কামাল লোহানী
মহান একাত্তর আমাদের অবশ্যই উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় অধ্যায়। একাত্তরে অনেক প্রাণ বিসর্জন আর নানা রকম ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ডই অর্জন করিনি, একাত্তরে অনেক কিছুর ফয়সালাও হয়ে গেছে। ধর্মান্ধতা, প্রতিক্রিয়াশীলতাসহ নানাবিধ নেতিবাচক বিষয়ের কবর রচনা করেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের নব প্রতিষ্ঠার অধ্যায়টি আমাদের চেতনা ও মূল্যবোধের পুনজাগরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ঘাপটি মেরে থাকা পরাজিত শক্তি আস্তে আস্তে কৌশলে ডানা মেলতে শুরু করে। বিএনপি’র জন্মলাভের পর তাদের কৌশলের নতুনমাত্রা পরিলক্ষিত হয়। জামায়াতসহ একাত্তরের সব বিরুদ্ধশক্তি বিএনপি’র ছায়াতলে বেড়ে উঠতে শুরু করে এবং এরপর তাদের ক্রম কার্যক্রম সচেতন মানুষ মাত্রকেই নতুনভাবে বাধ্য করে। ধর্মান্ধতা-প্রতিক্রিয়াশীলতা কিংবা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্রম প্রসার যাদের হাত ধরে এই রক্তস্নাত বাংলাদেশে ঘটেছে কিংবা এখনো বিস্তার লাভ করে চলেছে এরও প্রেক্ষাপট সচেতন মানুষ মাত্রই জানা আছে।
পুনর্বার দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলেও উগ্রবাদীদের থাবা বিস্তারের নতুন নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হচ্ছে। আগেও এই কলামে লিখেছি জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ করেই সব দায় শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই। এদের অর্থের উৎস ও আশ্রয়-প্রশ্রয় দাতাদের শনাক্ত করে কঠোর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমাধান। কিন্তু কাজটা আজো প্রত্যাশা মোতাবেক সম্পন্ন করা যায়নি বিধায়ই জঙ্গিরা তাদের নানা রকম ছক কষে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সদস্যরা এ ব্যাপারে সতর্ক কিংবা সক্রিয় নন এ কথা বলা যাবে না। প্রায়ই তারা জঙ্গিদের আটক করছেন এবং এর সঙ্গে উদ্ধার হচ্ছে আরো অনেক কিছু। কিন্তু কোনোভাবেই এটুকু যে যথেষ্ট নয় বিদ্যমান বাস্তবতা তো এরই সাক্ষ্যবহ। উগ্রবাদীরা এখন প্রযুক্তিতে অনেক বেশি দক্ষ। প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা তাদের অপকর্ম সম্পাদনের নানা রকম তৎপরতাও অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি সে রকমভাবে সক্রিয় কিংবা তারা তাদের কার্যক্ষেত্রে সফল? প্রশ্নটির উত্তর তারাই ভালো দিতে পারবেন।
নানা নামে নানা ব্যানারে ওরা গজাচ্ছে। ওদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও অস্পষ্ট নয়। বিগত কয়েক বছরে এ দেশে আমরা প্রগতিবাদী, মুক্তমনা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনাধারী অনেককে হারিয়েছি তাদের ছোবলে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ক’টি ঘটনার দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার সম্ভব হয়েছে? এ প্রশ্নেরও উত্তর সুখকর নয়। জঙ্গি-উগ্রবাদী-ধর্মান্ধরা দেশ-জাতি-সভ্যতা-মানবতার শত্রু তো বটেই ওরা ধর্মেরও শত্রু। ওদের সব কর্মকাণ্ডই পবিত্র ধর্মবিরুদ্ধ। ওরা অন্ধকারের জীব। ওদের কাছে যুক্তির চেয়ে অন্ধত্বই বেশি প্রভাব বিস্তারকারী। এমন অন্ধত্ববাদীরা বর্তমান জামানায় দেশে দেশে যে হিংস্র ছোবল মারছে এর পেছনে রয়েছে নানা রকম রাজনৈতিক মদদ। অতীতে আমরা সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটিয়েই ওদের হটিয়ে দিয়েছি। এখনো দরকার এরই। সাংস্কৃতিক জাগরণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টি করেই এদের সব হিংস্রতা, কূপমণ্ডূকতার মূলোৎপাটনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকারও। প্রশাসনিক কঠোর কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি উল্লিখিত বিষয়গুলোকেও দাঁড় করাতে হবে দ্রুততার সঙ্গে সমান্তরালে। এদের সিংহভাগ মানুষ ধার্মিক কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। ধার্মিক আর ধর্মান্ধের মধ্যে যে বিভেদ রাখা হয়েছে এটিই সমাজের পরতে পরতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ দেশে উগ্রবাদী-জঙ্গি-প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের চারণ ভূমি হতে পারে না। আবারো বলি, মহান একাত্তরে আমরা মুখ্যত এদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই প্রতিষ্ঠা করেছি এই জাতিরাষ্ট্র।
জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করতে হলে হাত দিতে হবে একেবারে এর উৎস মূলে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু। কিন্তু এ দেশের মানুষ ধর্মের নামে কোনো উগ্রতা, মানুষ হত্যা বা খুনোখুনি তারা কখনোই মেনে নেয়নি, ভবিষ্যতেও নেবে না। তাই সরকার ধর্মীয় সন্ত্রাসবিরোধী যে অবস্থান নিয়েছে এর প্রতি সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন সব সময় থাকবে বলেই মনে করি। এই মনে করাটা একেবারেই নয় অসঙ্গত। সরকারের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং অবস্থানের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থনও অব্যাহত থাকবে। আমরা চাই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হোক এবং সব ধরনের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূল হোক। এর জন্য প্রয়োজন প্রগতিমনা প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান। জঙ্গিরা আবার নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে এমন খবর কোনোভাবেই নয় স্বস্তির। তাই সরকারকে সে রকম অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে হবে। তাদের মদদদাতা ও অর্থের উৎস সর্বাগ্রে চিহ্নিত করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশে এই কাজটি সম্পাদন করা কোনোভাবেই দুরূহ নয় বলেও মনে করি। নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের নেটওয়ার্ক যে নতুন করে গড়ে উঠছে এর জন্য বিদ্যমান রাজনীতি বহুলাংশে দায়ী।
জঙ্গিবিরোধী যে অভিযান চলছে এর গতি আরো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে গোয়েন্দা নজরদারিও। ওদের সব আস্তানা ও মদদদাতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই যেতে হবে এগিয়ে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না অতীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারই এ ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছিল। এখন কোনো দুর্বলতার সুযোগে ওরা আবার লক লক করে বেড়ে উঠছে তাও চিহ্নিত করা প্রয়োজন। একাত্তরের পরাজিত শক্তির সঙ্গে এখনো বিএনপি’র রয়েছে গভীর সখ্য। এই সখ্য রাজনৈতিক এবং তা অবশ্যই হীনস্বার্থবাদী রাজনীতির অপছায়া। বাংলাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক এবং শান্তিপ্রিয়। কোনো ধরনের উগ্রতাকে তারা অতীতেও মেনে নেয়নি, ভবিষ্যতেও নেবে না। যারা কোনো না কোনোভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের মধ্যে এই বোধোদয় ঘটলেই মঙ্গল। সাপকে দুধ কলা পুষলেও এর ছোবল থেকে যে নিস্তার মিলবে না তা স্ববিরোধীদের উপলব্ধিতে এলেই ভালো।
(লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক)

