ঢাকাThursday , 11 March 2021
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বঙ্গবন্ধুর চিন্তার পথ ধরেই ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’

Link Copied!

জিএম, ফরিদপুর পবিস।

মো. আবুল হাসান
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান আর ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন দেশের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এক দৃঢ় প্রত্যয় ও সুদূর প্রসারী চিন্তার কারণে জাতিকে দিকনির্দেশনামূলক একটি সংবিধান উপহার দেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫০ বছর পর অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজও কোন ভাল কাজের উদাহরণ দিতে গেলে বঙ্গবন্ধুর সেই ’৭২-এর সংবিধানের উদাহরণই টানতে হয়।
ওই সংবিধানের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশ গঠনে স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর সুদূর প্রসারী চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নগর ও গ্রামাঞ্চলে জীবন যাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমুল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
বঙ্গবন্ধু গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহের অভিপ্রায়ে বলেছিলেন, ‘বিদ্যুৎ ছাড়া কোন কাজ হয় না, কিন্তু দেশে জনসংখ্যার ১৫ ভাগ লোক যে শহরের অধিবাসী সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও শতকরা ৮৫ জনের বাসস্থল গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। এর ফলে গ্রাম বাংলার সর্বক্ষেত্রে উন্নতি হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চালু করতে পারলে কয়েক বছরের মধ্যে আর বিদেশ হতে খাদ্য আমদানি করতে হবে না’। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১১/০৭/১৯৭৫)।
জাতির পিতার সুদূর প্রসারী এ চিন্তা ভাবনার ধারাবাহিকতায় পল্লীর জনগণের দোরগোড়ায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছানোর লক্ষ্যেই পরবর্তীতে এবং পর্যায়ক্রমে পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম শুরু হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায় ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) সমগ্র বাংলাদেশে বিদ্যুতায়ন কাজে নিয়োজিত আছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১৫ সাল থেকে এক যুগান্তকারী ও সাহসী উদ্যোগ শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় ইতিমধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায় পবিসসমূহের বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট যা দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫৫ শতাংশ। পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের শুরু থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুতায়িত লাইন ২ লক্ষ ১৮ হাজার কি.মি. হতে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৫ লক্ষ ৩০ হাজার কি.মি.-এ দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদে মাত্র ১২ বছরে ৩ লক্ষ ১২ হাজার কি.মি. লাইন নির্মাণ করা হয়। এ মেয়াদেই গ্রাহক সংখ্যা পূর্বের ৭৪ লক্ষ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ১০ লক্ষে উন্নীত হয়েছে।
২০০৮ সালে দেশের মাত্র ২৭ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল বর্তমানে তা বেড়ে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লক্ষ ৯২ হাজার টি শিল্প সংযোগ ও ৩ লক্ষ ৫৪ হাজার টি সেচ সংযোগ, ১ লক্ষ ৫৫ হাজার টি ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প, ১৩ হাজার ৮৫০টি পাওয়ার লুম, ১০ হাজার ৪৩৯টি হাস মুরগীর খামার, পাঁচ হাজার ৬৬৬টি মৎস্য খামার, এক হাজার ২২৪টি দুগ্ধ খামারে সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।
একই সঙ্গে এক হাজার ৯২টি ৩৩/১১ কেভি নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ করে উপকেন্দ্রের সংখ্যা উন্নীতকরণসহ উপকেন্দ্রের মোট ক্ষমতা ৪ হাজার ৬৫০ এমভিএ থেকে ১৩ হাজার ৮৫৫ এমভিএ-তে উন্নীত করা হয়েছে। একই সময়ে সিস্টেম লসও কমে গেছে। সিস্টেম লস ১৮% থেকে হ্রাস পেয়ে ১০.২০% এ দাঁড়িয়েছে।
প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে পল্লী বিদ্যুতের কর্মচারিরা আলোর ফেরিওয়ালা সেজে গ্রাহকের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পাঁচ মিনিটে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করছে। গ্রামে গ্রামে এবং পাড়ায় পাড়ায় গ্রাহকের আঙিনায় উঠান বৈঠক করছে। বিগত ৬ বছরে এক হিসেবে দৈনিক ৮ কর্ম ঘণ্টা ধরে দেখা গেছে প্রতি মিনিটে প্রায় ২৭ জন নতুন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। এ জন্য প্রতি মিনিটে নতুন বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ০.৫ কি.মি. যা দেশের জন্য একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় ৪৬১টি উপজেলার মধ্যে ইতিমধ্যে ২৮৮টি উপজেলা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধন করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৭৩টি উপজেলা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ’৭২-এর মহান সংবিধানের অঙ্গীকার গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে তারই কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কালজয়ী উদ্যোগ ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি এখন সফল বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে। শুধু গ্রীড এলাকার (স্থায়ী জমিতে) মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এখন চলছে অফগ্রীড এলাকা তথা নদী বিধৌত চরাঞ্চলে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে গ্রীড লাইন সম্প্রসারণের কাজ।
ইতিমধ্যে দেশের সমগ্র চরাঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৫৯টি গ্রামে বৈদ্যুতিক লাইন ও সাবস্টেশন নির্মাণ করে সংযোগ প্রদানের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ কাজ শেষ হলে আরও প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আসবে।
সার্বিকভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কাজ। আর এ জন্য নিয়োজিত আছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারি। আরও আছেন উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অগণিত শ্রমিক কর্মচারি।
‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশনায় বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ বিষয়ক উপদেষ্টা, মাননীয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও সময়ে সময়ে দায়িত্বরত সচিববৃন্দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, অকুণ্ঠ সমর্থন ও অব্যাহত সহযোগিতা এ পথকে করেছে প্রশন্ত ও গতিশীল। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নেতৃত্বে বর্তমান চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন (অবঃ) এর দূরদর্শী ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগে তৈরি হয়েছে অনেক কর্মপন্থা, অনেক ইনোভেশন যেমন- আলোর ফেরিওয়ালা, দুর্যোগে আলোর গেরিলা, উঠান বৈঠক প্রভৃতির মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে দেশের সকল শ্রেণির পেশা ও মিডিয়াকে। ফলশ্রুতিতে দালাল ও দুর্নীতিবাজদের সমূলে উচ্ছেদ করে শতভাগ বিদ্যুতায়নে কার্যকর উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুদূর প্রসারী চিন্তার ফসল ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে বর্তমান সরকারের আর এক কালজয়ী ঘোষণা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আজ আর স্বপ্ন নয় বরং বাস্তব রূপ লাভ করেছে। আর গ্রামে গ্রামে এবং ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ সংযোগ এ কাজে রসদ জুগিয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এখন অনলাইনে সংযুক্ত হতে পেরেছে। বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর বিকাশ, রকেট, টেলিটক শিউরক্যাশ, এম ক্যাশ প্রভৃতির মাধ্যমে মানুষ বিদ্যুৎ বিল প্রদানসহ নানামুখি আর্থিক লেনদেন করছে। ঘরে বসেই দেশের ছেলেমেয়েরা অনলাইনে পড়াশুনা করছে। আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে দেশে বিদেশে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এমনকি করোনা দুর্যোগেও থেমে নেই বাংলদেশের অর্থনীতির চাকা। থেমে নেই কৃষকের খাদ্য উৎপাদন ও শিল্প কারখানা। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকারের আর এক সাফল্য, ভারতের সাথে ছিটমহল বিনিময়ের সাথে সাথেই মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই ছিটমহলবাসীকে চির অন্ধকার থেকে আলোকিত জনপদ উপহার দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করে তাদের মানবেতর জীবনকে কিছুটা হলেও লাঘব করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ হজার ১৯৮টি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ হাজার পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। দুঃস্থ মানুষের সেবায় নিয়োজিত ১৫ হাজার ৫০০টি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্য সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ Mother of Humanity মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রায় ৭০ হাজার গৃহহীন মানুষকে ঘর প্রদানের মাধ্যমে যে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাতেও দ্রুত গতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান করে অসহায় দুঃখীজনের ঘরে আলো জ্বালানো হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর সুদূর প্রসারী চিন্তার সফল বাস্তবায়ন ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ আজ তাঁরই তনয়া শেখ হাসিনার হাতেই পল্লী বিদ্যুতায়নের নবযুগে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেই নিভু নিভু আলোর কুপি বাতি আর হারিকেনের যুগকে বিদায় দিয়ে নিরবে নিভৃতে আজ দেশের আনাচে-কানাছে জলে-স্থলে সর্বত্র ১৭ কোটি জনগণের বাংলাদেশ আলোয় আলোকিত হচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে গর্বের, নিঃসন্দেহে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবার এক অনন্য সূচক। এটি শুধু নিছক বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানো নয় বরং প্রতিটি ঘরেই এখন আশার আলো জ্বলছে। যার প্রতিফলন ঘটছে জিডিপিতে। করোনা পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে যখন জিডিপিতে ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। সেখানে বাংলাদেশ জিডিপিতে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বল্পন্নোত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জন করছে। বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে কি ঘটেছে বাংলাদেশে।
বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের আশির্বাদ
মুক্তির সুবাতাস বহমান আকাশে
ঘরে-ঘরে আজ সমৃদ্ধি পল্লী বিদ্যুতে
উপ্ত হয়েছে তারই তনয়া শেখ হাসিনার পনে
তাকিয়ে রয়েছে বিশ্ব অবাক নয়নে।
লেখক : জেনারেল ম্যানেজার, ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।