ঢাকাSunday , 8 November 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দীপন হত্যা এবং তারপর

Link Copied!

বদরুদ্দীন উমর
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ৩১ অক্টোবর তার পুত্র ফয়সল আরেফিন দীপনের নৃশংস হত্যার পর বলেছেন, তিনি তার পুত্র হত্যার কোনো বিচার চান না। তার এ কথার মমার্থ বোঝার অসুবিধা নেই। তিনি বিচার চান না এ কথা বলার আসল অর্থ এ দেশে এখন কোনো অপরাধীর বিচার নেই, শাস্তি নেই। হত্যার পর হত্যা শুধু ধর্মান্ধ ঘাতকদের দ্বারাই হচ্ছে না। পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদি সরকারি বাহিনীও মানুষ মারছে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে। দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এ দেশে আইনের শাসন বলে কিছুই নেই। যেখানে আইনের শাসন বলে কিছু নেই, সেখানে বিচার চাওয়া অর্থহীন। কার কাছে মানুষ বিচার চাইবে? যাদের কাছে এ দেশের নাগরিকরা বিচার চাইতে পারেন, তারা কোনো সুষ্ঠু বিচার ও বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। উপরন্তু তারা এমনভাবে দেশ শাসন করছে যে, অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে শোক বিধ্বস্ত আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, তিনি তার পুত্র হত্যার বিচার চান না। তার এ কথা এ দেশের শাসনব্যবস্থার প্রতি ধিক্কার ছাড়া আর কিছু নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, অভিজিৎ রায়ের পিতা অধ্যাপক অজয় রায় গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তার পুত্র হত্যার বিচার চেয়ে আসছেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। অপরাধীকে ধরার ব্যাপারে সরকারের শৈথিল্য ও ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এখনও বলেছেন, তার পুত্র হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে কোনো উপযুক্ত দায়িত্বশীল উদ্যোগ নেই। শুধু তাই নয়, অধ্যাপক ফজলুল হকের উপরোক্ত উক্তির পর অভিজিতের স্ত্রী বন্যা তার ফেসবুকে বলেছেন, তিনিও তার স্বামী হত্যার বিচার চান না! (ডেইলি স্টার, ০২.১১.১৫)। এরা যে এভাবে বলছেন এর প্রকৃত অর্থ কি এই যে, এরা এসব হত্যার বিচার চান না? কোনো আহাম্মক বা হৃদয়হীন লোক এটা বিশ্বাস করবে?
কিন্তু এটা ‘বিশ্বাস’ করার মতো লোক আছে। মাহবুবউল আলম হানিফ নামে আওয়ামী লীগের এক নেতা সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে বলেছেন, যা আমি নিজেও শুনেছি। তিনি বলেছেন, ‘যে অধ্যাপকের পুত্র নিহত হয়েছে তার পিতা হত্যাকারীদের আদর্শে বিশ্বাসী হতে পারেন। তিনি এ ধরনের কথা বলেছেন কারণ তিনি তার পার্টির লোকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান না?’ এই কথাবার্তা কি কোনো সভ্য দেশে সম্ভব? কোনো স্বাভাবিক লোকের পক্ষে সম্ভব? এ ধরনের কথাবার্তা কি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কোনো দলের মুখপাত্রদের পক্ষে বলা সম্ভব? কিন্তু এখন বাংলাদেশে সবই সম্ভব। কারণ যারা ক্ষমতায় বসে আছে, তাদের কোনো দায়িত্ববোধ জনগণের প্রতি নেই। কোনো অপরাধকেই তারা অপরাধ মনে করে না, যদি না সেটা তাদের স্পর্শ করে। এরা এবং এদের দ্বারা পরিচালিত সরকারি বাহিনীগুলো আজ বাংলাদেশে যেভাবে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে, এর কোনো তুলনা এ দেশে নেই। হানিফ নামে যে সরকারি মুখপাত্র উপরোক্ত উক্তি করতে পেরেছেন, তার ও তার দলের লোকদের বুদ্ধি, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতাবোধ বলে যে কিছুই নেই, তার ওই বক্তব্য থেকে এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী আছে?
জোট সরকারের দু’জন মন্ত্রী বলেছেন, এই অপরাধ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি বানচাল করার জন্য ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। আমি টেলিভিশনে এদের একজনের এ বক্তব্য শুনেছি। অন্য কথা বাদ দিয়ে এই বক্তব্যের মধ্যে কি কোনো বুদ্ধির পরিচয় আছে? আইনি প্রক্রিয়ায় যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, তারা কীভাবে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দণ্ড থেকে রেহাই পেতে পারেন? এ ধরনের কথাবার্তার কোনো আগামাথা না থাকলেও এরা এভাবেই কথা বলে যাচ্ছেন। কারণ জনগণের প্রতি তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। তাদের দায়িত্ববোধ, বিবেক বলে কিছুই নেই। এ কারণেই হানিফের মতো লোকের উপরোক্ত বক্তব্য দেয়া সম্ভব। এ বক্তব্যের অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই।
