ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান
সাম্প্রতিককালে আমাদের শিক্ষায় অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতিসহ নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছে। আর এসব অপরাধ রোধে দেশের প্রচলিত আইনে তেমন কার্যকর সুরক্ষা নেই। এর ফলে শিক্ষা সেক্টরে বড় ধরনের অপরাধ করেও প্রচলিত আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী চক্র। এ প্রেক্ষিতে যুগোপযোগী ‘শিক্ষা আইন’ প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি দীর্ঘদিন থেকেই সর্বমহলেই অনুভূত হচ্ছে। এছাড়াও শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টরাও মনে করছেন শিক্ষায় গতিশীলতা সৃষ্টি করতে শিক্ষা আইন প্রণয়ন অপরিহার্য।
প্রসঙ্গত, মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গত কয়েক বছরে প্রাথমিক সমাপনী থেকে শুরু করে বিসিএসসহ প্রায় সব ধরনের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়। সর্বশেষ মেডিকেল ভর্তিপক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক হৈ-চৈ চলছে। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ-সমাবেশ, ধর্মঘট ও আমরণ অনশনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। এ নিয়ে শিক্ষাবিদ-সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা পত্রিকায় লেখালেখিও করেছেন। অথচ উত্থাপনকারীদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ফাঁস হয়নি বলে দাবি করে আসছেন। শিক্ষামন্ত্রী পত্রপত্রিকায় একাধিক কলাম লিখেও এর জবাব দেন। প্রশ্ন ফাঁস রোধে করণীয় নিয়ে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে মন্ত্রণালয়ে সভাও করেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখানে তাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড লক্ষণীয়।
মনে হচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্টদের কিছুটা বোধোদয় হয়েছে। শিক্ষাবিদদের পরামর্শ আমলে নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিদ্যমান আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ২৫ পৃষ্ঠার প্রস্তাবিত আইনের পাঁচটি অধ্যায়ের ৬৯টি ধারায় ৩শ উপধারা আছে। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বিশেষজ্ঞসহ সাধারণ জনগণের মতামতের সুযোগ রেখে গেল মঙ্গলবার খসড়াটি ওয়েবসাইটে (www.moedu.gov.bd) প্রকাশ করা হয়।
নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এর মধ্যেও ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ এর মত লুকোচুরি করা হয়েছে। যেহেতু বিশেষজ্ঞসহ সাধারণ জনগণের মতামত চাওয়া হয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে মতামত দেয়ার আগে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনটির ভালো-মন্দ দিকগুলো জনসাধারণের সামনে তুলে ধরলাম।
নিজে আইনবিদ কিংবা শিক্ষাবিদ নই, এ সম্পর্কে আমার জ্ঞান যৎসামান্য। শিক্ষা নিয়ে গবেষণার সুবাদে শিক্ষা ও শিক্ষাবিষয়ক যেকোনো বিষয়ে বরাবরই আমার আগ্রহ একটু বেশি। এ জন্য মাঝেমধ্যেই লেখালেখির চেষ্টা করি। যাই হোক, একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও মতামত দেয়ার সুযোগ রয়েছে। সেই থেকে আমার আজকের এই লেখা।
আমরা জানি, প্রতিটি আইনে ভালো-মন্দ দুটি দিক থাকে। তবে কোথাও মন্দ দিকটি বেশি থাকলে তা বাস্তবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি দেখে কিছুটা সে রকমই মনে হয়েছে। এর অনেকগুলো ভালো দিক থাকা সত্ত্বেও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কম গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, অনেক পাশ কাটানো হয়েছে। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে এখানে পয়েন্ট আকারে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০১৫ এর ভালো-মন্দ দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করলাম। এটা আমার একান্তই নিজস্ব মতামত, এর সাথে দেশের শিক্ষাবিদ কিংবা অন্যেরা দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন।
ভালো দিক
এক. প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় শিক্ষার প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তোলার জন্য ৪ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত শিশুদের ২ বছর মেয়াদে বিদ্যালয়ে প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই আইনের এটি একটি ভালো দিক।
দুই. প্রস্তাবিত আইনে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা রাষ্ট্রের ব্যয়ে পরিচালিত এবং তদারকি ও উন্নয়নের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
তিন. প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য রোধে গুরুত্ব প্রদান এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা রয়েছে।
চার. বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতির বিধান রয়েছে। শিক্ষকদের নন-ভ্যাকেশনাল ডিপার্টমেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি এবং শিক্ষার বাইরে শিক্ষকদের অন্য কাজে না লাগানোর বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাঁচ. প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ও এবতেদায়ি মাদরাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করার কথা বলা হয়েছে।
