ঢাকাSunday , 15 November 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চাষী পর্যায়ে মানসম্পন্ন বীজ প্রাপ্যতা : সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ

Link Copied!

ড. মো. শাফায়েত হোসেন
ভালো বীজ ব্যবহারের গুরুত্ব :
কৃষি উপকরণের মধ্যে মানসম্পন্ন বীজের গুরুত্ব অপরিসীম। একমাত্র মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারে শতকরা ১৫-২০ ভাগ উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। উৎপাদন বৃদ্ধি হলে খাদ্যশস্য আমদানি হ্রাস পাবে। ক্রমহ্রাসমান কৃষি জমির প্রেক্ষাপটে কৃষক পর্যায়ে উন্নতমানের বীজ ব্যবহারই খাদ্যশস্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। উন্নতমানের বীজ ব্যবহারে জমিতে বীজের পরিমাণ কম লাগে, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পায়। বীজশিল্প বিকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অধিক পরিমাণে উন্নতমানের বীজ উৎপাদনে একদিকে যেমন জাতীয় পর্যায়ে বীজ আমদানি খরচ কমে যাবে অপরদিকে বীজ রপ্তানি করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথও সুগম হবে। সর্বোপরি মানসস্পন্ন বীজ ব্যবহারে জমিতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে যাবে, বালাইনাশক ব্যবহার হ্রাস পাবে। ফলে পরিবেশ দূষণ কমে যাবে। বীজ যেহেতেু বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনশীলতা মৌলিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করে তাই কোন ফসল লাভজনকভাবে উৎপাদন করতে হলে ভাল বীজ ব্যবহার করতে হবে।
ভালো বীজ ব্যবহারে চাষীদের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণ :
উন্নতমানের কৃষি উপকরণ (Inputs) বিশেষ করে ভালবীজ ব্যবহারে চাষিদের সচেতনতা পূর্বের চেয়ে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দেশে শিক্ষার হার বিগত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা সচেতনতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলা যেতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় উন্নতমানের কৃষি উপকরণ-বিশেষ করে মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহারের সুফল সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণাও এ সচেতনতা বৃদ্ধির বিশেষ কারণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর চাষি পর্যায়ে প্রযুক্তি বিস্তারে গৃহিত বিস্তৃত কার্যক্রম ছাড়াও বিভিন্ন বীজ কোম্পানি এবং এনজিও কর্তৃক কৃষি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চাষিদেরকে উন্নতমানের কৃষি উপকরণ (Inputs) ব্যবহারে সচেতন করে তুলেছে।
দেশে বীজের চাহিদা এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায় হতে বীজ সরবরাহের চিত্র :

উৎসঃ কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিভাবে মানসম্পন্ন বীজ চাষিদের কাছে পৌঁছায় :
সরকারি পর্যায়ে মূলত বিএডিসি উন্নতমানের বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিতরণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চাষিদের কাছে বীজ পৌঁছে দিয়ে থাকে। বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (SCA) বীজের মান নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে ভূমিকা রেখে আসছে। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) চাষি পর্যায়ে বীজ উৎপাদন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সরকারি বীজনীতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন ও বিপণনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বীজনীতি বাস্তবায়নের ফলে বর্তমানে ব্যবসারত ও সম্ভাব্য বীজ ব্যবসায়ীরা এ খাতে আরও বিনিয়োগ করতে উৎসাহী। বেসরকারি বীজ খাতের দ্রুত উন্নয়নের ফলে গুরুত্বপূর্ণ হাটবাজার, উপজেলা ও জেলা শহর এমকি মহানগরগুলোতেও অসংখ্য বীজের দোকান গড়ে উঠেছে যা চাষিদের কাছে সহজে বীজ প্রাপ্তিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

চিত্র- বাংলাদেশে বর্তমান বীজ সরবরাহ চ্যানেল

চিত্র- বাংলাদেশে বর্তমান বীজ সরবরাহ চ্যানেল

মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্মিলিত প্রচেষ্টা :
জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম (NARS) : ১২টি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-কে নিয়ে জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম বা NARS গঠিত। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং বেসরকারি খাত নার্স-এর অঙ্গ না হলেও গবেষণা সহযোগিতার সংগে যুক্ত। এ সকল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হচ্ছে নতুন প্রযুক্তি বিশেষ করে নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন করা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ আনবিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর অবদান উল্লেখযোগ্য।
বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি (SCA) : বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি বীজশিল্প উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বীজ প্রত্যয়ন ও মান নিয়ন্ত্রয় বিষয়ে সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করে। নিয়ন্ত্রিত ফসলের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যয়ন আবশ্যিকভাবে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির দায়িত্ব এবং কর্তব্য। কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন কর্তৃক উৎপাদিত ভিত্তি বীজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রত্যয়ন বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি করে থাকে। এ সংস্থা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক উৎপাদিত স্বেচ্ছাভিত্তিক ভিত্তি ও প্রত্যায়িত বীজের মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রত্যয়ন করে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিএডিসি এবং অন্যান্য বীজ উৎপদনকারী প্রতিষ্ঠানের বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম মনিটরিং করে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (BADC) : সরকারি পর্যায়ে কি পরিমাণ বীজ উৎপাদিত হবে তা জাতীয় বীজ বোর্ডের সীড প্রোমোশন কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সরকারি পর্যায়ে একক বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধান, গম, ভূট্টা, আলু, পাট, ডাল ও তৈলবীজ এবং সবজিবীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিতরণ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির ৩৩টি বীজ উৎপাদন খামার রয়েছে যাতে বিভিন্ন ফসলের ভিত্তিবীজ উৎপাদিত হয়। ১৫টি চুক্তিবদ্ধ চাষি জোনের মাধ্যমে ধান ও গমের প্রত্যায়িত মানের বীজ, ২০টি চুক্তিবদ্ধ জোনের মাধ্যমে প্রত্যায়িত মানের আলুবীজ, ৬টি জোনের মাধ্যমে পাটবীজ, ৪টি জোনের মাধ্যমে ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন করা হয়। এ সমস্ত বীজ প্রসেসিং সেন্টারে প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করা হয় এবং মৌসুমের পূর্বে প্যাকিং করে বিক্রয়ের জন্য বীজ বিপণন বিভাগে প্রেরণ করা হয়। বীজ বিপণন বিভাগ ২২টি বীজআলু হিমাগার, ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র এবং নির্বাচিত ডিলারদের মাধ্যমে বীজ বিক্রয় করে থাকে। বিএডিসি আপতকালীন মজুদ হিসাবে কিছু বীজ উৎপাদন করে এবং বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারীদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) : জাতীয় কৃষি গবেষণা সিস্টেম (NARS)-এর অন্তর্ভুক্ত কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ভাবিত উন্নততম কৃষি প্রযুক্তি এ সম্প্রসারণ কার্যক্রম এর মাধ্যমে কৃষকদের নিকট পৌঁছানো হয়। এ অধিদপ্তরের আওতায় বীজ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকদেরকে বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
বেসরকারি কোম্পানী : বীজনীতির আলোকে বেসরকারি পর্যায়ে বীজ ব্যবসায় তথা বীজ বিপণনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে সরকারি পৃষ্টপোষকতা এবং দাতা সংস্থাসমূহের প্রচেষ্টায় এবং বীজ ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় বিগত কয়েক বছরে বিশেষ করে সবজি বীজ বিপণনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শস্য বীজের ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন এসেছে। হাইব্রিড ধান ও ভুট্টার উৎপাদন এবং বিপণনে বেসরকারি কোম্পানি এবং এনজিও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রাখছে। বীজ বিপণনের উজ্জ্বল সম্ভাবনার ক্ষেত্র লক্ষ্য করে বর্তমানে বেশ কয়েকটি বহুজাতিক বীজ উৎপাদন/বিপণনকারী কোম্পানি এগিয়ে এসেছে এবং স্থাপিত হয়েছে জয়েন্ট ভেঞ্জার কোম্পানি।
এনজিও : বর্তমানে অনেক এনজিও বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে অংশ নিচ্ছে এবং দু’একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ করছে। বেশ কয়েকটি এনজিও প্রতিষ্ঠান যেমন- ব্র্যাক, গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশন, প্রশিকা, আরডিআরএস এসব বীজ শিল্প উন্নয়নে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বীজ ডিলার : চাষি পর্যায়ে বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে বীজ ডিলারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বীজ আইন ২০০৫ এ দেয়া বীজ ডিলারের সংজ্ঞা অনুযায়ী যারা বীজের কাজের সাথে জড়িত তারা ৪ প্রকার। যথা- ১. বীজ বিক্রেতা (ডিলার) ২. বীজ উৎপাদক ৩. বীজ ব্যবসায়ী ৪. বীজ শিল্প উদ্যোক্তা। এসব অংশীদারদের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষক ফসল উৎপাদনের জন্য ভাল বীজ পেয়ে থাকেন। বীজ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে বীজশিল্প উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী বীজ বিক্রয় করতে হলে বীজ ডিলারদেরকে জাতীয় বীজ বোর্ডে নিবন্ধিত হতে হবে। বাংলাদেশে বীজ ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১৮,০০০ বীজ বিক্রেতা (ডিলার) জড়িত। একজন ভাল বীজ ডিলার যা করবেন না তা হল : খারাপ মানের বীজ বিক্রি করবেন না, বীজ প্যাকেট বীজ সম্পর্কিত পূর্ণতথ্য না থাকলে সে বীজ বিক্রি না করা, ক্রেতার অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা, দাম্ভিকতা বা হামবড়া মনোভাব পরিহার করা, মেয়াদ উত্তীর্ণ বীজ বিক্রয় না করা, জ্ঞাতসারে নকল বীজ বিক্রয় না করা।

লেখক : উপব্যবস্থাপক (বীপ্রস), বিএডিসি, ঢাকা