মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু
মানুষ ভুল করতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। তবে রাজনীতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে দলের কি অবস্থা হয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ বর্তমান বিএনপি। সরকার কর্তৃক বার বার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও গত নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কারণে তারা নির্বাচন বয়কট করেছিল। ফলে বিএনপির এখন নাই নাই অবস্থা।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা আরো সঙ্কটপূর্ণ বলে জানা গেছে। জামায়াত বিরোধী যারা একসময় বিএনপির জোটে নাম লিখিয়েছিলেন তাদের অনেকেই এখন দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে জোট থেকে কেটে পড়ার কথা চিন্তা করছেন। এদের অনেকেই এখন আর বেগম খালেদা জিয়ার উপর নির্ভর করতে পারছেন না। তাই এখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের আরো দল বিএনপি জোট থেকে বেরিয়ে আসলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
বিড়ালের গলায় কে বাঁধবে ঘণ্টা? এই উত্তরের জন্য জনগণের আর অপেক্ষা করতে হয়নি। সম্প্রতি আসছে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ভোটে যাবে বলে জানিয়েছে বিএনপির অন্যতম শরিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো জোটগতভাবে করা সম্ভব নয়। আমরা আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো।’ তিনি দলের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেন। অথচ বিএনপি থেকে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনকে নতুন ষড়যন্ত্র বলে তা বয়কটের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
সাবেক এই বিএনপি নেতা একসময় তারেক রহমান, জামায়াত ও পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে দল থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। তবে গত নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দিয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জোটে গিয়ে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয় কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পুনরায় বিএনপিতে ফিরে আসার চেষ্টা করেছিলেন বলেও মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। এখন বিএনপিতে যাওয়া তো দূরের কথা জোটের বাইরে এসে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। সরকার দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন সংশোধনের পর এই প্রথম ২০ দলীয় জোটের কোনো শরিক তাতে সায় দিল।
এদিকে বিএনপি এখন স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে যতো কথাই বলুক না কেন তারা আসছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। তবে এখন পর্যন্ত বিএনপি চায় জোটের মাধ্যমে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে। তাহলে তাদের অন্যতম শরিক দল জামায়াত প্রার্থীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। শুধুমাত্র এই কারণেই বিএনপি চাইবে জোটভিত্তিক নির্বাচন। বিএনপি মনে করে উপজেলা, পৌরসভা নির্বাচনে জামায়াতের একটা বড় ভোট ব্যাংক এখনো বর্তমান। একে কাজে লাগিয়ে জোটভিত্তিক নির্বাচনে তাদের বেশি আসন পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে বলেই পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। তাই ভেতরে ভেতরে প্রার্থী মনোয়নের ক্ষেত্রে জোটগতভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ কিছু ছোটো ছোটো শরিক দল। ইতিমধ্যেই বিএনপি জোটের সমর্থন পাওয়া কিছু কিছু প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে নামতে দেখা গেছে।
হঠাৎ করে এলডিপির স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত কেন প্রশ্ন করা হলে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান। বিএনপির নেতারা এখন বেগম খালেদা জিয়ার দেশে ফিরে আসার দিকে তাকিয়ে আছেন। নভেম্বরের প্রথম দিকে তার দেশে ফিরে আসার কথা। তিনি দেশে ফিরলে এ বিষয়ে দল হয়তো একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে সিদ্ধান্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষেই আসবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। কারণ দলকে চাঙা করতে বিএনপিকে নির্বাচনমুখি হতেই হবে। তা না হলে দলীয় পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ ধারণ করার সম্ভবনা রয়েছে বলে দলটির অনেক নেতাই মনে করেন। অন্যদিকে এ কথাও সত্য যে, বিএনপি নির্বাচনে গেলে জামায়াতকে টিকিয়ে রাখার জন্য জোটভিত্তিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, এককভাবে নয়। যদিও বিএনপির তৃণমূলের নেতারা এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে।
তবে অলি আহমদ শেষ পর্যন্ত হয়তো বুঝতে পেরেছেন বিএনপির জোটে সামিল হয়ে তার দলের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয়নি। বিএনপি কখনই জামায়াতকে ছাড়বে না। অন্যদিকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি জামায়াতকে কি করে গ্রহণ করবেন এ প্রশ্ন তাকে বার বার আঘাত করছে। তিনি তার ভুলও বুঝতে পেরেছেন। তাই হয়তো এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সাথে তিনি সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের। তিনি বলেন, ‘দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। সন্ত্রাসীদের দিয়ে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন নয়।’
এলডিপিকে শক্তিশালী করতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান অলি আহমদ। এতোসবের পর পর্যবেক্ষকমহল মনে করছেন শেষ পর্যন্ত হয়তো এলডিপি আর বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে দলটি অন্য কোনো জোটে যোগদান করতে পারে কিংবা নতুন কোনো জোট সৃষ্টি করতে পারে। তাই স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন আসতে পারে, কর্নেল (অব.) অলির এলডিপি কি তাহলে জোট থেকে বেরিয়ে আসবে?

