ঢাকাFriday , 10 July 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্ষমতার গদি ও জনগণের স্বার্থ

Link Copied!

বদরুদ্দীন উমর
৪০০ কোটি টাকা দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ব্রাজিল থেকে ২ লাখ টন গম আমদানি করেছে। এই গম দেশে ইতোমধ্যে বিতরণও হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, আমদানি করা এই গম অতি নিকৃষ্ট মানের এবং মানুষের খাওয়ার অযোগ্য। যেসব জায়গায় এই গম বিতরণ করা হয়েছে সেখান থেকে গমের নিম্নমানের কথা উল্লেখ করে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে তা ফেরত নেয়ার কথাও বলা হচ্ছে। এর মধ্যে আছে বিভিন্ন আটা কারখানা, যারা গম ভেঙে আটা-ময়দা তৈরি করে বাজারজাত করে। শুধু এই আটার কলগুলোই নয়, অন্য অনেক জায়গা এবং খোলাবাজারে বিক্রির জন্য পাঠানো গমের নিমম্নমানের কথা বলে তা ফেরত নেয়ার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া এর মধ্যে আছে পুলিশ বিভাগ। পুলিশের রেশন দেয়ার জন্য এই গম পাঠানোর পর পুলিশ প্রশাসন থেকেও এই নিম্নমানের গম ফেরত নেয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। কাশিমপুর জেলে সরবরাহ করা গমও নিকৃষ্ট মানের। এই অভিযোগ করে তা প্রত্যাহারের জন্য বলা হয়েছে।
এই গম এতই নিম্নমানের যে, এটা বোঝার জন্য গমের মান নির্ণয়ে তা কোনো পরীক্ষাগারে পাঠানোরই প্রয়োজন হয় না। গমের চেহারা ও গন্ধ থেকেই তা বোঝা যায়। কিন্তু তবু এর মান পরীক্ষার জন্য যেসব জায়গায় পাঠানো হয়েছে, তারা এর নিম্নমান সম্পর্কে রিপোর্ট দিয়েছে। খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আধিকারিকদের কেউ কেউ বলেছেন, এই আমদানিকৃত গম কোন বছরে উৎপাদিত এ বিষয়ে ব্রাজিলের কৃষি মন্ত্রণালয় ও চেম্বার অব কমার্স কোনো সার্টিফিকেট না দেয়া সত্ত্বেও খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গমের চালান গ্রহণ করা হয়েছে। গমের মান সম্পর্কিত কোনো সার্টিফিকেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও দেয়নি। (Daily Star, 30.06.2015)
খাদ্য মন্ত্রণালয় তাদের পরীক্ষায় এই গমে কোনো দোষ পায়নি এবং এটা মজুদ ও সরবরাহের উপযোগী বলে তারা দাবি করেছে। যদিও বগুড়া, জয়পুরহাট, মাগুরা, পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ ও শেরপুর থেকে পাঠানো গমে জীবন্ত পোকামাকড় পাওয়া গেছে বলে খাদ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এছাড়া BCSIR-এর Institute of Food Science and Technology (IFST) তাদের পরীক্ষায় চুপসে যাওয়া গম ৯.৯৩ শতাংশ এবং গমের দানা ২১.১১ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই মর্মে রিপোর্ট দিয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই পরিমাণ ৮ শতাংশের ওপর হলে তা বাতিলযোগ্য হওয়ার কথা। ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম যে নিম্ন ও নিকৃষ্ট মানের এবং এটা মানুষের খাওয়ার উপযোগী নয়, এ নিয়ে দেশে এখন ব্যাপকভাবে সমালোচনা হচ্ছে এবং এর জন্য দায়ী দুর্নীতিবাজ খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, খাদ্যমন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের কিছু আধিকারিকের সঙ্গে মিলে ৪০০ কোটি টাকার এই গম ব্রাজিল থেকে আমদানি করেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এই আমদানিকৃত গম নিয়ে দেশের বিভিন্ন সংস্থা, আটা-ময়দা কারখানা, এমনকি পুলিশ ও জেল কর্তৃপক্ষের থেকে একে খাদ্য অনুপযোগী বলে অভিহিত করে সরবরাহকৃত গম বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী এ পর্যন্ত এ বিষয়ে নীরব আছেন! মনে হয়, দেশের লোকের স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য এবং স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়ে তার কোনো উদ্বেগ ও দায়িত্ব নেই!
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা এখন বন্যাকবলিত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়ে ছিন্নমূল অবস্থায় জীবন কাটালেও তাদের কোনো ত্রাণের ব্যবস্থা সরকারের ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দেখা যাচ্ছে না। যা দেখা যাচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষের যে তৎপরতা প্রয়োজন, তার ধারেকাছেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। বন্যাকবলিত এসব জায়গার মানুষকে সরিয়ে আনা, তাদের জন্য শুকনো ও রাঁধা খাদ্য সরবরাহ ইত্যাদি জরুরিভিত্তিতে করার প্রয়োজন হলেও এ বিষয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো নড়াচড়া নেই। এই অবহেলা ও উদাসীনতা থেকে বোঝার অসুবিধা নেই এ সরকার জনস্বার্থ বিষয়ে কতখানি নির্লিপ্ত। অবস্থা দেখে মনে হয়, জনগণের ভোটে কোনো প্রকারের নির্বাচিত হওয়ার চিন্তা ছাড়া জনগণের বিষয়ে অন্য কোনো চিন্তার প্রয়োজন এদের নেই। এ ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর নিরপেক্ষ অবস্থান ও নীরবতা খুবই লক্ষণীয়। অর্থাৎ তিনি যে জনগণের কেউ নন, এ নীরবতা থেকে এটা বোঝার অসুবিধা কি কারও আছে?
রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশ ধ্বংসকারী বিপজ্জনক দিক সম্পর্কে দেশে বিভিন্ন সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্ট গবেষকদের সমালোচনা, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সত্ত্বেও সরকার অবিচলিত। এ প্রকল্পে ভারতের ষোল আনা লাভের সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ষোল আনা ক্ষতির আশঙ্কা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী তাদের এই প্রকল্পের একজন দৃঢ় ও অবিচল সমর্থক! কয়েকদিন আগে তিনি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে তার বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন যে, তার থেকে বড় দেশপ্রেমিক আর কেউ নয়। যারা এ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে তারা চায় না দেশের কোনো উন্নতি হোক!! ‘দেশের সর্বাপেক্ষা দেশপ্রেমিক’ হিসেবে তিনি খতিয়ে দেখেছেন যে, রামপাল প্রকল্পে ক্ষতির কোনো কারণই নেই, কাজেই তা বন্ধ করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না!!! কথা হল, তিনি নিজেকে একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে দাবি করতে পারেন; কিন্তু সমগ্র দেশে পনেরো কোটি লোকের মধ্যে দেশপ্রেমিক কেউ নেই এবং তিনিই একেবারে শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিক এ দাবি তিনি কী হিসেবে করতে পারেন? গদিনশীন হয়ে থাকাই কি দেশপ্রেমের নিদর্শন? ক্ষমতাসীন লোকদের কথাবার্তার ধরন আজ কী দাঁড়িয়েছে, এর সঙ্গে পরিচয় আমাদের প্রতিদিনের। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তার সরকার, দল ও জোটভুক্ত তার আজ্ঞাবাহী লোকরা যেসব কথা অহরহ বলেন এবং সংবাদপত্র ও বৈদ্যুতিক মাধ্যমে যা প্রচার করা হয়, সেটা পড়া ও শোনা জনগণের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার। শুধু তাই নয়, এই ফাঁকা ও বিভ্রান্তিকর সব কথাবার্তা ও বক্তব্যের থেকে জনগণের মধ্যে যে এই সরকারের গণবিরোধী চরিত্র সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়, এটা বলাই বাহুল্য।
লালবাগ কেল্লার সীমানা প্রাচীর ভেঙে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা করছে আর কেউ নয়, খোদ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ! দুনিয়ার ইতিহাসে এটা এক অদৃষ্টপূর্ব ঘটনা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাজ হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা করা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সরকারি স্বার্থে অর্থাৎ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থে নিজেদের উদ্যোগেই মোগল যুগের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করছে!! এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ হাইকোর্টে এক রিট আবেদন করে। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট মোগল আমলে স্থাপত্যের এ একমাত্র অক্ষত নিদর্শন ভেঙে ফেলার বৈধতার প্রশ্ন তুলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এ কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই আবেদনের ওপর শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মহাপরিচালক, ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক, লালবাগ কেল্লার কিউরেটর এবং লালবাগ থানার ওসিকে এই নির্মাণ কাজ বন্ধের হাইকোর্ট নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে (যুগান্তর, ২৯.০৬.২০১৫)। প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ আইনের ১২(৩) ধারা এবং সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে লালবাগ কেল্লা ও স্থাপনা সংরক্ষণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না এবং কেল্লার যে অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে, তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না এ বিষয়ে হাইকোর্টের এক রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মহাপরিচালকসহ পাঁচ বিবাদীকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, দেয়ালের যে অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে সেটা নতুন ইট পাথর দিয়ে ‘পূর্বাবস্থায়’ আনলেও মোগল আমলের ইট ধ্বংস করার কারণে এই স্থাপত্যকে যথাযথভাবে তার পূর্ব অবস্থায় ফেরত আনা প্রকৃতপক্ষে সম্ভব নয়। যে ক্ষতি এক্ষেত্রে হয়েছে তা অপূরণীয়। উল্লেখ্য, এসব বিষয়েও সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য নেই! তাদের নীরবতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এই ধ্বংসকার্য ও দুর্নীতির সঙ্গে সরকারের লোকজন ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
ওপরে যেসব বিষয় সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হল, তার থেকে এটা বোঝার কোনো অসুবিধা কি আছে যে, সরকারে যারা গদিনশীন হয়ে আছেন, দেশের স্বার্থ, জনগণের স্বার্থের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা কোনো দেশপ্রেমমূলক কাজ নয় এবং এর সঙ্গে দেশপ্রেমের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে বেপরোয়া লুটপাট ও দুর্নীতির। দেশপ্রেমিকের দাবিদারদের সামনে এভাবে বাংলাদেশে এমন সব ধরনের জনস্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। শুধু তাই নয়, দেশের মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য পর্যন্ত এখন ধ্বংসের মুখোমুখি। কিন্তু এর দৃষ্টান্ত শুধু লালবাগ কেল্লাই নয়। পাহাড়পুরের বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ স্থাপনাও আজ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মুখে। সেখানে এই স্থাপত্যের চারদিকে এখন খুব উঁচু এক দেয়াল দেয়া হচ্ছে, যার ফলে বাইরে থেকে এর সৌন্দর্যমণ্ডিত দৃশ্য এখন যেভাবে দেখা যায়, তা আর দেখা যাবে না। এর পার্শ্ববর্তী ও সংলগ্ন জমি দখলের জন্যই এ কাজ করা হচ্ছে। এ কাজও হচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দ্বারা। বাংলাদেশে বেপরোয়া লুটপাট আজ কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, এসবের মধ্যে তার অভ্রান্ত প্রমাণই পাওয়া যাচ্ছে।

লেখক : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল