মো. আনোয়ার হোসেন,
টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থলে গিয়েছিলাম শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পিতা-মাতার কবরের পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত। সেখানে গেলে খুব সহজেই নজরে পড়ে, জাতির জনকের কবরটি দৈর্ঘ্যে অনেক বড়। ওই কমপ্লেক্সের জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া কফিনটি সংরক্ষিত আছে। সেটিও আকারে বড়। সমাধিতে গভীর শ্রদ্ধায় আমরা অবনত হই। প্রতিদিন এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী-পুরুষ-শিশুরা আসে। অন্য দেশ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ থেকে সাধারণ মানুষ আসেন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতির জন্মভূমি ও সমাধি তাদের আকৃষ্ট করে, সাহস ও প্রেরণা জোগায়।
১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয় কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর। লাতিন আমেরিকার এই জননন্দিত নেতা পরে বলেছিলেন, ‘হিমালয় পর্বতমালা আমি দেখিনি। এখানে দেখা হলো। সাহস, ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তায় এ মানুষটিকে আমার হিমালয়ের উচ্চতায় একজন মানুষ বলেই মনে হলো।’ ফিদেল কাস্ত্রো এখনও বেঁচে আছেন। প্রবল পরাক্রমশালী যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধু নয়, ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও তিনি অবিরাম লড়ে চলেছেন। হয়ে রয়েছেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা দুনিয়ার নতুন প্রজন্মের কাছে আশার আলো। বিপ্লবের প্রতীক। গত শতাব্দীর শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের কার্যত পতন ঘটে। কিন্তু কাস্ত্রো জনগণের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় এবং তাদের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। সাম্রাজ্যবাদের সব কূটকৌশল এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
আলজিয়ার্স সম্মেলনে কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে কিছু কথা বলেছিলেন। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই নেতার রাজনৈতিক জীবন-সংগ্রামের অপূর্ব মিল ও সাযুজ্য খুঁজে পেতে তাঁর সমস্যা হয়নি। উভয় নেতাই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে বিপ্লবী আন্দোলনে রূপান্তরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পৃথিবীজুড়ে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে মুক্তিসংগ্রাম প্রবল হয়ে উঠেছিল তার সামর্থ্য ও সম্ভাবনা উভয় নেতাই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আগে সমাজতন্ত্র কায়েমের কথা তারা বলেননি। বরং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে আপামর জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ ও সম্পৃক্ত করার জন্য তারা সচেষ্ট ছিলেন। কিউবার জাতীয়তাবাদী কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সামরিক সরকার বাতিস্তার ক্ষমতার অন্যতম দুর্গ মানকাদা আর্মি ব্যারাকে মুক্তি সংগ্রামীদের সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল। সে অভিযান সফল হয়নি। কাস্ত্রো বন্দি হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুও বাঙালির মুক্তির জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তোলেন এবং শাসকদের অস্ত্রের শক্তিতে এ দাবি নস্যাৎ করার হুমকির মুখে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। এক পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয় এবং তিনি নির্জন কারাপ্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হন।
ফিদেল কাস্ত্রোর সহযোগী ছিলেন একদল তরুণ বিপ্লবী। বাংলাদেশেও বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন নিবেদিতপ্রাণ অগণিত নারী-পুরুষ। স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের জন্য সংগ্রাম পরিচালনার কৌশল নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি গোপনে সে সময়ে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছিলেন; এ তথ্যও কালক্রমে আমরা জেনেছি। কিউবার জান্তা কাস্ত্রোর বিচার করেছিল সামরিক আদালতে। সেখানে বন্দি এই নেতা উদ্দীপনাময় ভাষণ দিয়েছিলেন। বিচারককে আহ্বান জানিয়েছিলেন ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের জন্য। কিউবার জনগণের সৌভাগ্য, বিচারক তাতে সোৎসাহে সাড়া দেন এবং কাস্ত্রোকে মুক্ত ঘোষণা করেন। মুক্ত কাস্ত্রো গেরিলা যুদ্ধের পথ বেছে নেন এবং চে গুয়েভারাসহ সহযোগীরা তাঁর পাশে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সফল হয়নি। এর পেছনে নিয়ামক ভূমিকা নিয়েছিল বীর ছাত্র-জনতা। তাঁরাই ১৯৬৯ সালে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল করতে বাধ্য করে এবং মুক্ত করে আনে বঙ্গবন্ধুকে। ক্ষমতাচ্যুত হয় আইয়ুব খান-মোনায়েম খানের সরকার।
পরের ইতিহাস স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠায় জনগণের বীরত্বপূর্ণ আত্মদানের, সাহস ও গৌরবের। বঙ্গবন্ধু ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করা’র ডাক দেন এবং জনগণ তাতে সম্মিলিতভাবে সাড়া দেয়। এ আন্দোলন জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গ-িতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষের মুক্তিসংগ্রাম তথা সমাজতন্ত্রের সব উপাদান। কাস্ত্রো যেমন জাতীয়তাবাদী নেতা থেকে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুও একইভাবে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি জনগণের আপনার জনে পরিণত হলেন। শুধু বাংলাদেশের নয়, নিজেকে নিয়ে গেলেন বিশ্বব্যাপী পরিচালিত মুক্তির সংগ্রামে শরিকদের কাতারে। আলজিয়ার্স সম্মেলনে তিনি ঘোষণা করেন, ‘বিশ্ব দুইভাবে বিভক্ত শোষক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ ফিদেল কাস্ত্রো হয়তো দু’জনের অপূর্ব মিলের কথাই ভাবছিলেন। কিউবার মুক্তিসংগ্রামে সাফল্য ও বিপ্লবী সরকার গঠন করে বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের পথে যে মূল্যবান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, তিনি তা বঙ্গবন্ধুর কাছে তুলে ধরেছিলেন বলেই আমরা জানি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। তাদের মধ্যে সৃষ্ট হয়েছে নতুন আকাক্সক্ষা। পুরনো রাষ্ট্র কাঠামো তা ধারণ করায় অক্ষম। কাস্ত্রোর পরামর্শ ছিল ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে সৃষ্ট রাষ্ট্র কাঠামোকে উচ্ছেদ করা এবং তার স্থলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট শক্তিকে নিয়ে নতুন কাঠামো গড়ে তোলা। পুরনো সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং আইন-কানুনের বদলে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সবকিছু নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য যারা তাঁর ডাকে জীবন বিপন্ন করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেসব বিশ্বস্ত সহযোগী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন প্রেক্ষাপটে ঐক্যবদ্ধ করা চাই। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, কাস্ত্রোর এসব পরামর্শ তিনি যথাসময়ে কার্যকর করতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি সবকিছু যেন আগের মতোই। সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ, প্রশাসন-সবই প্রায় একভাবে রেখে দেওয়া হয়। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সহযোগিতা করেছে সক্রিয়ভাবে, তাদের অনেকেও স্বাধীন দেশে নির্ভাবনায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে থাকে। এভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে থেকেই ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পায় কিছু লোক। যে পরাক্রমশালী পাকিস্তান বাহিনীকে আমরা পরাজিত করেছিলাম, যাদের হাতে বঙ্গবন্ধু বন্দি ছিলেন এবং পাকিস্তানের কারাগারে সেলের পাশে তাঁর জন্য কবরও খোঁড়া হয়েছিল তারা নয় বরং একাত্তরে পরাজিত হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দালাল-দোসরদের ষড়যন্ত্রেই আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারালাম সপরিবারে। তাদের হাতে নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত চারজন সহকর্মীও। কারাগারের অভ্যন্তরে তাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের সেই অধ্যায়ে আমাদের সম্মিলিত ভুলের কথাও তুলে ধরতে হয়। যে শক্তি বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হিসেবে সামনের সারিতে থেকে মুক্তিসংগ্রামে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের যারা প্রতিনিধিত্ব করছিল তাদের একটি অংশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল নাম নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এবং সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতায় নেমে পড়ে। তাদের অনেক দাবি যথার্থ হলেও আন্দোলন মুখ্যত চালিত হয় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ষড়যন্ত্র এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট ও দেশে ভয়াবহ বন্যার কারণে, সৃষ্ট নানাবিধ সমস্যার কারণে জনগণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেয়ালও ক্রমে সৃষ্টি হয়। আজ অনেক বছর পর পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আন্দোলন বাংলাদেশের সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরে বড় রকমের ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বাংলাদেশ নিমজ্জিত হয় পঙ্কিলতার গভীর অন্ধকারে। দুই দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশ শাসিত হয় পরাজিত পাকিস্তানি শক্তির সহযোগীদের দ্বারা। এ সময় বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে। তবে যে জাতিকে বঙ্গবন্ধু ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন তাদের প্রাণশক্তি যে ফুরিয়ে যায়নি, তাঁর স্মৃতি ও আদর্শকে যে তারা বুকে ধারণ করে আছে এবং তিনি যে কালজয়ী হিমালয়সম একজন নেতা তারই প্রমাণ আমরা পাই নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে, সামরিক স্বৈরাচারের পতনে, বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রের ব্যর্থতায়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হয়েছে এবং এর রায়ের আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। বাংলাদেশকে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসনে পদানত রাখার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে চলে যাওয়া অনেকেই এখন এ জোটে শামিল। বাংলাদেশের মানুষ এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ২০২০ সালে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পূর্ণ হবে ২০২১ সালে। এ দুটি ঐতিহাসিক বছরকে সামনে রেখে আমাদের সম্মিলিত আকাক্সক্ষা বাংলাদেশকে অন্তত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতেই হবে (ইতোমধ্যে আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে পেরেছি)। প্রতিষ্ঠিত করতে হবে টেকসই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধু এ স্বপ্ন দেখেছিলেন। নতুন প্রজন্ম তাদের জীবনকালেই সুখী সমৃদ্ধ দেশ প্রতিষ্ঠিত করবে, এ লক্ষণ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। এ প্রজন্মই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। কালের সীমাবদ্ধতার কারণে তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি। কিন্তু তাঁদের সামনে আরও বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা অবারিত। আর এ লক্ষ্য অর্জন করতে পারাই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

