ঢাকাSaturday , 26 December 2020
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চরাঞ্চলে সেচের ফেরিওয়ালা : কৃষির অপার সম্ভাবনা

Link Copied!

মো. জিয়াউল হক
বাংলাদেশ গাঙ্গীয় ব-দ্বীপ এবং নদীমাতৃক দেশ। এদেশে রয়েছে ছোট বড় প্রায় ৩২০টি নদ-নদী। বড় বড় প্রতিটি নদ-নদী হিমালয়ের পাদদেশ হতে উৎপত্তি হয়ে কালের পরিক্রমায় নদীর গতিপথও পরিবর্তন করেছে। আর এই পরিবর্তনকালে সৃষ্টি করেছে ছোট বড় অনেক দ্বীপ চর ও বাঁকের চর। আর এ নদীগুলো বর্ষাকালে বহন করে বিপুল পরিমাণ পলি। সাগর, মহাসাগর, হ্রদ অথবা নদী দ্বারা বেষ্টিত ভূখণ্ডকে সাধারইত চর বলে। নদীর গতি প্রবাহ অথবা মোহনায় পলি সঞ্চায়নের ফলে গড়ে উঠে চর। সীমিত ভূখণ্ডের এ দেশে গড়ে ঢঠা চরগুলোতে প্রায়শই নতুন বসতি স্থাপন এবং নতুন কৃষি জমির সৃষ্টি হয়। দ্বীপ চরগুলো বছরের সবসময় পানি দ্বারা বেষ্টিত এবং বাঁকের চরগুলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকালিন মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত থাকে। নদ-নদী বেষ্টিত এক একটি বড় অংশ চরভূমি হিসেবে পরিচিত, যাকে চরাঞ্চল বলা হয়। দেশের এ দুর্গম চরাঞ্চলগুলো সবসময় সবারই দৃষ্টি সীমার বাইরে থাকে এবং বরাবরই উন্নয়ন বঞ্চিত। তাই অবহেলা, উপেক্ষা ও বঞ্চনার মাত্রাও তাদের বেশি। চরে বসবাসরত জনগোষ্ঠির বৃহৎ অংশ অতিদরিদ্র এবং সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত। দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১.০-১.২% চরা ভূমি এবং প্রায় ৩২টি জেলার ১০০টিরও অধিক উপজেলার অংশ বিশেষ চরাঞ্চল। যার পরিমাণ প্রায় ১.৭০ লাখ হেক্টর। এশিয়া ও নিকট প্রাচ্য অঞ্চলের জন্য সেচ সহায়তা প্রকল্প (The Irrigation Support Project for Asia and Near East-ISPAN) নামক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষায় জানা যায়, যে সকল চর উৎপত্তির প্রথম চার বছরে ক্ষয়প্রাপ্ত বা ভাঙন কবলিত হয় না, সে সকল চরে চার বছরের শেষ দিকে কৃষিকাজ কিংবা বসতি স্থাপন করা যায়। ফলে দেশের চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠি সাধারণত সিকস্তি ও পয়োস্তি হিসেবে অবস্থান করে। চরগুলোকে মোট পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়-যমুনা, গঙ্গা, পদ্মা, লোয়ার মেঘনা ও আপার মেঘনার চর। এ সকল চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিতে বিপুল জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি, ডাল, তৈলবীজ ও দানাদার শস্য উৎপাদন করে থাকে। দেশের মোট শাক-সবজি বেশিরভাগ উৎপাদিত হয় চরাঞ্চল থেকে। মোট ফসলি জমির প্রায় ৫% অর্থাৎ আবাদযোগ্য জমির প্রায় ১০% সবজি উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অল্প পরিমাণ জমি থেকে ক্রমবর্ধিষ্ণু বিপুল জনগোষ্ঠির সবজি চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে প্রায় ৮.৬১ লাখ হেক্টর জমি থেকে ১৫৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে (ডিএই)। যদিও সবজিভিত্তিক পুষ্টি গ্রহণের উপাত্ত ও পরিমাণে ভিন্নতা রয়েছে- পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির গড়ে দৈনিক সবজি গ্রহণ করা প্রয়োজন ২০০-৩০০ গ্রাম এবং গ্রহণ করছে মাত্র ১০০-১৬৬ গ্রাম। সেক্ষেত্রে সবজির উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় আরও দ্বিগুণের বেশি বাড়াতে হবে। এফএও (FAO) সূত্র মতে, বিগত ৪০ বছরে দেশে সবজির উৎপাদন প্রায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তবুও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ৫০টির অধিক দেশে সবজি রপ্তানি হচ্ছে। যা বিদেশে সবজির ব্যাপক চাহিদার মাত্র ২-৫% রপ্তানি করতে পারছে। চরাঞ্চলে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির সুযোগসুবিধা না পৌঁছায় বিস্তীর্ণ জমির উৎপাদন ক্ষমতা খুবই কম হচ্ছে। এটি সত্য যে দেশে কৃষিতে বিরাট সাফল্য থাকলেও চরের আবাদি জমি হতে অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমানে চরাঞ্চলে কিছু সংখ্যক এনজিও যেমন-DFID, Concern Worldwide, CARE Bangladesh, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে, যা খুবই অপ্রতুল। এ সকল চরের নদীর ভূপরিস্থ পানি ও ভূগর্ভস্থ পানি দুই সহজলভ্য। নদীতে বিপুল পানির উৎস থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় কৃষক তার সুফল পাচ্ছে না। অপরদিকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ এলাকায় সেচ কাজে ভূপরিস্থ/ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির কলা-কৌশল এবং সুযোগসুবিধা সৃষ্টি করা হয় নি। এ ভূপরিস্থ পানির উৎস-নদী হতে আবাদী জমি অনেক দূরে অবস্থিত এবং জমির মাটি বেলে দো-আঁশ হওয়ায় সেচের পানি পরিবহণ সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। তাই কাঁচা সেচনালা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ কষ্টসাধ্য এবং সেচের পানির অপচয় বেশি। তাছাড়া চর এলাকাসমূহ বিদ্যুৎ বঞ্চিত, ডিজেলচালিত নলকূপ/শক্তিচালিত পাম্পের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সেচ খরচ বেশি। তাই সর্বোপরি আর্থিক সংকটের কারণে চরাঞ্চল সেচবহির্ভূত থাকছে। অপরদিকে, চরগুলো প্রতি বছর বন্যা কবলিত হওয়ায় ঠিকমতো ফসলও উঠাতে পারে না। চরাঞ্চলের কৃষকগণ দাবি সরকারি পযার্য়ে ভূপরিস্থ পানি সেচ কাজে ব্যবহারের সুযোগসুবিধা সৃষ্টি করা হলে, সেচ এলাকা বৃদ্ধি এবং কৃষিকে বহুমুখী করা সম্ভব হবে।
ফেরিওয়ালা (Pedlar/Hawker): ফেরিওয়ালা শব্দটির সাথে কম বেশি সবাই পরিচিত। সাধারণত ফেরিওয়ালা বলতে আমাদের দেশে চোখের সামনে ভেসে ওঠে যে মানুষটি এক স্থান হতে অন্য স্থানে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন প্রকার দ্রব্য সামগ্রী, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা ক্রয় এবং বিক্রি করে থাকে তাকে ফেরিওয়ালা বলে। ফেরিওয়ালাদের নগর ও গ্রামাঞ্চলে সব জায়গায় দেখা যায়। এ ফেরিওয়ালার নিকট শহর বা গ্রামাঞ্চলের সাধারন মানুষ কম মুল্যে দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় বিক্রয় করে থাকে। সার্বিক বিবেচনায় এ পৃথিবীতে সকল প্রকার কার্যই এক ধরনের ফেরি করে চলে। তেমনি রংপুর অঞ্চলে তিস্তা নদীতে জেগে ওঠা তালুকশাহবাজপুর ও ডুসমারা চরে চাষাবাদ নিয়োজিত কৃষকদের কাছে সেচের ফেরিওয়ালা হিসেবে সমধিক পরিচিত।
মুভেবল সেচ পদ্ধতি (Movable Irrigation System): ভূপরিস্থ পানির উৎসে সেচযন্ত্র এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তরের মাধ্যমে চরাঞ্চলে ফসলি জমিতে সেচ প্রদান পদ্ধতিকে মুভেবল সেচ পদ্ধতি বলে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সেচ বিভাগ কর্তৃক ৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১২ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট নৌকায় ২৪টি সোলার প্যানেলের (প্রতিটি ৩০০ ওয়াট) চার কিলোওয়াট বিদ্যুৎচালিত ডিসি সাকশন সোলার পাম্প (পাঁচ লাখ লিটার/দিন ক্ষমতার) স্থাপন এবং চরাঞ্চলে সোলারচালিত ডাগওয়েলের মাধ্যমে সেচের ফেরিওয়ালা লাগসই সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটায়। এছাড়াও সেচের পানি পরিবহণের জন্য ১০০০ ফুট ফিতা পাইপ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে যে কোনো দূরত্বে ও যেকোন স্থানে সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এ মুভেবল সেচ পদ্ধতিকে স্থানীয় ভাষায় সেচের ফেরিওয়ালা বলে অবহিত করা হয়ে থাকে।
পোর্টেবল সেচ পদ্ধতি (Portable Irrigation System): যে সেচ ব্যবস্থাপনায় পাম্পটি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থাপন করে বিতরণ পাইপ এক স্থান হতে অন্যস্থানে স্থানান্তরপূর্বক সেচ প্রদান করাকে পোর্টেবল সেচ পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতি বালিময় এলাকায় একস্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তর করে বেশি জমিতে সেচ প্রদান করা হয়ে থাকে। ফলে একটিমাত্র সেচের পানির উৎস হতে বেশি এলাকায় সেচ প্রদান করা সম্ভব এবং সেচ খরচও অনেক কম হয়ে থাকে।
চরাঞ্চলে সেচের চ্যালেঞ্জসমূহ:
১. আধুনিক ও টেকসই কৃষির কলা-কৌশল বিষয়ে জ্ঞানের অভাব;
২. চরাঞ্চলগুলো বহুমুখী দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ও স্থায়িত্বের অনিশ্চয়তা;
৩. আধুনিক ও টেকসই সেচ প্রযুক্তির বিষয়ে জ্ঞানের অভাব;
৪. কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল পরিবহণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা;
৫. উৎপাদিত ফসলের বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাব;
৬. চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছলতা;
৭. ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার প্রচারণার অভাব;
৮. সর্বোপরি মূলধন ও সরকারি সহায়তার অভাব।
করণীয়সমূহ:
১. কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায়, খোরপোষ কৃষি আজ লাভজনক কৃষিতে রূপান্তর, বাণিজ্যিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণে করা সম্ভব হচ্ছে। তাই কৃষির উৎপাদনে লক্ষ্য রাখতে হবে-উন্নতজাত, পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ এবং সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ। এ লক্ষ্যে আধুনিক ও টেকসই কৃষির জন্য সঠিক জমি নির্বাচন, জমি তৈরিকরণ, উন্নতজাত নির্বাচন, উচ্চমূল্যের ফসল, শাকসবজি, পরিমিত সার ও সেচ প্রদান। এছাড়াও অন্যান্য কলাকৌশল, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের দিকে নজর দিতে হবে। তাই চরাঞ্চলে ইউনিয়ন/গ্রাম পর্যায়ে কৃষক/কৃষাণিদের হাতে কলমে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. চরাঞ্চল একটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। এখানে প্রায়শই বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে থাকে। আমরা জানি, নদীর এক পাড় ভাংগে তো অন্যপাড় গড়ে। ফলে চরাঞ্চলের লোকদের স্থায়িত্ব কম দেখা যায়। তাই তারা একবার সিকস্তি আবার পয়োস্তি। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী চরাঞ্চলে গুচ্ছ/আদর্শ গ্রাম তৈরি করে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ করতে হবে।
৩. চরাঞ্চলে ভূপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির কোনো অভাব নেই। তবুও সেই সনাতনি পদ্ধতিতে সেচ প্রদান করে আসছে। চরাঞ্চলে সেচের প্রধান সমস্যা হলো- চরের ভাঙন ও বালিময় চরে সেচের পানির পরিবহণ ব্যবস্থা। চরাঞ্চলে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব হয় না বলে আধুনিক প্রযুক্তির ড্রিপ ও স্প্রিংকলার এবং মুভেবল/পোর্টেবল সেচ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা যেতে পারে।
৪. চরাঞ্চলগুলো দৃষ্টি সীমার বাইরে এবং ভাঙনপ্রবণ হওয়ায় তেমন কোনো স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গঠে উঠে না। কিন্তু চরাঞ্চলে রয়েছে সুপ্ত ও গুপ্তধন। তাই চরাঞ্চলকে কৃষিতে উন্নয়ন করতে হলে, প্রথম প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। তাই চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল সুষ্ঠুভাবে এবং কম খরচে পরিবহণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. চরাঞ্চলে ব্যাপক উচ্চমূল্যের ফসল (High Value Crops) ও শাক-সবজি উৎপাদিত হলেও শুধুমাত্র বাজারজাতকরণের অভাবে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। তাই চরাঞ্চলে হাট বাজারের ব্যবস্থাকরণসহ প্রক্রিয়াজাতকরণের সংস্থান করতে হবে।
৬. প্রচলিত একটি কথা আছে-নদীর ভাঙ্গনে সংসার সহায়-সম্বলহীন হয়ে যায়। তাই চরাঞ্চলে পয়োস্থি কৃষক, হতদরিদ্র ও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠির আর্থিকভাবে খুবই অসচ্ছল হয়ে থাকে। তাদের সচ্ছলতা আনয়নের জন্য কৃষি সহায়তা প্রদান করতে হবে।
৭. চরাঞ্চলের কৃষি কার্যক্রমের ওপর ব্যাপকভাবে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারণা করা যেতে পারে, যাতে চরাঞ্চলের সকল কৃষক/কৃষাণির নিকট সহজ বোধগম্যহয়।
৮. চরাঞ্চলে কৃষক/কৃষাণিদের ফসল উৎপাদনের জন্য সহজ শর্তে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা অথবা সরকারি পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সহায়তা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।
আগে চরের এ সকল জমিতে সেচের কোন ব্যবস্থা না থাকায় ফসল ফলাতে কৃষকদের যথেষ্ঠ কষ্ট করতে হতো। তিস্তা নদী হতে বালতি অথবা কলসির সাহায্যে পানি নিয়ে অথবা ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপে পানি তুলে জমিতে পলিথিনের তৈরি মিনিপুকুরে (গর্ত) মজুদ রেখে সেখান থেকে কাঁধে করে সেচ প্রদান করা হতো। এতে কৃষক/কৃষাণিদের কায়িক শ্রম ও ভোগান্তির শিকার হতো। বালি মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কম হওয়ায় বারবার সেচ লাগতো ও পাশাপাশি অনেক ব্যয় হতো। এছাড়াও চরাঞ্চলে কৃষকদের চাষাবাদের জন্য বৃষ্টি অথবা ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পের সেচ খরচ অনেক বেশি হওয়ায় হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থাকতো। তিস্তা চরের এ কষ্টের ইতি টানতে বিএডিসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান মহোদয় রংপুর জেলার কাউনিয়া চর উপজেলার তালুকশাহবাজপুর ও ডুসমারা চরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল পরিদর্শনে কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়কালে কৃষকগণ কৃষিতে সেচের সমস্যা তুলে ধরে তার সমাধান চান। চেয়ারম্যান মহোদয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকল্প পরিচালক, ‘রংপুর অঞ্চলে ভূপরিস্থ পানির সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প’ রংপুরকে জেলার কাউনিয়া চর উপজেলার তালুকশাহবাজপুর ও ডুসমারা চরে মুভেবল সেচ কার্যক্রমের প্রদর্শনী স্থাপনের নির্দেশনা প্রদান করেন; যা বর্তমানে সেচের ফেরিওয়ালা নামে অবহিত। উক্ত সেচ কার্যক্রমের প্রদর্শনী সফলভাবে বাস্তবায়নের ফলে কৃষক/কৃষাণিগণ তালুকশাহবাজপুর চরে নৌকায় স্থাপিত পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য ০.৫ কিউসেক সোলারচালিত মুভেবল সেচ পাম্পে প্রায় ৫০ হেক্টর এবং ডুসমারা চরে সোলারচালিত ডাগওয়েলের সাহায্যে ১০ হেক্টর জমিতে কম খরচে সেচ প্রদান করে উচ্চমূল্যের ফসল ও শাকসবজি উৎপাদন করেছে। এতে পূর্বে যেখানে একর প্রতি ফসল উৎপাদনে ন্যূনতম আট হাজার টাকা খরচ হতো, সেখানে বর্তমানে খরচ হচ্ছে মাত্র এক হাজার টাকা। যা ইতোমধ্যে কৃষক/কৃষাণিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এছাড়াও কৃষক/কৃষাণিগণ সনাতন পদ্ধতিতে নিজ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৫০০ হেক্টরে উচ্চমূল্যের ফসল ও ২০০ হেক্টর জমিতে ডাল, তৈলবীজ, শাকসবজি উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছে। তাদের উৎপাদিত উচ্চমূল্যের ফসল-লাউ, কুমড়া, টমেটো, স্কোয়াশ, ক্যাপসিকাম ও বিভিন্ন শাক-সবজি রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বহুকাল থেকেই চরাঞ্চলে মানুষ বসবাস করে আসছে। চরে বসবাসকারী মানুষেরা সংখ্যায় অনেক। তীব্র নদী ভাঙন, খরা, বন্যাসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বেকারত্ব মোকাবেলা করেই বছরের প্রায় পুরো সময়টাই চরের মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক বিচার বিশ্লেষণে চরাঞ্চল উচ্চমাত্রা দ্রারিদ্রপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এখনও চরে ৬৫% মানুষ বছরের বিভিন্ন সময় কম বেশি খাদ্য কষ্টে ভুগে থাকে। চরাঞ্চলে ৯৫% মানুষ স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সেবা পায় না। শিক্ষা ব্যবস্থাও নাজুক, বাল্য বিবাহ ও নির্যাতন বেশি হয়। পরিবার ও পরিবারের বাহিরে স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্নে নারীরা এখনও অনেক পিছিয়ে। অথচ চরের এ নারী গোষ্ঠি কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি সত্য যে, চরে যেমন হাজারো সমস্যা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সম্ভাবনার শত দুয়ার খোলা। সে জনগোষ্ঠি নিজেরাই সকল প্রকারের ফসল ফলাতে পারে। কৃষিতে আমাদের সাফল্য থাকলেও এটি সত্য, চরের সকল আবাদী জমি আজও অধিক ফসল উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। চরাঞ্চলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সুবিধা না থাকায় বিস্তীর্ণ ভূমির কৃষি উৎপাদন অনেক কম। কৃষি বিশেষজ্ঞদের ভাষায় চরের জমি হলো Hidden diamond। যমুনা বেষ্টিত প্রায় এক লাখ হেক্টর বৃহত্তম চর এলাকা- কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলা হতে শুরু করে ৮টি জেলার শতাধিক উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় পদ্মা নদীতে মিলিত হয়েছে। চরের মাটিতে জৈব সার না থাকায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই চরাঞ্চলে ধৈঞ্চা চাষের মাধ্যমে পলি জমাটের ব্যবস্থাকরণ, জৈব সার ব্যবহারে মাটির গঠন, বুনট বৃদ্ধি করে কৃষি জমি পুনরুদ্ধার (Land Reclamation) এবং জমির উচ্চতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আর এ কৃষি জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন করতে হলে প্রথমে চরের কৃষকদের বিভিন্ন ধরণের কৃষি সহায়তা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। চরের বিপুল জমিতে কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে, খাদ্য নিরাপত্তাসহ পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে। ফলে চরাঞ্চলের জনগোষ্ঠির স্বাস্থ্যমানের উন্নয়ন ঘটবে। এছাড়াও কৃষি পণ্যের ন্যাযমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে চরাঞ্চলে গোপাট নির্মাণ এবং গ্রামিণ সেনিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়ন করতে হবে। কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি চর এলাকায় যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠি রয়েছে, তাদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ফসলের ন্যায মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে উচ্চ মূল্যের ফসলের গ্রেডিং, প্যাকেজিং এর সাথে ক্ষুদ্রাকার হিমাগার ও বিভিন্ন ধরণের শিল্প/খামার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে চরের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রবাহ সৃষ্টি হবে। তাই সরকারি পর্যায়ে মুভেবল এবং পোর্টেবল সেচ প্রদর্শনীর সফলতার ওপর ভিত্তি করে আধুনিক প্রযুক্তির পানি সাশ্রয়ী ড্রিপ ও স্পিংকলার সেচ পদ্ধতির সমন্বয়ে ‘যমুনা ও তিস্তার চরাঞ্চল সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও জীবিকায়ন’ শিরোনামে প্রকল্প গ্রহণপূর্বক চরাঞ্চলে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নত জাতের উচ্চ মূল্যের ফসল ও শাক-সবজি উৎপাদন এবং বিপুল জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যেতে পারে। ফলে কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি এ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে চরের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
‘ফিতা পাইপ ব্যবহার করুন, পানির অপচয় রোধ করুন’
লেখক : প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কৃষি ভবন, ঢাকা।