের লড়াই-সংগ্রাম তাই নব নব উপাদানে সমৃদ্ধ করেছে সংস্কৃতির যুদ্ধকে, সংগঠিত করেছে সচেতন জনগোষ্ঠীকে বিদেশি পরাশক্তি সাম্রাজ্যলোভী স্বার্থবাদী বেনিয়া ইংরেজদের সুর্দঘী শাসনে-শোষণে, নিপীড়ন-নির্যাতনে, অবজ্ঞা-অবহেলায়। তাইতো রাজনৈতিকভাবে এদেশের সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ আর বিপ্লবে অকুতোভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নির্ভয়ে। দমন-পীড়ন কখনোবা পরাভূত করেছে, তবু চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কাসেম মাস্টার, টেগরার মতন আত্মনিবেদিত দেশপ্রেমিক জনগণকে আজও আলোর পথে চলতে দেখা যায়।
যে পরাশক্তি- ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আমাদের নানা মতলবে-কৌশলে পরাজিত করে রেখেছিল, তাকে অস্বীকার-অগ্রাহ্য করে বাংলার এ বিপ্লবী আন্দোলনের ধারা আমাদের ক্রমশ মুক্তির পথে আলোর দিশা দেখিয়েছে। তাই, ভারতবাসীর স্বাধীনতার লড়াই বাংলায় এক অপরাজেয় রুপ ধারণ করেছিল। তাই, গোটা স্বাধীনতা সংগ্রামকে ব্রিটিশ শাসক-দল কৌশলে বিভক্ত করে ভারতবর্ষকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেল। কিন্তু, বেনিয়া দুর্বুদ্ধির মোকাবিলায় বাংলার জনগণ বিভাজনের কূট কৌশলে পড়ে গিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির ঘৃণ্য কৌশলে- কৃষক বিদ্রোহ দমনে আত্মশক্তি নির্মমভাবে নিয়োগ করে প্রথমে মন্বন্তর পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তারপরে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ-বিভাগ চাপিয়ে দিয়ে মানুষে মানুষে বিরোধ-বৈরীতা সৃষ্টির অপপ্রয়াসে ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলো। এই সময়কালে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সংস্কৃতির যুদ্ধ চলেছে নিয়মিতভাবে। সৃষ্টি হয়েছে গণমুক্তির জাগরণী গান। চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ থেকে শুরু করে কমরেড মনি সিং-এর নেতৃত্বে হাজং বিদ্রোহ, কমরেড ইলা মিত্রের নেতৃত্বে নাচোল বিদ্রোহ, কমরেড অজয় ভট্টাচার্য্যরে নেতৃত্বে নানকার বিদ্রোহ তথা সারা বাংলার তেভাগার সংগ্রাম পশ্চিমের কাকদ্বীপ থেকে পূর্বে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, সিলেট, পাবনা- নানা স্থানে গণবিপ্লবের বিস্ফোরণ ঘটেছিল এবং প্রতিটি সংগ্রামে সৃষ্টি হয়েছিল গণসঙ্গীত, নাটিকা, আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত হয়েছিল কবিতা-গল্প (যা আজ প্রায় সবই হারিয়ে গেছে অথবা যাচ্ছে সরকারি অনীহা-অযত্নে)। মুক্তিযুদ্ধের পর সব মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এই মাটির সংস্কৃতিকে সন্ধান করে, সংরক্ষণ ও চর্চার মাধ্যমে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে। বাংলার মাটি আর প্রকৃতিতে লালিত মানুষ সংস্কৃতির কত না ঐশ্বর্যমণ্ডিত ধারা সৃষ্টি করেছে, তাকে ভুলে আমরা কেন “শৈবালদামে’ কেলি করাকেই পছন্দ করছি। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাবে নবপ্রজন্ম নিজের ঐতিহ্য-ঐশ্বর্যকে ভুলে গিয়ে আকৃষ্ট হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানি করা “ধুম ধারাক্কার” দিকে। যা কিনা আমাদের লোকসংস্কৃতির বিপুল ভাণ্ডারের অমূল্য রতনকে উপেক্ষা করতে শেখাচ্ছে, প্ররোচিত করছে অনেককে। সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কার্যক্রমে এই বিষয়টিই প্রাধান্য পাওয়া উচিৎ। একটা কথা বলে রাখতে হবে, আমরা বাংলার আপামর জনগণ কোনদিনও কোন ধর্ম-মত-ভাষা-সংস্কৃতিকে অবমাননা করতে চাই না। অতীতে বহু সংগ্রামেও আমরা বিদেশের ভাল জিনিসকে ভাষায়-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে গ্রহণ করেছি। আমাদের গ্রহণে কোন অনীহা নেই, আছে বিকৃতরুপে অপসংস্কৃতির যেকোন ধারাকে যে যতোই উটকো চমক দিয়ে ধাঁধাতে চেষ্টা করুক না কেন জনগণকে। জনগণই আমাদের পরিমাপ যন্ত্র। হিসেব করে দেখতে হবে চটকদার যা কিছু, তার আদৌ কোন কিছু গ্রহণযোগ্য কিনা? আজকাল আমাদের স্বদেশভূমি আক্রান্ত পরদেশি সংস্কৃতির অগ্রহণযোগ্য গণবিরোধী ধারায়। এই উটকো চমকদার পরিবেশনার নাটকীয় রূপরঙ মানুষের দর্শন-ইন্দ্রিয়কে বহুলাংশে আপ্লুত করে। কিন্তু তা যে ক্ষণস্থায়ী। মানুষকে সুড়সুড়ি দিয়ে আমোদে-প্রমোদে টানে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কোন প্রভাব ফেলতে পারে না। সেক্ষেত্রে এ ধরনের উটকো সঙ্গীতধারা কিছুদিন পরে জনপ্রিয়তা হারায় এবং লোকে ভুলে যায়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো- ক্ষতি যা করার তা করেই ফেলে। যাকে কাটিয়ে উঠতে বেশ সময় লাগে।
অন্যকে অভিযুক্ত করে নিজের দোষ এড়ানো যাবে না। আমরা যারা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বিশ্বাস করি এবং নিয়োজিত রয়েছে দশকের পর দশক ধরে, তারা এই উটকো প্রবণতা প্রতিরোধে কি কিছু করেছি? ঢালাওভাবে না বলতে হয়তো পারবো না, তবে এটাতো ঠিক, আমরা প্রচার মাধ্যমকে আকৃষ্ট করতে পারিনি। ফলে গণমাধ্যমে একটা অনীহা লক্ষ্য করছি। ওরা ভাষার গান, মুক্তিযুদ্ধের গান কিংবা এদেশের সকল দুঃশাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ফসল যেসকল গণসঙ্গীত রচিত ও নানা অনুষ্ঠানে দেশব্যাপী গীত হয়েছে, তাকে কেবল দিবসভিত্তিক আয়োচিত অনুষ্ঠানেই উপস্থাপন বা পরিবেশন করে থাকেন। গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে বলিষ্ঠ ধারা আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত জাগ্রত করেছে, তাকে আজ বিশেষভাবে নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে অব্যাহত রাখার প্রয়োজনে উপস্থাপন করে নতুন প্রজন্মকে বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিকে পরিচিত তো করেই ছিল, উপরন্তু তারা এসবকে পাশে ঠেলে দিলে বিদেশি ধুম ধারাক্কাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছে এবং সেই ‘অপরাধপ্রবণতা’ আজও চলেছে নির্বিবাদে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, আমাদের মতন গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক, সৈনিক যারা তারাও এই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রবণতার বিরোধীতা করেননি। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা দেশপ্রেমিক এবং এই ধারা লালন করেন মনে প্রাণে, তারাও কেন যেন হাতে গোনা দু’একটি সংগঠন বা ক’জন সচেতন সংস্কৃতিজন ছাড়া কেউ প্রতিবাদে সোচ্চার হননি। ফলে, গণসংস্কৃতিবিরোধী যে উটকো অপসংস্কৃতি, তাই বেনোজলের মতন ঢুকে পড়েছে সংগ্রাম-আন্দোলনের অভিজ্ঞতাপ্রসূত বলিষ্ঠ ও গণস্বীকৃত সংস্কৃতির আঙ্গিনায়। আমরা অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করেছি কিন্তু নিজেরাই নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে কালচারের নামে অনাচার দেখে গেছি।
