মুস্তাফা জামান আব্বাসী,
‘আমাদের মনের অলিন্দ ছোট্ট একটি কোটর মাত্র। যেখানে চলছে নানা কার্যক্রম যা শুধু দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতা নয়। লুকিয়ে থাকা কামনা বাসনা জড়তার নানা বিপরীতমুখী অবস্থান এখানে। এই ছোট্ট জায়গা থেকে মন মুক্তি খোঁজে, পাখির মতো স্বাধীনতার পাখা মেলতে চায়। অথচ সে তো সবসময়েই বন্দী। সে বাইরের খোলা আকাশের মতো ঔদার্যে সমর্পিত হওয়ার আকাক্সক্ষায়। কিন্তু সেটা কি সহজেই হবে?’
দিগন্ত আমরা কতটুকুই বা চিনি? আমার সামনে যে দিগন্ত উদ্ভাসিত তা নিয়েই শুরু করি। ভেসে উঠছে এক দিকচক্রবাল, যেখানে এসে থেমেছে দৃষ্টি। সীমানা নীলাকাশ, সম্মুখে বালুরাশি, ধূ-ধূ মরুভূমির দিগন্তরেখা ধূসর লালিমায় চিহ্নিত। উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির (Great Saharan Desert) মাঝে এই দিগন্ত শুধু প্রত্যক্ষ করিনি সেদিন, আপন চৈতন্যের মধ্যে যেন গেঁথে নিয়েছিলাম। আটচল্লিশ ঘণ্টা বাসে ভ্রমণ করার পর ড্রাইভারের চোখে শুধু ঘুম আর ঘুম। সে মরুভূমির মধ্যে চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আর আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার নিজের আমিকে। বালু দিয়ে ওজু করলাম। সর্বাঙ্গ ধৌত করে দেখলাম, আমার অন্তরটিতে বাসা বেঁধেছে পুরনো পাপগুলো, সেগুলো অশ্রু দিয়ে ধুয়ে ফেললাম, বালুর জায়নামাজে উপুড় হয়ে ছিলাম। কতক্ষণ এমনি ছিলাম মনে নেই, হ অবকাশ দেয় না। ধীরে ধীরে সেই মনের আকাশের উন্য়ত কয়েকটি মিনিট কিংবা কয়েক ঘণ্টা। আমার মনের শূন্যতার মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ করল আরও এক জগৎ, যে জগৎকে আমরা দেখতে পাই না। ক্ষুদ্রতা আমাদের সেই জগৎ দেখতেমিলন হয়।
শুনেছি, মরুভূমিতে সূর্যোদয় সবচেয়ে নিষ্কলুষ, সূর্যাস্তও তাই। আর মরুভূমি হলো দিগন্তের কলুষমুক্ত ছবির একটি। একজন সুফি সাধকের লেখায় পড়েছিলাম, পৃথিবীকে দিগন্তের আপন সত্তার মধ্যে উপলব্ধির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পাত্র: ক্ষুদাপীড়িত জঠর, প্রকৃষ্ট সময় : গভীর নিশাকাল, আর প্রকৃষ্ট স্থান: মরুভূমি, যেখানে পৃথিবীর মানচিত্র স্থির হয়ে আছে। মনোভূমির দিগন্তকে কতটুকু প্রসারিত কতে পেরেছি তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কেউ বা আমরা জন্মান্ধ, কোনো কিছুই ঠাহর করতে পারি না। তবে মানতে হবে এটা প্রাকৃতিক। যারা চক্ষুষ্মান তারাও যে অনেকাংশে অন্ধ। আমরা কেউ সম্পদবৈভববিত্তে অন্ধ, ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ, স্বাস্থ্যে সৌন্দর্যে পাণ্ডিত্যের আরোপিত বড়ত্বে একেকজন বটগাছ। বংশের আভিজাত্যে অন্ধ, ধর্মচৈতন্যহীনতায় অন্ধ, আবার কেউ বা স্রেফ ধর্মান্ধ। এতগুলো অন্ধত্ব নিয়ে দিগন্ত খুঁজে পাব?
আমাদের মনের অলিন্দ ছোট্ট একটি কোটর মাত্র। যেখানে চলছে নানা কার্যক্রম যা শুধু দৈনন্দিন প্রাত্যহিকতা নয়। লুকিয়ে থাকা কামনা বাসনা জড়তার নানা বিপরীতমুখী অবস্থান এখানে। এই ছোট্ট জায়গা থেকে মন মুক্তি খোঁজে, পাখির মতো স্বাধীনতার পাখা মেলতে চায়। অথচ সে তো সবসময়েই বন্দী। সে বাইরের খোলা আকাশের মতো ঔদার্যে সমর্পিত হওয়ার আকাক্সক্ষায়। কিন্তু সেটা কি সহজেই হবে? রবীন্দ্রনাথের গান: ‘সে কি অমনি হবে’? খোলা জানালা বলে একটি কথা আমরা ব্যবহার করি; খোলা জানালা, যার মধ্যে দিয়ে প্রচুর আলো বাতাস ঘরে প্রবেশ করবে যাতে আমাদের ঘর অন্ধকারে পতিত না নয়। এই জানালা ঘরের নয়, মনের, সবাই জানি সেই কথা।
‘আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে মন বড় হয়’, ছোটবেলা একজন পিতৃবন্ধু বলেছিলেন কথাটা। সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের বালক মাঠের খেলা ভুলে চিৎ হয়ে পড়ে নীল আকাশ দেখতাম। সে আকাশে কত রংয়ের খেলা, কত মেঘ, কত লুকোচুরি। এই কার্যক্রমে মন বড় হয়েছে কিনা জানি না। তবে বুঝতে পেরেছি, মনের যে চত্বরটি আছে তার বিস্তৃতির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন মনের কালিমা পরিষ্কার করা, অর্থাৎ যেখানে যা কিছু ইতোমধ্যে জড়ো হয়েছে যেমন কুচিন্তা, কুসংস্কার, কু-স্বভাব, সেগুলো পরিষ্কার করে মুক্ত থাকা। তা হলে, সেই জায়গায় যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর, অধিষ্ঠিত করা যাবে। আলোর যিনি আধার, যিনি চন্দ্রসূর্য তারকারাশি সমুজ্জল সৌর জগতের নূর, তাঁর স্পর্শ থেকে তো আমরা সৃষ্ট জগতের কেউ বঞ্চিত নই। তবে নূরের স্পর্শ পেয়েও অবহেলা? উল্টো রথের মিছিলে আলোর খুচরা ব্যবসায়ীও আছেন। তাদের ব্যবসায়ও বেশ জমেছে দেখছি। এরই মাঝখানে মরুভূমির এক খ্যাপা পাগলকে টেনে আনছি। নাম তার নিফ্ফারি। নিফ্ফারি পড়ে আমি হতবাক, বিমূঢ়। তাঁর সম্পর্কে সামান্য জানা যায়। তিনি ছিলেন মিসরের মরুভূমিতে ক্ষেপার মতো ঘুরে বেড়ানো এক জাত পথহারা পথিক, যার ছিল না কোনো বসতবাড়ি, জমিজমা, কারো কাছে পরিচিত হতে চাইতেন না তিনি। তাঁর লেখা ‘কিতাবউল মওয়াকিফ্’ বা উচ্চতার কিতাব পড়লে চেনা যাবে আলোকে, আর চেনা যাবে অচেনা দিগন্ত। বইটির সাতটি বড় কবিতা বাংলায় অনূদিত হয়েছে। বলতে সংকোচ হচ্ছে, অনুবাদ কর্মটি আমার। তিনি এগুলো কখনো লিখে যাননি, তাঁর ছেলে বিভিন্ন স্থান থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। টেলিভিশনে অ্যাথেন্স অলিম্পিকে সপ্তম দিবসে ডিসকাস থ্রোতে যিনি পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন হলেন, তাঁর জীবনের লক্ষ্য একটিই: কি ভাবে ডিসকাসটি সর্বাপেক্ষা দূরত্বে নিক্ষেপ করা যাবে। তাঁর সাধনা ADIDAS অর্থাৎ All day I dream of Sports. ওস্তাদ আমজাদ আলী খান সাহেব, সরোদের চলতি সম্রাট, তাঁর আত্মজীবনীতে লেখেন, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি আর সারাদিন সঙ্গীতে ডুবে থাকি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেব বলেন, আমার সিজদা আমি সবসময়েই দিচ্ছি সেই দিগন্তে যেখানে তিনি অসীম আবার সসীম। তাহলে দিগন্তে অন্বেষণে একেকজনের অন্বেষা একেকদিকে।
দিগন্ত ছাড়িয়ে অসীমের দিকে যাত্রা করার জন্য বেশ কয়েকজন কবিকে সঙ্গী করেছি। আমার সামনে খোলা রুমি, নিফ্ফারি, শাবিস্তারী, সুলতান বাহু, ইউনুস আমরে, ইকবাল, খোলা সাদি হাফিজ ও আমার আপন দেশের রবীন্দ্রনাথ।
যে সম্পূর্ণরূপে অহম বিসর্জন দিতে পেরেছে, যার সবকিছু অপরে সমর্পিত, যার নিজের বলতে কিছুই নেই, যে নিজকে ফরি ভাবতে পেরেছে, যে দিগন্তের সন্ধানে পাগলপ্রায়, তার কাছে যা ধরা দেবে কোনোদিন, তাই হবে তার নতুন দিগন্ত।
লেখক : সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব

