ঢাকাFriday , 28 August 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মহাবিপদে মহাসড়ক

Link Copied!

তুষার আবদুল্লাহ,
ঘূর্ণিঝড় কোমেন বিদায় নিলো। উপকূল এলাকায় সাত নম্বর মহাবিপদ সংকেত ছিল। সংকেত অনুযায়ী মহাবিপদ সে ঘটায়নি। মহাবিপদ ঘটিয়েছে এবার মহাসড়ক। ঈদের ছুটিতে কাজের জায়গা ছেড়ে ঘরমুখো হয়েছিলেন যারা, তারা স্বস্তিতে যেমন ঘরে যেতে পারেননি, তেমনি রোজগারের শহরেও ফিরে আসতে পারেননি। পথে প্রাণ দিতে হয়েছে জনাপঞ্চাশকে। আহতের সংখ্যা শতাধিক।
ঈদের ষষ্ঠদিনে অভিনেতা মোশাররফ করিমকে সঙ্গে নিয়ে সফরে নেমেছিলাম। যমুনার চরের উদ্দেশে যাত্রা। কিন্তু চন্দ্রা পেরিয়ে যতোই সামনে এগিয়েছি ততোই শঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম যমুনার নতুন চরে পৌঁছার আগেই কোনও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যাই কিনা! উত্তর থেকে যে পরিবহনগুলো আসছিল সেগুলোর কোনওটিই লেন ধরে চলছিল না। যেন মহাসড়কের অবারিত পথের পুরোটাই তাদের জন্য বরাদ্দ। সবাই আছেন অ্যাথলেটিক্সের ট্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে একে অপরকে পেছনে ফেলে প্রথম হবার প্রতিযোগিতা। আমাদের গাড়ির বাম দিকের দুই চাকা চন্দ্রা থেকে ভুঞাপুর অবধি একবারের জন্যও মহাসড়কের ষোলো আনা স্বাদ পায়নি। একদিক বরাবরই পাশের মেঠোপথ ধরে চলেছে। সহযাত্রী মোশাররফ করিম বললেন-কাউকেই সুস্থ মনে হচ্ছে না। সত্যিই উন্মাদের মতো চলছিল একেকটি পরিবহন। খুবই বিস্মিত হয়েছি ঐ মহাসড়কে উত্তর দিক থেকে ঢাকা শহরে চলাচলকারী রুটের পরিবহন ছুটে আসতে। ছয় নম্বর রুটের বাস থেকে শুরু করে লেগুনা, সব যাত্রী বোঝাই করে ঢাকার দিকে ছুটে আসছিল। পথে যানজটেও পড়েছি একাধিকবার। কিন্তু যখন জট খুলেছে, তখন বুঝতে পারেনি কেন আটকে ছিলাম।
দেশের সব মহাসড়কেই বছরে একবার হলেও চলাচলের সুযোগ ঘটে। কোনও কোনও মহাসড়কের জন্মও দেখেছি। ফলে মহাসড়কগুলোর কতিপয় ত্রুটি ব্যবহারকারী হিসেবে চোখে পড়ে। কখনও কখনও দেখি সড়ক প্রকৌশলীদের সঙ্গে সেই পর্যবেক্ষণটি মিলে যায়। প্রথমত বলতে হয়, মহাসড়কের নকশা তৈরিতেই ত্রুটি রয়ে গেছে। কারণ হলো সড়কের নামের সঙ্গে যে ‘মহা’ বিশেষণটি যুক্ত আছে এটি সড়ক ব্যবহারকারী, নকশাকারী কেউই হয়তো উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই একটি মহাসড়কের সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তৈরি সড়কের সংযোগটি কীভাবে ঘটছে বা ঘটবে এটি নকশা তৈরির চিন্তনে থাকছে না। ফলে ইউনিয়ন, উপজেলা সড়ক থেকে যানবাহন সরাসরি মূল মহাসড়কে উঠে পড়ছে। এতে মহাসড়কের গতিময়তাতে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। ঘটছে দুর্ঘটনা। কারণ মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের গতি আচমকা শ্লথ হবার কথা না। দেখা যায়, আমাদের মহাসড়কের প্রতি এক কিলোমিটারের মধ্যেই এক থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি মেঠোপথ বা এলজিইডি’র সড়ক এসে যুক্ত হচ্ছে। এতে মহাসড়কের পরিবহন তাদের গতির মাত্রা ঠিক রাখতে পারছে না। এলজিইডির সড়ক থেকে যেহেতু অপেক্ষাকৃত স্বল্পগতির যানবাহন মহাসড়কে এসে উঠছে, সেহেতু তারা মহাসড়কের বাহনের গতির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারছে না তো বটেই, একইসঙ্গে এই বিস্তৃত সড়কের নিয়মনীতি মেনেও চলতে পারছে না। ফলে দেখা যায়, খেয়াল খুশি মতো যেখানে সেখানে থেমে যাওয়া এবং ওভারটেকিং করতে যেয়ে এ ধরনের পরিবহনগুলো দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মহাসড়কের পাশে যেখানে সেখানে বাসস্ট্যান্ড ও বাজার তৈরি হয়ে যাচ্ছে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই। এবং এসব বাসস্ট্যান্ড ও বাজারে বাস বা ট্রাক থামার আলাদা জায়গা না থাকাতে তারা মহাসড়কের ওপরই যাত্রী ও মালামাল উঠানামা করতে থাকে। ফলে সেখানে যানজট তৈরির উপলক্ষ্য তৈরি হয়। স্বাভাবিক সময়ের যানজট হয়তো সহ্যসীমা অতিক্রম করে না। কিন্তু উৎসব-পার্বণে যখন পরিবহনের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন সেই যানজট দীর্ঘতর হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় যোগ করা প্রয়োজন, যেকোনও বিজ্ঞানসম্মত মহাসড়কের দুই পাশেই ধীরগতির পরিবহন বা উপসড়ক থেকে মহাসড়কে আসার যানবাহনের জন্য একস্তর নিচের সড়ক তৈরি করা হয়। আমাদের মহাসড়ক তৈরিতে সেই দ্বিস্তর পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। যমুনা বহুমুখী সেতুর সংযোগ সড়কে দ্বিস্তর নকশা ছিল ঠিকই কিন্তু বছরের পর বছর পিচ বা বিটুমিনের আবরণ দিয়ে তাও এক স্তরে একাকার হয়ে গেছে। একইভাবে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের গতিকেও সীমার মধ্যে রাখা যায়নি। যেমন-যমুনা সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগসড়কে গতি সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার রাখার কথা যেখানে, সেখানে গড়ে ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলছে প্রাইভেটকার, বাস। অন্য মহাসড়কেরও একই অবস্থা। ফলে বাঁক বা অন্য ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকার বাইরেও এবার দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। দুর্ঘটনারোধ করতে না পারা এবং মহাসড়কের ত্রুটি দূর করতে না পারার মূল কারণ ভুল পরিকল্পনা বা নির্দেশনা। যেমন ১ আগস্ট থেকে মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা বন্ধের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেটা কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে সড়ক বিশ্লেষকদের মাঝে সংশয় দেখা দিয়েছে। অটোরিকশার জন্য বিকল্প সড়ক, স্থানীয় জনগণের চলাচল ও মালামাল পরিবহনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই নির্দেশনা দেওয়ায়, স্থানীয় অর্থনীতিতে এর একটু নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিকল্প পরিবহন ও সড়ক যখন পাওয়া যাবে না তখনই নির্দেশনা না মেনে সিএনজি অটোরিকশার চলাচল অব্যাহত থাকবে। যেমনটি ঘটেছিল নসিমন-করিমনের বেলাতে।
একইভাবে বলতে হয় মহাসড়কের একাধিক লেন তৈরির কার্যকারিতা নিয়ে। যদি মড়াসড়কের গতিকে শ্লথ করে এমন উপকরণগুলো উৎপাটন না করা যায়, তাহলে চারলেন থেকে সড়ক আটলেন করা হলেও সমাধান আসবে না। কারণ আটলেনের মহাসড়কের ওপরও যদি হাটবাজার বসে, যত্রতত্র পরিবহন থেমে মাল ও যাত্রী উঠানামা করে তাহলে তো গতি একই রয়ে যাবে। দ্রুত ফিরে পাবে না মহাসড়ক। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হয় হাইওয়ে পুলিশের আধুনিক ও শক্তিশালীকরণ। হাইওয়ে পুলিশ শুধু ভিআইপিদের প্রটোকল দেবে কিন্তু মহাসড়ক থেকে উপদ্রব উৎপাটন করবে না, এই যদি হয় তাহলে মহাসড়ক মহাবিপদ হয়েই রয়ে যাবে। তাই আপাতত দেশের মহাসড়ক গুলো ‘রাজরোগ’-এ আক্রান্ত। সেখান থেকে তাকে সারিয়ে তোলার চিকিৎসক প্রয়োজন। মহাসড়ককে সারিয়ে তোলার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছেন কি কোনও সড়ক চিকিৎসক?

লেখক : বার্তা প্রধান, সময় টিভি