ঢাকাThursday , 9 July 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অপ্রতুল জনবল দিয়ে বর্ধিত পরিমাণ বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের যৌক্তিকতা

Link Copied!

ড. মো. শাফায়েত হোসেন
বর্তমানে দেশে একদিকে যেমন ক্রমবর্ধমান হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে কৃষি জমির পরিমাণও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বর্ধিত এ জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুণগত মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ বিশেষ করে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভাল বীজ ও সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কৃষক পর্যায়ে কৃষি উপকরণ সরবরাহের নিমিত্তে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কৃষি উপকরণ বলতে এখানে মূলত বীজ, সার ও সেচকেই বুঝানো হচ্ছে। এ তিনটি উপকরণের মধ্যে বীজ একটি জীবন্ত (Living) ও নাজুক (Vulnerable) উপকরণ হওয়ায় এর উৎপাদন, সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য নিবিড় তদারকি ও বিশেষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই লোকবলের প্রয়োজন হয় বেশি।

SEEDদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিগত ৫০ বছর যাবত প্রতিষ্ঠানটি কৃষি উন্নয়নে স্মরণযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। গবেষণা ও সম্প্রসারণ নিষ্ফল হবে যদি কৃষক পর্যায়ে সময়মত পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা না যায়। কৃষি নির্ভর আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচাতে যেমন প্রয়োজন মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা তেমনি প্রয়োজন কৃষিজাত পণ্যের বাজারমূল্য নিশ্চিত করা। বিএডিসি’র কাজ হচ্ছে গুনগত মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বীজ, সার ও সেচ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে প্রশংসার দাবিদার। বিগত সরকারের আমলে কিছু ভুল সিদ্ধান্তের ফলে ও দাতা দেশসমূহের চাপের মুখে বৃহৎ এ প্রতিষ্ঠানটিকে কাটছাঁট করে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি উপাদান জনবল ও অবকাঠামো কমিয়ে আনা হয়। বীজ বিক্রয় কেন্দ্রসমূহ সংকুচিত করা হয়, সারের উপর থেকে ভর্তুকি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে রাসায়নিক সার সরবরাহের দায়িত্ব বিসিআইসি’র হাতে অর্পণ করা হয়। এর পরিণাম যে খুব একটা সুখকর হয়নি তা আর কারও অজানা নেই। এ দেশের দরিদ্র কৃষক সমাজকে এর জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। বীজ বিক্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়ে আনা ও রাসায়নিক সার বিশেষ করে ইউরিয়া সার সরবরাহের দায়িত্ব বিসিআইসি’র হাতে অর্পণ করায় গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ দুটির সহজলভ্যতা কমে যায়। পরবর্তিতে সরকার ও কৃষির সংঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই উপলব্ধি করে যে বিএডিসিকে সংকুচিত করা কোনভাবেই সঠিক হয়নি।

১৯৯৯ সালে গঠিত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিএডিসিকে পুনর্গঠন করার পর পর্যায়ক্রমে বীজ, সার ও সেচ উইং এর কার্যক্রম কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায়। ১৯৯৯ সালে পুনর্গঠনের পূর্বে বিএডিসির জনবল ছিল ১০,০৬৫ জন, পুনর্গঠনের পর তা ৬,৮০০ তে নামিয়ে আনা হয়। মোট ৬,৮০০ অনুমোদিত জনবলের মধ্যে বীজ ও উদ্যান উইং এর নির্ধারিত জনবল এর পরিমান ৩১৮৪ জন। একই উইং এ অনুমোদিত ৭৯৬ জন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে ৫৮২ জন অর্থাৎ কর্মকর্তার পদ শূণ্য রয়েছে ২১৪টি অন্যদিকে অনুমোদিত ২৩৮৮ জন কর্মচারির মধ্যে শূণ্য পদের সংখ্যা ৯৫৬টি অর্থাৎ বীজ ও উদ্যান উইং এ বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারির মোট শূণ্য পদের সংখ্যা দাড়িয়েছে ১১৭০-এ যা অনুমোদিত জনবলের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। কর্মকর্তা বলতে এখানে মূলত কৃষিবিদ কর্মকর্তাদের বুঝানো হয়েছে। চাকরি থেকে স্বাভাবিক অবসর গ্রহণ এবং দীর্ঘদিন থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় বীজ ও উদ্যান উইং এ কারিগরি ও দক্ষ জনবলের বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সদর দপ্তর থেকে মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন পদে একজন কর্মকর্তা একাধিক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে বাধ্য হওয়ায় বীজ উৎপাদনের মত জটিল ও নাজুক কাজ তদারকিতে প্রয়োজনীয় সময় দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্বাভাবিক কারণেই এর নেতিবাচক প্রভাব বীজের মানের উপর পরতে বাধ্য।