এ সরকার যে প্রত্যেক অপরাধের জন্য তাদের প্রতিপক্ষদের, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে নিজেদের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে, এর মধ্যে দায়িত্ববোধের পরিচয় তো নেই-ই, নৈতিকতারও কোনো পরিচয় নেই। বিএনপি-জামায়াত কোনো ফেরেশতাদের পার্টি নয়, এটা সবাই জানে। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, দেশে অন্য দল ক্ষমতায় থাকার সময় প্রত্যেকটি অপরাধ তারাই করে যাচ্ছে? আওয়ামী লীগের লোকরা কি অপরাধ করছে না? তারা কি ফেরেশতাদের দল? তাদের মধ্যে কি অপরাধী নেই? তাদের নানা অপরাধের খবর কি নিয়মিতভাবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে না? কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদেরকে অপরাধী এবং আওয়ামী লীগ দলভুক্ত বলে সরকার কি স্বীকার করছে? যে কোনো ব্যক্তি বা দল অপরাধ করে সে অপরাধের জন্য অনুতপ্ত না হলে বা সে অপরাধ স্বীকার না করলে তাকে ন্যায়সঙ্গতভাবে কী আখ্যা দেয়া যেতে পারে?
আওয়ামী লীগের এই শাসন আমলে অপরাধীরা যেভাবে সব ধরনের অপরাধ করছে, তার মূল কারণ এ দেশে এখন প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলেই পুলিশ কতগুলো ভুয়া লোককে গ্রেফতার করে দেখাতে চায় যে তারা অপরাধী পাকড়াও করেছে। কিন্তু কোনো প্রকৃত অপরাধী তারা পাকড়াও করে না। অভিজিৎ রায় হত্যার সময় থেকে পরপর যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার কোনোটিরই সুরাহা হয়নি। অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে আছে। এর কারণ হতে পারে দুটি। প্রথমত, সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর অপরাধী শনাক্ত করার কোনো যোগ্যতা নেই। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কতগুলো অপদার্থ লোককে সরকার প্রতিপালন করছে এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এর দ্বিতীয় কারণ হতে পারে সরকার এসব অপরাধের নায়কদের শাস্তি দিতে অনিচ্ছুক। তারা এ অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক অথবা এদের প্রতি নরম। দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণে সব রকম অপরাধী এখন সক্রিয় হয়েছে। নতুন নতুন ক্ষেত্রে তারা অপরাধ করছে এবং তা করছে বেপরোয়াভাবে এটা জেনেশুনে যে সরকার যাই বলুক, তারা আইনের আওতার বাইরে থাকবে।
বিগত মহররমের সময় আশুরার দিনে ঢাকার হোসনি দালানে বোমা বিস্ফোরণে একেবারে নিরীহ মানুষ হতাহত হয়েছে। অন্য অনেক জায়গায় প্রায়ই বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। গুপ্তহত্যা, প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা থেকে নিয়ে নানা ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। এসব সম্ভব হতো না, যদি দেশের ক্ষমতাসীন সরকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখত। সব রকম অপরাধের জন্য সরকার নিজেকে দায়মুক্ত রেখে বিরোধীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে যাচ্ছে। এর কোনো ব্যতিক্রম নেই। দীপন হত্যা এবং ‘শুদ্ধস্বর’ নামে প্রকাশনার পরিচালকের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রেও তাদের এই একই বক্তব্য! যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের দায়িত্ব থাকে দেশে আইন-শৃংখলা বজায় রাখার, দেশের জনগণকে যথাসম্ভব শান্তিতে রাখার, বিপদমুক্ত রাখার। এ বিষয়টি নতুন নয়। এ কারণে প্রাচীন ভারতে যে কোনো অপরাধ বা জনগণের দুঃখ-দুর্দশার জন্য রাজাকে দায়ী করা হতো। বাংলাদেশের সরকার এ দায়িত্ব নিতে সম্পূর্ণ অপারগ। তারা দেশ শাসন করছে, অনেক মজা করছে, কিন্তু দেশকে অপরাধমুক্ত রাখা তাদের দায়িত্ব নয়! তারা যে কোনো অপরাধীকেই শনাক্ত করে শাস্তি দিচ্ছে না বা দিতে পারছে না, এজন্য তাদের কোনো লজ্জাবোধ নেই। উপরন্তু আছে ঔদ্ধত্য! তাদের এই ঔদ্ধত্য উপর থেকে নিচ পর্যন্ত লোকদের মধ্যেও লক্ষ্য করার মতো। এরা ক্ষমতায় থেকে সব রকম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে। বলা চলে অপব্যবহার করে। কিন্তু যাদের ঘাড়ে চড়ে এরা ক্ষমতাসীন হয়, এদের কাছে তাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। হানিফের মতো আওয়ামী লীগ নেতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বেপরোয়া মন্তব্যের মধ্যে এরই প্রমাণ পাওয়া যায় সন্দেহাতীতভাবে। এ পরিস্থিতিতে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক যখন বলেন, তিনি তার পুত্র হত্যার বিচার চান না, তখন তার মধ্যে বাংলাদেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রতিফলনই দেখা যায়।

লেখক : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল