ঢাকাWednesday , 2 September 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাঁওতাল গণসংগ্রাম : দ্রোহের বাল্যশিক্ষা

Link Copied!

দীপংকর গৌতম
হাভারতে একলব্যের কথা কার না মনে আসে? একলব্যকে যুদ্ধগুরু দ্রোনাচার্য অস্ত্রবিদ্যা শেখাল না। একলব্য তাতে না থেমে দ্রোনাচার্যের মূর্তি তৈরি করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করল। তারপর যুদ্ধবিদ্যা শিখে নিল। যুদ্ধে তীর ছেড়ার যে মারপ্যাঁচ দেখাল তাতে যুদ্ধগুরু দ্রোনাচার্যের মনে প্রশ্ন জাগল, এত বড় মাপের দক্ষ তীরন্দাজ সে কীভাবে হল? যুদ্ধের ময়দানে তাই দ্রোনাচার্য একলব্যকে জিজ্ঞেস করল, সে কোথায় এ ধরণের যুদ্ধবিদ্যা শিখেছে। একলব্য জবাব দিল দ্রোনাচার্যের কাছেই। অবাক হল দ্রোনাচার্য একলব্যের যুদ্ধবিদ্যা শেখার কাহিনী শুনে। কিন্তু ভেতরে তার কুটিলতার ভাণ্ডারে বিষ জমা হয়ে উপচে পড়তে লাগল।
যুদ্ধের ময়দানে দ্রোনাচার্য একলব্যের উদ্দেশে বলল, হে যোদ্ধা যদি বীর হও, যদি আমার কাছ থেকে যুদ্ধবিদ্যা শিখে থাক তাহলে গুরুদক্ষিণা দাও।
বীর একলব্য জবাব দিল-কী দক্ষিণা চান বলুন? দ্রোনাচার্য সুযোগমতো চেয়ে নেয়ার কথা বলল, আর চাওয়ার সময় চাইল একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুল। যাতে এই বীর তীরন্দাজ আর কখনো তীর চালনায় দক্ষতা দেখাতে না পারে। কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে এই নির্মতার ভার আজও যারা বহন করে-তারা অচ্ছুত। ছোট জাত, গায়ের রঙ কালো। এক সময় এদের ভাষা বর্ণমালা ধর্ম সব ছিল। এখন অনেক কিছু নেই। এরা তীর ছোড়ে বৃদ্ধাঙ্গুল ছাড়াই। তীর এদের হাতিয়ার। তীর এদের সার্বভৌমত্ব-এরা বীর।
ইংরেজ বেনিয়ার বিরুদ্ধে এরা ডাক দিয়েছিল ‘হুল’-এর (সাঁওতাল বিদ্রোহকে তাদের ভাষায় ‘হুল’ বলে)। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে, জমিদারী শোষণ-যাতনাকে নিপাত করতে এবং নিজেদের হিস্যা আদায় করতে সাঁওতালরাই প্রথম ডাক দিয়েছিল সংগঠিতভাবে বিদ্রোহের। সিধু, কানু ও চাঁদ ভৈরবের নেতৃত্বে এদের বিদ্রোহ পুরো ইংরেজ শাসনকে ঘোলাজল খাইয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক সমরাস্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তারা আপাত দৃষ্টিতে হেরে গিয়ে জীবন দিলেও ভারতবর্ষের ইতিহাসে তারা অমর হয়ে থাকে।
সাঁওতাল কথন সুদূর অতীতে সাঁওতাল ও তাদের সমগোত্রীয় শাখাসমূহ বাইরে থেকে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে প্রথমে বিহারে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন শুরু করে। কৃষিকাজের মাধ্যমে তাদের জীবনধারণ শুরু এবং কৃষিভিত্তিক সমাজ জীবনের ধার সহস্র বছরকাল অতিক্রম করে ইংরেজ শাসনের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় অবাধ গতিতে চলে আসে। কিন্তু বিহার প্রদেশে ইংরেজ শাসন অধীনস্থ হলে ইংরেজ বণিকদের শোষণ প্রকট আকার ধারণ করে। বিশেষত ইংরেজ বণিকদের মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতির আক্রমণে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী বিনিময় প্রথামূলক সমাজের অবসান হলে তারা সমাজজীবনের গণ্ডি ত্যাগ করে বেরিয়ে আসে।
সাঁওতাল ১৭৯০ সালে বঙ্গ-বিহার সীমান্তে এসে জমিদারদের জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ করে প্রথমে বীরভূম পরে বাকুড়া, মুর্শিদাবাদ, পাকুর, দুমকা, পূর্ণিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মূল আস্তানা গড়ে দামিস-ই-কো নামে ভাগরপুরের একটি জায়গায়। দামিন-ই-কো, অর্থাৎ সাঁওতাল পরগনার দুর্গম বন পরিষ্কার করে এরা ফলান সোনা। যেখানে মানুষের পা পড়েনি কোনোকালে সেখানে সোনা ফলালেও শান্তি আসেনি। বাঘ-ভালুকের হিংস্রতাকে জয় করে যে সরলতা সাঁওতালরা ধারণ করে তা ধূর্ততার জালে আবদ্ধ করে শোষণ করতে শুরু করে মহাজনরা।