আমরা জানি, প্রয়োজনীয় কৃষিবিদ ছাড়া মানসম্পন্ন কৃষি উপকরণ তথা বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ, পরীক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিতরণের মতো কারিগরি ও জটিল কাজ সমাধা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বিগত বছরগুলোতে বিএডিসি কর্তৃক বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন ও বিতরণের কার্যক্রম লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে-বলা যায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিগত বছরগুলিতে বিএডিসি বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ দেখলে সহজেই অনুমেয় তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, বিএডিসি ২০১২-১৩ সালে ১,২৭,৯৭১ মে. টন এবং ২০১৩-১৪ সালে ১,৩০,৩৮৫ মে. টন ধান, গম, ভুট্টা, পাট, আলু, ডাল-তৈল বীজ, সবজি বীজসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ সরবরাহ করেছে। তাছাড়া উদ্যান উন্নয়ন বিভাগ ও এএসসি বিভাগের মাধ্যমে উদ্যান ফসলের বীজ, চারা, কলম উৎপাদন ও সরবরাহের কাজ অব্যহত রয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে বিভিন্ন ফসলের ১,৫০,০০০ মে. টন বীজ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ, পুষ্টি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে উল্লিখিত পরিমাণ বীজও যথেষ্ট নয়। অপর্যাপ্ত এ জনবল দিয়েই ক্রমবর্ধমান বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনে এহেন কার্যক্রম এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিভিন্ন ফসলের বীজের মান এর আন্তর্জাতিকভাবে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড (Seed Standard) রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত মৌল বীজ (Breeder Seed) হতে বীজ ফসলের বিভিন্ন ধাপ অবলম্বনের মাধ্যমে ভিত্তি বীজ (Foundation Seed) ও প্রত্যায়িত (Certified Seed)/মান ঘোষিত (Truthfully Labeled Seed) বীজ উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত বীজ মাঠ থেকে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরীক্ষণ, সংরক্ষণ এবং পরবর্তী ফসল মৌসুমে বিতরণের প্রতিটি ধাপে কৃষিবিদ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান আবশ্যক। এ সকল ধাপে কৃষিবিদ কর্মকর্তার ঘাটতি হলে বীজের মান রক্ষা হবে কিভাবে। এ ছাড়াও বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক বিএডিসি কে যে সকল উন্নয়ন কর্মসূচি/কার্যক্রম এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা ১৯৯৯ সালে নির্ধারণকৃত ৩১৮৪ জনবল এর মধ্যে বিদ্যমান ২০১৪ জনবল দ্বারা সম্পাদন করা আরো দূরহ হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো স্বল্পতার কারণে বীজের মান খারাপ হলে এর দায়-দায়ীত্ব নীতি নির্ধারক মহল বিশেষ করে ‘সীড প্রমোশন কমিটি’র সদস্যগণ কি এড়াতে পারবেন?

কৃষি ও বীজ সংশ্লিষ্ট সকলকে মনে রাখতে হবে, বীজ বলতে মানসম্পন্ন বীজকেই বুঝানো হয়, এও স্মর্তব্য যে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর ব্যবস্থা না করে প্রতিবছর বীজ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে থাকলে বীজের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পরবে। কারণ বর্তমান জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে কোনভাবেই ক্রমবর্ধমান বীজ সরবরাহ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব নয়। তবে একটি ভাল খবর যে বিএডিসির ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের নিমিত্ত ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে ড. এম. এম. শওকত আলীর নেতৃত্বে সরকার কর্তৃক গঠিত কমিটি বিএডিসি’র জনবল ৬৮০০ থেকে ১০,১০০ জনে উন্নীতকতরণের সুপারিশ করে। সুপারিশকৃত জনবলের মধ্যে বীজ ও উদ্যান উইং এর কর্মকর্তা ১৮২৯ জন এবং কর্মচারি ৩৪৮৪ জন অর্থাৎ মোট ৫৩১৩ জন রয়েছে। জানা গেছে, বিএডিসি পুনর্গঠন সংক্রান্ত উল্লিখিত কমিটির সুপারিশ জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সুপারিশকৃত বর্ধিত জনবল আপাতত অনুমোদন না হলেও ১৯৯৯ সালে নির্ধারণকৃত বীজ ও উদ্যান উইংয়েরর ৩১৮৪টি পদের মধ্যে ১১৭০টি শূণ্যপদ পূরণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় বীজের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি না করে বরং কমিয়ে আনাই হবে বিএডিসি’র বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক পদক্ষেপ।

লেখক : উপব্যবস্থাপক, বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ (বীপ্রস) বিভাগ,
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)