ছয়. বিদেশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি কোনো শাখাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন এবং বিদেশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতায় ও লেভেল এবং এ লেভেল বা সমপর্যায়ে শিক্ষাদান কার্যক্রম উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণ ধারার সমপর্যায়ের বাংলা ও বাংলাদেশ স্টাডিজ বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
সাত. সাধারণ ধারার মতো ৪ বছর মেয়াদী ফাজিল অনার্স এবং ১ বছর মেয়াদি কামিল কোর্স ক্রমান্বয়ে চালু এবং তদারকির জন্য একটি শিক্ষা কমিশন গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
আট. মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট স্থাপন এবং কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার মানোন্নয়নে ও যুগোপযোগী করার পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
সর্বোপরি শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে আরো বেশ কিছু ভালো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সত্যিই এগুলো শিক্ষার মানোন্নয়নে খুবই ইতিবাচক।
এতদসত্ত্বেও বেশ কিছু দুর্বল দিক এর ভাল দিকগুলো ছাপিয়ে দিয়েছে। ফলে এগুলো দূর না করে আইনটি পাস হলে বাস্তবে কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।
এক. প্রস্তাবিত আইনের ৬৭ ধারায় পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস অথবা এর সঙ্গে জড়িত থাকলে বা সহায়তা করলে সর্বোচ্চ ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। আজ যখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি জাতির জন্য মহামারি আকার ধারণ করেছে তখন এক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কেননা, ১৯৮০ সালের আইনেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ১০ বছরের শাস্তির বিধান ছিল, যা ১৯৯২ সালে সংশোধন করে সাজা ৪ বছর করা হয়। এছাড়াও শিক্ষায় অন্যান্য দুর্নীতিরোধে শাস্তির বিধানও বেশ নমনীয়।
দুই. নোট-গাইড নিষিদ্ধ করার বিধানের প্রস্তাব করা হলেও তা কীভাবে কার্যকর করা হবে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং দিকনির্দেশনা নেই। শাস্তির বিধানও নমনীয়।
তিন. আজকে যখন সব পর্যায়ের শিক্ষকরা তাদের বেতন-ভাতা এবং পদমর্যাদা নিয়ে আন্দোলন করছেন সেসময়ে এই প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় শিক্ষকদের বেতন-ভাতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। এটা এই আইনের বড় দুর্বলতা।
চার. টিউশন-কোচিং বন্ধে কঠোর কোনো নির্দেশনা নেই এতে। ক্লাসে পাঠদান নিশ্চিত না করলে বা শিক্ষকরা শিক্ষা আইনের ধারা লংঘন করলে কোনো শাস্তি দেয়া হবে কি না- সে বিষয়েও কোনো নির্দেশনা নেই।
পাঁচ. প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় স্কুল-মাদরাসা নির্বিশেষে একই ধারার শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। যা বাস্তবে অকার্যকর হবে। কেননা, সাধারণ ও মাদ্রাসা এই দুই শিক্ষা এই উপমহাদেশে হাজার বছর ধরে চলে আসছে, এটা পরিবর্তন করে অভিন্ন ধারায় নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে।
তাই এই খসড়া আইনের দুর্বলদিকগুলো নিয়ে শিক্ষাবিদদের সাথে আরো বিশদ আলোচনা ও ডায়ালগ করার দাবি রাখে। কেননা, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়।
আমরা জানি, জাতীয় সংসদ কর্তৃক জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ গৃহীত হওয়ার দীর্ঘ দুই বছর পর ২০১৩ সালে শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেই আলোকে মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদনের পর ২০১৩ সালে এবং পরে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে খসড়া আইনটির ওপর সর্বস্তরের মানুষের মতামত নেয়া হয়। যত দূর জানা যায়, তাতে খসড়া আইনটির ওপর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩৪টি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৯৪টি ও বিশিষ্ট নাগরিকসহ ব্যক্তি পর্যায়ে ১০৬টিসহ মোট ২৩৪টি মতামতও নেয়া হয়। এর মধ্যে ২৫টি পূর্ণাঙ্গ মতামত ছিল। এই খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে কর্মশালাও অনুষ্ঠিত। এ মতামতের ভিত্তিতেই জাতীয় সংসদে এ আইনটি উপস্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু পরে সেটি যেন কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
সবশেষে বলতে চাই, সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা? নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা আইন, ২০১৫ খসড়াটি পরিমার্জন করে দ্রুত চূড়ান্ত রূপ দেয়া হোক। শিক্ষার পরিমাণগত ও গুণগত মানোন্নয়নের জন্যই শিক্ষা আইন হওয়া অত্যাবশ্যক।
লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক এবং কলাম লেখক।

