ড. মো. তাসদিকুর রহমান
কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমি কমতে থাকা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ত ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বর্তমানে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে চতুর্থ, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, আখ উৎপাদনে নবম, আলু উৎপাদনে দশম। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে প্রায় ৭ কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন করতেই হিমশিম খেতে হয়েছে দেশকে। এখন লোকসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি, জমির পরিমাণ কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী যেখানে খাদ্য আমদানি করতে হতো কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ চাল, আলু, ভুট্টা ও সবজি রপ্তানিকারী দেশ হিসাবে স্বীকৃত। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যত অর্জন আছে, তার মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে অর্জন সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষকের অবদান সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৬.৩৩ শতাংশ।
বস্ত্রশিল্প দেশের বেকার জনশক্তির কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে আসছে। বস্ত্র শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ (রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকসহ) শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে বস্ত্রশিল্প মোট শিল্প আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ১০ শতাংশ অবদান রেখে আসছে। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ১৯৯৫-৯৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ ছিল ২.৬ বিলিয়ন ডলার যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ সালে ২৫.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দাঁড়িয়েছে; যা রপ্তানি খাতে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। এই বস্ত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা। প্রতি বছর ৫০-৫৫ লাখ বেল তুলার প্রয়োজন হয়। দেশীয় উৎপাদন ১.৫ লাখ বেল।
তুলা একটি অর্থকরী আঁশ জাতীয় ফসল। এটি কৃষি ও বস্ত্র শিল্পে সমানভাবে অবদান রেখে যাচ্ছে। বর্তমানে তুলা উন্নয়ন বোর্ড ৪টি রিজিয়ন, ১৩টি জোন এবং ১৮০টি ইউনিটের মাধ্যমে সম্প্রসারণ ও ৫টি গবেষণা খামারের মাধ্যমে গবেষণার কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে তুলা চাষ উপযোগি জমি রয়েছে ২.৫ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে ০১ লাখ হেঃ জমিতে তুলা চাষ করলে চাহিদার ২৫-৩০% দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। এ ছাড়া বর্তমান কৃষি বান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে তুলা চাষের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১০৫ (একশ’ পাঁচ কোটি ) টাকার ‘সম্প্রসারিত তুলা চাষ প্রকল্প, ফেজ- ১’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। বর্তমান সরকারের আমলে তুলা চাষের এলাকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৮-০৯ মৌসুমে যেখানে ৫০,১৭৫ বেল তুলা উৎপাদন হয়েছে, ২০১৪-১৫ সালে তা বেড়ে ১,৫২,৫৩৪ বেলে উন্নীত হয়েছে। এ সবই সফল হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি গুরুত্বের কারণে।

বর্তমানে কৃষিতে পানির ব্যবহার (বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে) কমানোর জন্য মাননীয় কৃষিমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ‘বরেন্দ্র এলাকায় তুলা চাষ’ নামক একটি কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের চাষিদের মাঝে অর্থকরী ফসল হিসাবে তুলা বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকার তুলা চাষিরা বেশি পানি যুক্ত আবাদ ধানের চাষ ছেড়ে তুলা আবাদের দিকে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এর মূল কারণ তুলা ফসলে কম পানি প্রয়োজন হয়। এক কেজি ধান উৎপন্ন করতে যেখানে ৩৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয় সেখানে ১ কেজি তুলা উৎপাদন করতে মাত্র ৭০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া তুলা বৃষ্টি নির্ভর ফসল হওয়ায় অনেক সময় বাড়তি সেচের কোন প্রয়োজন হয় না।
আর তুলার বাজার ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত ভালো। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সঙ্গতি রেখে সরকার কতৃক নির্ধারিত দামে বাংলাদেশের সর্বত্র তুলা বিক্রি হয়। তুলার রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। এর আঁশ থেকে সুতা, বীজ থেকে খৈল ও তৈল পাওয়া যায়। তাই বর্তমানে এটিকে শুধু আঁশ জাতীয় ফসল না বলে আঁশ ও তৈল জাতীয় ফসল বলা হয়। তাছাড়া এর গাছও জ্বালানি ও পার্টিকেল বোর্ড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ জন্য তুলা একদিকে যেমন কৃষিজ অন্যদিকে তেমনি শিল্প। বাংলাদেশে দু’টি সেক্টরে এটি অবদান রেখে আসছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে তুলা চাষের গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৭২ সালে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। তিনি জানতেন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এদেশে তুলা উৎপাদন অত্যন্ত জরুরি। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সময়ে পাকিস্তান থেকে কিছু দক্ষ তুলাচাষি এনে ঠাকুরগাঁও জেলায় তুলাচাষের জন্য সরকারিভাবে জমি বণ্টন করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরবর্তীতে সরকারের এই খাস জমি বিভিন্নভাবে অন্যদের দখলে চলে যায়। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে তুলার চাষ আরও বেগবান হতো।
তুলা উন্নয়ন বোর্ড সীমিত সংখ্যক জনবল নিয়ে সম্প্রসারণ ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে এই সম্ভাবনার আলোকে চাষি পর্যায়ে আরও সমাদৃত করার জন্য এবং চাষির ভাগ্যোন্নয়নের জন্য তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একটি নিজস্ব ভবন, জনবল বৃদ্ধি, সাব-ক্যাডার, নতুন নতুন প্রকল্প ও কর্মসূচি প্রদান করা হলে এই বোর্ডের সক্ষমতা যেমন বাড়বে তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।
লেখক : উপ-পরিচালক (সঃ দঃ), তুলা উন্নয়ন বোর্ড