এই যে নিরন্তর অবহেলা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বাজেটের তলানিতে পড়ে থাকা অর্থ কুড়িয়ে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বরাদ্দ দেয়া, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরব ভূমিকা- তত্ত্বের ঝড়ে তল্লাট মাতানোর কিংবা বাজিমাৎ করার বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়াই করেছে। থুথু উপরে ফেললে নিজের গায়েও পড়ে। আমরা এসবের তোয়াক্কা করিনি। ফলে, গণসংস্কৃতি আন্দোলনে আগের মতন ফসল ফলেনি। চলমান রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক পরিবেশ এবং এতে দুর্গতি-দুষ্টকর্ম নিয়ে যে গণসঙ্গীত বা গণনাটক সৃষ্টি একেবারে হয়নি, তা বলা যাবে না। যা-ও বা হয়েছে, তা সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য হয়নি। গণ্ডীবদ্ধ হয়ে সংগঠনেই চর্চিত হয়েছে, সাধারণের কাছে পৌঁছায়নি। জনগণের কাছে যেমন আমরা মুক্তিযুদ্ধপূর্ব পাকিস্তানি দুঃশাসনকালেও প্রতিবাদ প্রতিরোধে যে ব্যাপকতা ও জনগ্রাহ্যতায় মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি ‘সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ কিংবা সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সকল রক্তচক্ষুকে ভ্রুক্ষেপ না করে গণসংস্কৃতিকে জনগণের কাছে জাগৃতির আবাহন হিসেবে পৌঁছাতো, আজ সে ধারা যেন বিলুপ্ত প্রায়। কেন আজ আমরাই বা জনগণের কাছে তাদের অব্যক্ত বেদনা, অপ্রত্যাশিত অনাচারের বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াতে এবং জনগণের কাছে যেতে পারছি না- সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই খালি ময়দানটা পেয়ে একদিকে যেমন জঙ্গি, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি দেশব্যাপী মানুষ হত্যার ‘গুপ্ত হত্যা’ চালিয়ে যাচ্ছে কারণ তাদের সাধারণ মানুষের সামনে আসার সাহস নেই। তাই গোপনে পরিকল্পনা মাফিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। রাষ্ট্র ও সরকার এর কোন তাৎক্ষণিক যে বিচার করা দরকার তাতো করছেই না বরং উল্টো বিচারহীনতা এবং অপরাধের কোন শাস্তি না হওয়ায় ওরাই আরো ‘উৎসাহিত’ হচ্ছে। সলতে যারা পাকায়, তারা এ ধরনের নিস্ক্রিয়তাকেই অবলম্বন করে ক্রমশ সমাজে-সংস্কৃতিতে তথা জনসাধারণে প্রভাব ফেলছে। অবশ্য এই জনসাধারণের সংখ্যা যদিও কম এবং সমাজের উপরতলা অথবা একটা ক্রেজে-পাগল মানুষ এরা; তা থেকেই কিন্তু প্রশ্নটা আরো প্রবল হয়ে দেখা দিয়েছে- কেন এমন উটকো, গণচেতনাবিহীন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বড়াই করছে কতিপয় মানুষ বা চিহ্নিত মহল, সাধারণ মানুষের নব্বই ভাগকে দূরে সরিয়ে? অবশ্য, তাদের আত্মপ্রসাদ লাভের তৃপ্তি আছে। তাই বলছিলাম, এ ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা গণবিরোধী চরিত্রকে রুখে দেয়া, নিজস্ব সংস্কৃতির সুরক্ষা, চর্চা ও উপস্থাপনার দায়িত্ব তো আমাদের উপরই বর্তায়। সেই দায়িত্ব পালন যেমন করছি না, পরোক্ষে আমরাই অভিযুক্ত হচ্ছি না কি এই অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও বিস্তারে?
এই দেশটাতে কত যে সঙ্গীতের ধারা আছে, তাকে আমরা অবহেলা করে “শৈবালদামে” কেলি করতেই পছন্দ করছি। কিন্তু, সাধারণ মানুষ চান না নিজ সংস্কৃতির অবজ্ঞা সহ্য করতে পারেন না। কারণ, সমাজ-সংস্কৃতির লোকাচার, লড়াই-সংগ্রাম এমনকি ধর্মানুষ্ঠানেও মানুষ যে ব্যাপক রচনা, সুর ও গায়কীতে সমৃদ্ধ করেছেন, তার কোন তুলনা হয় না। অথচ তাকে অবহেলা করে নিজ সংস্কৃতির ক্ষতিসাধন করছি না, অনাদরে বিনা চর্চায় তাকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছি। একদিকে, যেমন ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক অপশক্তি লোকজ-সংগ্রামী নিজস্ব ধারার সংস্কৃতিকে বৈরী মানসিকতায় প্রতিরোধ করার সহিংস পন্থা অবলম্বন করেছে, তেমনি পরমুখাপেক্ষী উটকো সংস্কৃতির সেবায়েত চক্র ধুম-ধারাক্কার মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক ধারাকে ভিন্ন-গণবিমুখ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংস্কৃতিক-আগ্রাসনের দিকে টেনে নিয়ে যাবার অপকৌশলে মেতেছে। তাইতো ক’দিন আগে দেখলাম ‘লোকসঙ্গীত উৎসব’ নাম না দিয়ে ‘ফোক ফেস্ট’ নামে বঙ্গসংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী লোক সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গই করার অপচেষ্টা মেতেছিল। প্রথমবারের মতন একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এই অপকৌশলে বাংলাদেশের আর্মি স্টেডিয়ামে বিকৃত মানসিকতার সঙ্গীত মেলার আয়োজন করেছিল। বাংলাদেশের ক’জন নামী শিল্পীদের জনপ্রিয়তাকে অর্থের বিনিময়ে কলঙ্কিত করতে দ্বিধা করেনি। বিদেশ থেকে লোক গায়ক আমদানি করে লোক ধারা বলবো কি, নাকি ‘ফোক সং’ পরিবেশনার মাধ্যমে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীকে সুড়সুড়ি দিয়েছে। এমন কি কবিগুরুর গানকেও ফোক ফেস্ট রসে ডুবিয়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার স্পর্ধাও দেখিয়েছে। … আয়োজক বিত্তবান বাণিজ্য গোষ্ঠীর কাছে আমার ব্যক্তিগত প্রশ্ন, বাংলাদেশের নিজস্ব ধারার লোকসঙ্গীত ঐতিহ্যকে ওরা ইতিপূর্বে কোনদিন উৎসব আকারে আয়োজনের আদৌ কোন চেষ্টা করলেন না? এর পেছনে হয়তো বাণিজ্য মানসিকতা ছিল, মেনে নিলাম। কিন্তু এমন করে বাংলার লোক ঐতিহ্যকে অবমাননা করার এ আয়োজন কেন? আমরাতো প্রথমে বাঙালি, তারপর বিদেশীদের প্রতি আকৃষ্ট হবার কথা। নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিড়ম্বিত করে লোকসঙ্গীত ধারার অপার সুধা আহরণে ওদের এত দ্বন্দ্ব কেন? মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর চলছে। আজ পর্যন্ত আয়োজন করেছেন কি দেশের সর্ববৃহৎ মহান কীর্তি- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা সশস্ত্র যুদ্ধের যে জাগরণী, উদ্দীপক গান, করেছেন কি তার কোন উৎসবের আয়োজন? এদেশের মানুষ সেই ব্রিটিশ আমল থেকে মুকুন্দ দাস থেকে পাকিস্তান উপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রামের আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, সাধন সরকার, সুখেন চক্রবর্তী, হাকিম ভাই, আব্দুল লতিফ, রমেশ শীল, ফনী বড়ুয়া, অচিন্ত্য চক্রবর্তী প্রমুখদের মতন শিল্পী সংগ্রামীদের গানের কোন উৎসব বা যে কোন ধরনের আয়োজন করেছেন কি? কেন করেননি? বাংলার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে সংস্কৃতি যুদ্ধ করতে শিখিয়েছে, যে যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে আমরা শত্রুমুক্ত করেছি সশস্ত্র লড়াই করে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, সেই সব শহীদের আত্মদান, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার পুনর্বহালের সশস্ত্র লড়াই কেন বিফলে যাবে? আয়োজক যারা, তারাও তো ঐ দেশপ্রেমের অংশীদার, কিন্তু সেই বিত্তবানদের কাছে ‘বাণিজ্য’ এতো প্রিয় হলো যে মাতৃভূমির সঙ্গীত সম্পদকে অবহেলা করে নাগরিক জীবনের রঙ্গরসকেই প্রাধান্য দিলেন।