এই অঞ্চলকে সাঁওতালরা চাষযোগ্য করলেই ইংরেজ বণিকরা বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা ফেঁদে মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে আসতে শুরু করে। সাঁওতালদের ফলানো ফসল বিদেশে রপ্তানি করা হতো উচ্চ মূল্যে আর এদের দেয়া হত নামমাত্র মূল্য, যা ন্যায্য মূল্য অপেক্ষা অনেক কম।
সাঁওতালরা অশিক্ষিত অচ্ছুৎ হলেও তারা সুশৃঙ্খল। তারা একটি পাথরের টুকরা নিয়ে আসতো। সিঁদুর দিয়ে সাঁওতালদের ওজনে নির্ভুল বোঝান হত। মহাজনগণ এই পাথরের টুকরার সাহায্যে ওজন করে তাদের সাঁওতাল খাতকদের জমির সমস্ত ফসল হস্তগত করত। কিন্তু তাতেও খাতকের ঋণের পরিমাণ হ্রাস পেত না।
কঠোর পরিশ্রম করে এই অবস্থায় সাঁওতালরা থাকতে চায়নি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয়- সবশেষে সাঁওতালদের তাই হয়েছিল।
সাঁওতাল বিদ্রোহ
নিরীহ সাঁওতালদের শোষণ-নির্যাতনে অতিষ্ঠ করে তোলার পর তেঁতে ওঠে সাঁওতালী বুক। রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে। সাঁওতাল পাড়ায় বেজে ওঠে নাকাড়া। যুদ্ধের জন্য তৈরি হয় সাঁওতাল নারী-পুরুষ, কেঁপে ওঠে ইংরেজ শাসনের শেকড় অবধি। সিধু-কানু, চাঁদ-ভৈরবের নেতৃত্বে শুরু হয় গণসংগ্রাম।
কিন্তু কীভাবে এত বড় একটা গণসংগ্রামকে এরা সংগঠিত করেছিল? সবচে’ বড় কথা হচ্ছে সিধু-কানু বুঝেছিল যে, সাঁওতালরা যেহেতু ঠাকুরভক্ত সেহেতু ঠাকুরের ভক্তি-বিশ্বাস এখানে প্রয়োগ করতে হবে। সিধু-কানু সাঁওতালদের ভেতরে প্রচার করতে পেরেছিল যে, ঠাকুরের নির্দেশেই এই শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকতা হিসেবে। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সিধু-কানুর গ্রাম ও অন্যান্য গ্রামের প্রতিনিধি হিসাবে ১০ হাজার সাঁওতাল হাজির হয়। এই সভায় সিধু-কানু বর্ণনা করে ইংরেজ ও তাদের পোষ্য মহাজনদের শোষণ-বঞ্চনার এবং অত্যাচারের কাহিনী। এর বিরুদ্ধে তারা লড়বে এই সিদ্ধান্ত সেদিনই প্রচার হয়ে যায়।
এই সমাবেশের পর সিধুর নেতৃত্বে কির্তা, ভাদু ও সুন্নোমাঝি ইংরেজ সরকার ভাগলপুরের কমিশনার, কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট দিগী থানা ও টিকরী থানার দারোগা এবং কতিপয় জমিদরের নিকট পত্র প্রেরণ করে। দারোগা ও জমিদারগণের নিকট পনের দিনের মধ্যে উত্তর দাবি করা হয়। এই পত্র ছিল চরমপত্র স্বরূপ।
এই সব পত্র প্রেরণের পর সাঁওতাল নেতৃবৃন্দ চারদিকে ঘোষণা দিলেন যে, তারা বাঙালি ও পশ্চিম মহাজনকে উচ্ছেদ করতে সাঁওতাল অঞ্চল দখল করে নিজস্ব স্বাধীন ব্যবস্থা পড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তারা আরও ঘোষণা করে যে, সমাজের নিম্নবর্গের তাঁতী, ডোম, চর্মকারসহ সাঁওতালদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল বলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুনের সমাবেশ থেকে সমতল ক্ষেত্রের উপর দিয়ে কলকাতা অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে দেহরক্ষী বাহিনীই ছিল ৩০ হাজার। কিন্তু অপরিণামদর্শী এই অভিযানে পথ চলতে গিয়ে কয়েকদিনেই খাবার ফুরিয়ে যায়। এরপর ক্ষুধায় তারা কেড়ে খেতে শুরু করে। অভিযানের নৈতিকতায় এ কারণে ধস নামে। ইতিমধ্যে তারা বেশ কয়েকজন জমিদার মহাজনকে হত্যাও করে ফেলে। থানা পুলিশদেরও তারা বেঁধে রাখে কোথাও কোথাও। এক পক্ষকাল ধরে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা পশ্চিমের জেলাগুলোকে হত্যা ও ধ্বংসের বন্যায় প্লাবিত করে চলল।
সাঁওতাল বিদ্রোহের এই সংবাদ শাসকগোষ্ঠীকে চমকিয়ে দেয়। একের পর এক বড় বড় ইংরেজ বাহিনী সরল-সহজ সাঁওতালদের হাতে পরাজিত হতে থাকে। সাঁওতালদের অগ্রযাত্রায় কেঁপে ওঠে ইংরেজ শাসক।
