ড. মো. শরিফ উদ্দিন
দীর্ঘ হৈচৈ শেষে দেশে কিংবা বিদেশে সাগরভাসা মানুষদের নিয়ে উত্তেজনা স্তিমিত হয়ে এসেছে। দেশীয় গণমাধ্যমগুলোও আগের ভূমিকায় আর নেই। এটি আমাদের দেশে এক অনিবার্য পরিণতি, যত বড় দুর্ঘটনাই হোক দু’-চার দিন হৈচৈ করে থেমে যাই আমরা। সেটি লঞ্চডুবি, সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি, পোশাককলে অগ্নিকা- কিংবা রানা প্লাজা ধসের মতো ঘটনা যাই হোক, কয়েকদিন সংবাদপত্রে লেখালেখি, টেলিভিশনে চেঁচামেচি পর্যন্তই। এতে সমস্যার প্রাথমিক সমাধান কখনও হয়, কখনও হয় না, স্থায়ী সমাধান তো আরও সুদূরের বিষয়।
সাগরপথে দেশান্তরী হতে গিয়ে কত দরিদ্র মানুষের জীবনহানি ঘটল, কত নর-নারীর বুকের হাড় বেরিয়ে পড়ল ক্যামেরার সামনে, কত মা তার সন্তান হারালেন, কত শিশু বাবা হারাল এবং কেউ কেউ মারাও পড়ল অভিভাবকদের সঙ্গে-সবই আমরা খবরের কাগজে পড়লাম, টেলিভিশনে দেখলাম এবং দুয়েকদিন হা-হুতাশ করে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ডুবে রইলাম, ধীরে ধীরে ভুলে গেলাম সেসব ছবি এবং অনাহারি মানুষের সেই কংকালসার ফটোগ্রাফের কথা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে একটি ইংরেজি দৈনিক সম্প্রতি দু’টি ছবি ছাপে তাদের প্রথম পাতায়। ছবি দুটি বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে রাখাইন রাজ্যের ‘মে টিক’ নামক অস্থায়ী শরণার্থী ক্যাম্প থেকে তোলা হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলছে, গত কিছুদিন ধরে যে ৭০০ মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশী। রাখাইন রাজ্যের একজন মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক দুরবস্থার জন্য সে দেশের মানুষ দেশান্তরী হতে বাধ্য হচ্ছে। দেশে যে আর্থসামাজিক দূরবস্থা নেই, মানুষ সাগরপথে দেশান্তরী হচ্ছে না কিংবা মানুষ খেয়ে-পরে দারুণ সুখে আছে, এমন দাবি আমাদের না থাকলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নূন্যতম সৌজন্য দেখানো উচিত তার নিজ দেশের নাগরিকদের সঙ্গে। বাংলাদেশের নাগরিকদের যদি মিয়ানমার কিংবা অন্য কোনো দেশে পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কর্তব্য তাদের ফিরিয়ে এনে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং দেশান্তরী হওয়ার কার্যকারণ অনুসন্ধান করা। কিন্তু বিগত দিন আর বছরগুলোতে মিয়ানমার সরকার যে নিষ্ঠুর ও বর্বর আচরণ করে আসছে, তার অবশ্যই ইতি ঘটতে হবে।
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় পেয়ে আসছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আশ্রয় পেয়ে আসছে নিরীহ ও অসহায় রোহিঙ্গারা। দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতারণের যে ঘৃণ্য কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত রেখেছে, অবশ্যই তার জোরালো প্রতিবাদ হতে হবে। একটি রাজ্যের পুরো জনগোষ্ঠীকে ভিনদেশী আখ্যা দিয়ে স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র কেবল নিপীড়নের হাতিয়ার হয়েই ওঠেনি, হয়েছে সন্ত্রাসের অনুষঙ্গও। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মানুষ নয়, তারা ভিন্ন দেশ কিংবা গ্রহ থেকে এসেছে-এ ধরণের মধ্যযুগীয় ও প্রতিক্রিয়াশীল মন্তব্য ও কার্যকলাপ শুধু মিয়ানমারের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকেই চ্যালেঞ্জ করেনি বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেই অশান্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মিয়ানমারে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ এবং ধর্মগুরুরাও যেন নেমে পড়েছেন রোহিঙ্গা নিধনের এ খেলায়। তুলনামূলকভাবে একটি অনগ্রসর ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিজ রাষ্ট্রের এ যুদ্ধ ঘোষণার খবর আমাদের কাছে সেই অন্ধকার যুগের তিক্ত স্বাদের ঘ্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও হানাহানির খবর দেখে আঁতকে না উঠে উপায় নেই। রাখাইন রাজ্যের নিরীহ রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুরা এখন অসহায়, তাদের সাগরপথে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে ফের মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মুখে বড় কথা খুবই বেমানান এবং নির্লজ্জ নির্মমতা। দেশটির কর্তৃপক্ষ যদি এ অবস্থার রাশ টেনে না ধরে, তবে পৃথিবীতে যে প্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা রয়েছে তাদের মাধ্যমে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। ১৭-জাতি বৈঠকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা আশার সঞ্চার করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রভাব সৃষ্টিকারী দেশ ও সংস্থার যে নড়াচড়া ও অঙ্গীকার পরিলক্ষিত হয়েছে সেটিও আশাব্যঞ্জক।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নতিস্বীকার করতে হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকারের প্রতি। এটি বিশেষ কোনো দয়া কিংবা করুণা নয়, এটি প্রত্যেক রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুর অধিকার এবং এটি অলঙ্ঘনীয়। একটি বিশেষ নৃগোষ্ঠীর প্রতি দেশটির শাসক ও ধর্মীয়গোষ্ঠীর এ বর্বরতা ও অমানবিকতা হাজারও প্রশ্নের উদ্রেক করে। তার চেয়েও বেশি প্রশ্ন তৈরি হয় সে দেশের শিক্ষিত ও বিবেকি মানুষের নির্লিপ্ততা দেখে। শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি নিপীড়িত এ মানুষদের প্রতি মমত্ব দেখিয়ে কখনও কিছু বলেছেন বলে সংবাদপত্রে খবর দেখা যায়নি। এ মর্মঘাতী বিষয়ে তিনি বরাবরই চুপচাপ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আহ্বান জানিয়েছেন সু চির প্রতি এ নিষ্ঠুর নীরবতা ভাঙতে। নোবেলজয়ী দালাইলামাও বলেছেন, এটি এমন এক সময় যখন সাগরভাসা মানুষদের জন্য সু চির উচিত নীরবতা ভাঙা। তবু তিনি নীরব; থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার গণকবরের নীরবতা যেন তাকে আরও নির্বাক করে তুলেছে। অথৈ সাগরে মানুষ ভাসছে, না খেয়ে মরছে; তবু যদি সু চি নীরব থাকেন তবে সেটি জান্তা সরকারের নিষ্ঠুরতার চেয়েও বড় বর্বরতা। সু চি হয়তো মিয়ানমারে তার রাজনৈতিক ভাগ্যের কথা ভেবে বরাবরই চুপ থেকেছেন। অথচ এমন যদি হতো যে, তিনি ঘোরতর অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়েও সত্য উচ্চারণ করতে পারছেন, তবে সেটি তার বিবেকের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিত, একথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
মিয়ানমারের শাসকদের কথা বাদ দিয়ে যদি নিজের দেশে আসি, তাহলে দেখব কী করছে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তার নাগরিকদের জন্য, যারা সাগরে মৃত্যুমুখে পতিত। সারা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি যখন এ সাগরভাসা মানুষদের দিকে, সবার কণ্ঠেই যখন আছড়ে পড়ছে হাহাকার, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এসব মানুষের উদ্দেশে সহায়তার বাণীর পরিবর্তে বলেন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা। আর সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো নিজের থেকে অন্যের কাঁধে দায় চাপাতে ব্যস্ত। দেশে কর্মসংস্থান নেই, মানুষের দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের বন্দোবস্ত নেই, পরনে বস্ত্র নেই-এসব নিয়ে সরকার ভ্রুক্ষেপহীন। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশ, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় যে মানুষের সারি, যারা নিজেরাই নিজেদের বাংলাদেশী বলে সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের বিষয়ে কী হবে, কেমন হবে সরকারের ভূমিকা? হাজারও মানুষ যারা মারা পড়েছেন সাগরপথে, তাদের পরিজনের দায় কতটুকু নেবে সরকার? মানব পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে নিরীহ সর্বস্বান্ত মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি তো আরেক নির্মম নিষ্ঠুরতা। পত্রিকায় বহুবার খবর বেরিয়েছে, কক্সবাজার, টেকনাফের প্রভাবশালী মানুষ যাদের নামের সঙ্গে সরকারদলীয় মোহর রয়েছে, তারাই এসব মানব পাচারের ঘটনার পেছনে রয়েছেন। সরকার তাহলে কেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষ ব্যবস্থা নেয় না! দেশজুড়ে হৈচৈয়ের প্রেক্ষাপটে দু’-চারজন ছোটখাটো ছিঁচকে চোর ধরলেই এ পাচারের ঘটনা শেষ হয়ে যাবে না, এটা নিশ্চয়ই সরকারের কর্তারাও বোঝেন।
সংবাদপত্রের সমকালীন খবর এবং কংকালসার মানুষের ছবি কত লজ্জার ও শঙ্কার! সরকার যখন বাংলাদেশের ইমেজ উদ্ধারের চেষ্টায় ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে এ ধরণের খবর আমাদের শুধু শঙ্কিত করে না বরং আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে যে স্বপ্ন আমরা দেখি এবং হাজারও তরুণের যে নিত্যদিনের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, তা ধুলোয় লুটিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। মালয়েশিয়া মডেলে দেশের উন্নয়ন ঘটানোর খবর মুখে প্রচার করে কোনো ফায়দা হবে না, বরং মানুষের জন্য যদি সত্যিকারের রাজনীতি করা যায় সেটি হবে সবার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানব পাচারকারী ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে তারা আন্তরিক। নয়তো এগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বকেই বড় করে তুলবে। এ ধরণের ঘটনার ফল কোনোদিনই কোনো জাতিগোষ্ঠীর জন্য সুখের হয় না।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়; গবেষক