নগরে আজ ফেস্টের বাহার-বাহুল্য শুরু হয়েছে। হে ফেস্টিভ্যাল বলে যে আমদানি হয়েছিল, সেই উটকো সাহিত্য প্রয়াস নগর সাহিত্যিকদের কাছেও খুব একটা গ্রহণযোগ্য হয়নি। তীব্র সমালোচনার মুখে সেই সাহিত্য আয়োজনকে এবার অভিনব নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আধুনিকতার নির্মম প্রহসন- নাম হয়েছে ‘লিট ফেস্ট’। কেন ‘লিটারেচার ফেস্টিভাল’ হতে পারলো না এর নাম? সাহিত্য ক্ষেত্রেও কেন এই চমকের পেছনে ছোটা, আমার বোধগম্য হয় না। যে বাংলা একাডেমিতে এর বিশাল আয়োজন, সেই বাংলা একাডেমি কি নিজ দেশের বিপুল সাহিত্য ভাস্করের অমূল রত্নরাজ নিয়ে তিন থেকে সাতদিনের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য সম্মেলন করতে পেরেছে? করতে পারতো না? আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির বিশ্বখ্যাত আয়োজন ‘একুশে বইমেলা’ যখন ব্যাপক আকার ধারণ করছে তখন গুজব শুনছি বাংলা একাডেমি বইমেলাকে বিকেল তিনটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত গণ্ডিতে বাঁধার পরিকল্পনা করছে। বাংলা একাডেমি জঙ্গিবাদকে এতো ভয় পাচ্ছে? নিরাপত্তার চাদর আছে না? তাহলে তো ভয় পেয়ে সময়সীমা কমিয়ে দিয়ে জঙ্গিদেরই কি উৎসাহ দিতে যাচ্ছে না? … হায়রে বাংলা একাডেমি, জন্মই তো ‘অবাধ্যতার’ মাধ্যমে যে অবাধ্যতা আমাদের মুক্ত স্বদেশ ফিরে পেতে সাহায্য করেছে। ১৯৫২ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার একক-সাহসী সিদ্ধান্ত না নিতেন ছাত্রসমাজ, তবে কি এই বাংলা একাডেমির সৃষ্টি হতো? সেই বাংলা একাডেমি কি এই সাহিত্য পিয়াসী, সংস্কৃতি সংগ্রামীদের ভয় দেখাতে চায়? হায় রে স্বদেশ। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এই বাংলার কোন ভয় নেই, প্রতিরোধে বাংলা জ্বলে উঠতে জানে। মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করতে একাডেমি কেন ভূমিকা নিচ্ছে? এইসব অপপ্রয়াসকে আমার এবং আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মনে হয়। এমন সিদ্ধান্ত নেবেন না। জঙ্গিদের সাহস বাড়িয়ে দেবেন না। সংগ্রামী বাঙালি কখনও মাথা নত করে না।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর’ অসাধারণ কৃতিত্বপূর্ণ সফল আয়োজন। শুধু তাই নয়, এদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুধারসে পিপাসার্ত বিদগ্ধ শ্রোতৃমণ্ডলীর উপস্থিতি আয়োজকদের যেমন অনুপ্রাণিত করেছে তেমনি কিন্তু সঙ্গীত রসিকদেরও আগ্রহী করে তুলেছে। পণ্ডিত বারীন মজুমদারের অসুস্থ হওয়া ও পরলোক গমণ এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মেলনের ধারাকে ম্লানই নয়, স্তব্ধ করে ফেলেছিল। সেখানে বেঙ্গলের এই আসর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পিপাসুদের চাঙ্গা করে তুলেছে। ভারতের বরেণ্য পণ্ডিত শিল্পীদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে প্রবলভাবে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। সেই সাথে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গুরু-শিষ্য পরম্পরার ধারা তৈরির বিদ্যানিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা, সাধুবাদের আবেগ এখানে সীমাহীন। কারণ আগ্রহী শ্রোতা আছেন কিন্তু শিল্পচর্চার ঘাটতি প্রকট। সেটাই দূর করছে বেঙ্গল।
আয়োজনে হাজার হাজার দর্শক উপস্থিত থাকলে, জানি না হয়তো বাণিজ্যে লক্ষ্মী বসত করতে পারে, কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মাধুর্য্য কয়জন আস্বাদন করেন? সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং শ্রোতৃমণ্ডলীর চরিত্র নির্ণয় করে নিজেদের যাত্রাপথকে আরো গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করতে দোষ কি? … দুঃখ পেলাম, কষ্টও লাগলো, এহেন আয়োজনের মধ্যেও ‘ফেস্ট’ শব্দটা ঢুকে গেছে। মূল কার্ডের পেছনে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ছোট ছোট প্রতীকগুলোর মধ্যে প্রথমেই চোখে পড়লো ‘বিএফ মিউজিক ফেস্ট’ লেখাটি। তবে কি পরের বার যখন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আসর হবে তখন পর্দায় দেখবো ‘ক্ল্যাসিক ফেস্ট’ বা ‘ক্ল্যাসিক মিউজিক ফেস্ট’? না, আয়োজক সুহৃদদের অনুরোধ করবো অনুগ্রহ করে এতো নিচে নামাবেন না শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে। এই হীনমন্যতা যেন আপনাদের পেয়ে না বসে এই কামনা করি।
ফেস্টের যে হাওয়া বইছে, তার প্রভাবে দেখলাম ব্যান্ডপার্টি নয়, সঙ্গীত দলগুলোও নিজস্ব পরিচয় পরিহার করে অর্থাৎ ‘কনসার্ট’ শব্দটি ত্যাগ করে ওরাও ফেস্টে মেতেছে। তাই ওদের নাম হয়েছে ব্যান্ড ফেস্ট। কেন এই অতীত-ঐতিহ্য ভুলে যাওয়ার চেষ্টা? এটাকে কি অগ্রগতি, উন্নতি, যুগের সাথে তাল মেলানো বলে তর্কের জবাব দেবেন আয়োজকরা। নাকি বলবেন, আধুনিকতার আছর। যে সব দেশ থেকে এগুলো আমদানি করেন আপনারা, সেখানে সম্ভব এমন ক্রেজ কারণ ওরা বিত্তবান।
আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেশে ঘটে যাওয়া কতগুলো বঙ্গ সংস্কৃতিবিরোধী উটকো আচরণের কথাও আলোচনা করলাম। কারণ এইসব নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ড আমাদের উত্তরাধিকারের ঐশ্বর্য্যরে উপর আঘাত হানছে। বদলে দেবার চেষ্টা করছে বঙ্গসংস্কৃতিকেও। তবে বৃথা চেষ্টা, এটা হবার নয়। বাংলার জাগ্রত জনতা নতুনকে গ্রহণ করে মৌলভিত্তিকে ধ্বংস করে কিংবা উত্তরাধিকারকে অগ্রাহ্য করে নয়। নতুন যা কিছু ভালো, তাকে সংস্কৃতি গ্রহণ করছে, অতীতে করেছে, ভবিষ্যতেও করবে- এ বিশ্বাস আছে দেশবাসী জনগণের উপর। যা কিছু মন্দ, তাকে গ্রহণ করবে না, এটাই প্রমাণিত সত্য। সাময়িক বিভ্রান্তির সুযোগ নেই, তবুও যদি ঘটে তবে তা থেকে উত্তরণ জনগণই করবেন। আর সে কারণেই সাধারণ মানুষকেই আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। না হলে গণবিরোধী চক্রান্তই জয়ী হবে। যা জনসাধারণের কারোই কাম্য নয়।
সচেতন সংস্কৃতি কর্মী-সংগঠক-শিল্পী-সংগ্রামী সকলে আমরাতো বিশ্বাস করি- জনগণ আমাদের শক্তি- সংগঠিত গণশক্তিই আমাদের সাহস। আজ তাই দুষমন দূর্গে আঘাত হানতে হলে আমাদের যেতে হবে আমাদের সাহসের কাছে- বিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে যুদ্ধাপরাধী-জঙ্গি-সন্ত্রাসী-নরপিশাচ-ঘাতক-দানবদের বিরুদ্ধে যারা আজ মানুষকে হত্যা করছে, হুমকি দিচ্ছে, ভয় দেখিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখতে চাইছে, এদের রুখে দিতে চাই জনগণকে সাথে। তবেই প্রতিরোধ হবে জোরদার। মনে রাখবেন, কেবল নগরটাই দেশ নয়, গ্রাম-নগর-শহর-বন্দর সব মিলিয়েই বাংলাদেশ। আমাদের দেশ, আমাদের মাতৃভূমি। জয় আমাদেরই- জনগণেরই। এভাবেই আমরা ‘শহীদ স্মরণে আপন মরণে, রক্ত ঋণ শোধ করবো’। এই হোক সকলের সম্মিলিত বজ্রকঠিন উচ্চারণ।

*************** সমাপ্ত **************