অতঃপর সরকার সামরিক আইন প্রয়োগ করে বিদ্রোহকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার পরিকল্পনা নেয়। ৫০টি হাতিকে উন্মত্ত করে সাঁওতালদের মধ্যে ছেড়ে দেয়। যাতে সাঁওতালদের শত শত কুটির এভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। সাঁওতালদের মধ্যে হতাশা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বাসঘাতকতাও ছড়িয়ে পড়ে একই সাথে। প্রাণ দেয় কানু। চাঁদ-ভৈরব ভাগলপুরের নিকটে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধে প্রাণ দেয়। বিদ্রোহের অন্যান্য নেতৃবৃন্দও একে একে সৈন্য দ্বারা ধৃত হয়ে প্রাণ দেয়। ইংরেজ সামরিক বাহিনী এখানে যুদ্ধ করেনি। একটি বিদ্রোহকে দমন করতে গণহত্যা চালিয়েছে। সাঁওতালদের তীর আধুনিক সমরাস্ত্রের কাছে যেমন দাঁড়াতে পারেনি, তেমনি বিভিন্ন মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে সংগ্রামকে বিভ্রান্ত করার কাজটিও তারা করেছে স্বাছন্দ্যে।
সাঁওতালরা ইংরেজদের কাছে কোনো ক্ষমা চায় নি কখনো। কোনো কৃপা চায় নি। তাদের ওপর গণহত্যা চালানোর পরেও তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটুট থেকেছে। কামান বন্দুক কিংবা উন্মত্ত হাতির সাহায্যে সাঁওতাল বিদ্রোহ নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে বন্ধ করলেও ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে দ্রোহের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে প্রাণ থেকে প্রাণে। যারা নিপীড়িত অত্যাচারিত তারা সবাই বুঝে যায় দ্রোহ, মৃত্যু, রক্ত বিফলে যায় না।
দ্রোহ মরে না
সাঁওতাল গণসংগ্রামের মধ্যদিয়ে ইংরেজ সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে। সাঁওতাল বিদ্রোহের অবসান আপাত অর্থে হলেও সাঁওতালগণকে খুশি করতে ইংরেজ উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পুলিশ বাহিনীকে শাস্তিস্বরূপ অপসারণ করে ঐ স্থানে নতুন নতুন পুলিশ দেয়। সাময়িকভাবে বাঙালি মহাজনদের সাঁওতাল পরগনায় বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়। তবে এসব ব্যবস্থা কার্যকর থাকে মাত্র তিন বছর। সব কিছুর পরও এই বিদ্রোহ ভারতবর্ষের ইংরেজ ভিত্তিমূলে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছিল।
ভারতের ইংরেজ শাসনের দুই প্রধান স্তম্ভ ইংরেজসৃষ্ট জমিদার ও মহাজন। এই দুইটি স্তম্ভের ওপর নির্ভর করে ইংরেজ শাসকরা শোষণ করত। এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দিলে ইংরেজ সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করত। এক্ষেত্রে তার বিকল্প হয় নি।
এ আগুন নেভে নেভে নেভে না, সমস্ত বিদ্রোহের সামরিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও সাঁওতাল উপজতির সেই দাবিসমূহ থেকে তারা কোনোদিন বিচ্যুত হয়নি। সে সময় সাঁওতালরাই দারুণভাবে প্রমাণ করেছিল, জগদ্দল ইংরেজ বাহিনীই শেষকথা নয়, চিরস্থায়ী নয়; তাদের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম সম্ভব। তারপর থেকে ভারতবর্ষের সকল ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন তাদের কাছ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েছে, দীক্ষা নিয়েছে। মানুষ ভোলেনি সাঁওতালদের গণসংগ্রামের কথা।
সাঁওতালদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। হারিয়ে গেছে তাদের বর্ণমালা। শিক্ষার আলোর অভাবে তাদের উন্নতি হয়নি তেমন।
তবু তীর ছুড়তে সে বৃদ্ধাঙ্গুলকে ব্যবহার করে না। একলব্যপন্থী সাঁওতাল অভাবে-আকালে শুকিয়ে গেলেও দ্রোহের বাল্যশিক্ষা হচ্ছে সাঁওতাল বিদ্রোহ। প্রত্যেকটি বিদ্রোহ ও গণসংগ্রামের ক্ষেত্রে সাঁওতাল একটি আদমসুরত হয়ে থাকবে।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক