আমিনুল ইসলাম
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তোজাম কাকাদের মাটির ঘরের দেয়ালে পোস্টার : তর্জনী উঁচানো একটি মুজিব কোট পরা ছবি আর লেখা : এবারের সংগ্রাম… আমাদের মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম… স্বাধীনতার সংগ্রাম! মুগ্ধ আমার চোখ। তার চেয়ে বিস্মিত আমার বালকমন; কিন্তু কোনোকিছু না বুঝেই। শুধু ঐরকম একটা ছবি পেতে চেয়েছিলাম আমাদের খড়ের ঘরের ভেতরের টাটিতে টাঙিয়ে রাখার জন্য; কিন্তু কেউ দেয়নি।
২। দেশ স্বাধীন হলো। একটু একটু করে বুঝতে শিখলাম। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠলাম। আমাদের ছাত্রত্বকালে জাসদ ছিল মেধাবী ছাত্রদের জন্য মৌচাক। আমি কোনো নেতা ছিলাম না। তেমন সক্রিয় কর্মীও ছিলাম না। তবু মেজর জলিল, আসম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম জিকু, রাশেদ খান মেনন প্রমুখদের বক্তৃতা শোনার জন্য দূর দূরান্ত থেকে রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে জড়ো হতাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান সেন্টু ভাইয়ের বক্তৃতা আমাদের হাইস্কুল জীবনকে মাতোয়ারা করে দিতো। কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্রজীবনের এসব স্বপ্নের নায়ক আমাকে হতাশ করেছেন। আমি আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় লিখতে বাধ্য হয়েছি:
‘পতনের হাত ধরে প্রলোভের গোপন শকটে
বিপ্লবীরা চলে যায় পুঁজিবাড়ি ভোগের বাগানে,
প্রবাদের কণ্ঠসম সাম্যধ্বনি প্রেসক্লাব গেটে
হেসে ফেলে রিক্সাওয়ালা টাঙ্গাওলার বেফাঁস জবানে।’
৩। হতে চেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু এমএ পাশ করার আগেই ক্লাসমেটদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় বসা। প্রশাসন ক্যাডারে নিজ ব্যাচে মেধা তালিকায় একেবারে উপরের দিকে। দোলাচল। ঘুম হারাম করা সিদ্ধান্তহীনতা। তবু যোগদান করলাম। প্রথম পোস্টিং যশোর কালেকটরেটে। সরকারি চাকরি। সেখানে কয়েক মাস চাকরি। এরই মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপত্র পেলাম। কিন্তু আমলাতন্ত্র জিলাপি এনে হাজির করলো প্রত্যাশার প্লেটে। আহা প্যাঁচ! আমার স্বপ্নের পায়ে বেড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করা হলো না। আমি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত প্রেমের গল্প ‘একরাত্রি’-এর কক্ষচ্যুত নায়ক রতন মাস্টার হয়ে রইলাম সারাজীবন। না সেই সুরবালা আমার হলো; না আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলাম। তবে অনিচ্ছার চাকরিটা আমাকে সারাদেশ দেখার সুযোগ করে দিলো। ঘুরলাম সারা বাংলাদেশ। কিন্তু চাকরিতে ভালো করা আমার হলো না। আমার এক পরাক্রান্ত ব্যাচমেট একদিন আমাকে দেখে উপহাস করে বললেন—–না আমলা, না কবি। পরাক্রান্ত সেই ব্যাচমেটের তরিকা অনুসরণ করার শক্তি, সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার ছিল না। তাই সেই ফারসি কবির মতো আমি বলি না:
‘কত না হস্ত চুমিলাম আমি অক্ষমালার মতো,
কেউ খুলিলো না কিসমতে ছিল আমার গ্রন্থি যত।’
৪। একটা বিষয় কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করি, প্রশাসনের চাকরিতে একটা বিরাট লাভ হয়েছে। ভূমিহীন দিনমজুর থেকে বিলিওনার, পিওন থেকে প্রেসিডেন্ট, সাধু থেকে সন্ত্রাসী, এককথার মানুষ থেকে মোনাফেক, অমায়িক মানুষ থেকে চরম উদ্ধত-বদরাগী, জনদরদী থেকে লুটেরা, কেরানী থেকে কবি, অসহায় নারী থেকে বাহাদুর পুরুষ, মাদ্রাসার চুলবাঁধা আয়েশা আক্তার থেকে চুলখোলা টিভি মডেল তারিনা এবং শ্যামল বাংলার ওড়না উড়ানো ভূপ্রকৃতি থেকে ইউরোপের বিউটি পার্লার চর্চিত উঠোন, গরুর গাড়ি থেকে বিমান, ঝক্কড়মার্কা লোকাল ট্রেন থেকে জাপানের সুপারসনিক ট্রেন… সবকিছুরই প্রত্যক্ষ সাহচর্য ও অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পেয়েছি। আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের জীবনে এটা তো কম পাওয়া নয়।
৫। চাকরিজীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে আরও একটি মহামূল্যবান অভিজ্ঞতা। একজন প্রকৃত জনপ্রতিনিধির সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা হলো। অমিতাভ বচ্চনের মতো দীর্ঘদেহী এবং সুদর্শন। অবশ্য চুল পড়ে যাওয়ায় সৌন্দর্যে কিছুটা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এখনও প্রচ- গতিসম্পন্ন। হিন্দি ‘শোলে’ ছবির রিমেক করা হলে তাঁকে নির্ভাবনায় সঞ্জীব কুমারের রোল দেওয়া যাবে। প্রচ- স্পষ্টবাদী। যা বলেন, সরাসরি বলেন। কোনো ভণিতা নেই; প্যাঁচ নেই; ডাবল স্টান্ডার্ড নেই।
৬। গত ৯-১১ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে তাঁর সাথে সমবায়ী সফর; গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, যশোর। কাজ আর কাজ। সরেজমিনে পরিদর্শন, বক্তৃতা, পরামর্শ, উদ্বোধন, মতবিনিময়। খাওয়া-দাওয়া? বিশ্রাম? সকল সিলেবাস ফেল। রুটিন ফেল। দুপুরের খাবার মাগরেবের আজানের সময়। ক্লান্তি নেই। শ্রান্তি নেই। বিরক্তি নেই। বাঙালি জাতি বিখ্যাত যে তৃতীয় লম্বা হাতটির জন্য… সেই ‘অজুহাত’ অনুপস্থিত।
৭। করোনা ভাইরাসের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মানুষের ভিড়। মাঝে মাঝে ধাক্কা লাগছে তাঁর গায়ে। কাউকে বলছেন না, একটু সরে দাঁড়ান! সমবায়ীদের সাথে প্রাণ খুলে কথা বলছেন। তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা শুনছেন। তাদের কাছে আরও আগে আসতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছেন। আবার শীঘ্রই আসবেন, এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এসব সমবায়ীর জন্য আরো কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে সচিব মহোদয়সহ আমাদেরকে খেয়াল রাখার অনুরোধ জানাচ্ছেন। মোলায়েম ভাষায়। নম্র উচ্চারণে। তিনি যে মন্ত্রী… অনেক ক্ষমতা তাঁর… এমন প্রদর্শনীর বালাই নেই তাঁর আচরণে কিংবা অভিব্যক্তিতে। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছেন, জোর খাটানো জোরের লক্ষ্মণ নহে, এটা বোধহয় তিনি আগে থেকেই রপ্ত করে রেখেছেন।
৮। বেলা ৩টা। স্থান: খুলনার ডুমুরিয়া। সমবায়ী সমাবেশ শেষ। কেশবপুরের উদ্দেশ্যে চলছে গাড়ি। পেটে ক্ষুধার হৈচৈ। ‘কাকাবাবু আমার গরুগুলো দেখে যান।’ নেমে পড়লেন। সরু ঘিঞ্জি এবং অবশ্যই অপরিস্কার রাস্তা। উঁচু নিচু। প্রায় আধা মাইল। গরুর খামার। গোবরের গন্ধ। কোনো বিরক্তির ছাপ নেই তাঁর মুখে। আধা-গরিব প্রায় অশিক্ষিত খামারিদের কাছে পৌঁছাতে পেরে এবং তাদের সাথে কথা বলে গভীর শান্তি লাভ করছেন। তাঁর চোখেমুখে আনন্দের আভা। আর আমরা গোবরের গন্ধে মনে মনে অতিষ্ঠ!
৯। সাগরদাঁড়ি। গাড়ি থেকে নামার সাথে মানুষের ভিড়। কাকাবাবু কেমন আছেন! দাদা আদাব! বৌদি কই? আরও কত প্রশ্ন! সবাই পরিচিত। সবাই আপন। সবাই নিজের লোক। সুর্য অস্ত যেতে আধাঘণ্টা বাকি। দুপুরের খাবারের আয়োজন। ‘ডিজি সাহেব, আসুন, খেয়ে নিন। ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছেন।’ ‘স্যার, মহাকবির সাথে ছবি তুলবো। পরে খাবো।’ তিনি নিজেই ঘুরে ঘুরে সব দেখালেন। আমাদের সাথে মধুকবির সামনে, তুলসীতলায়, পুকুরঘাটে, কাচারিঘরের সামনে… ছবি তুললেন, একটার পর একটা। অনেক অজানা কথা ও গল্প শোনালেন। আর সবসময় মুখে হাসি। উচ্চারণে মধুর আন্তরিকতা। কীসের ক্ষুধা! কীসের শ্রান্তি! তাঁর কাছে সবই পরাজিত।
১০। খাবার টেবিলে। তখন প্রায় সন্ধ্যা। ‘ডিজি সাহেব, এটা চুইঝাল। খাসির মাংস। এই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও নাই।’ অভূতপূর্ব স্বাদ। যশোরেই আমার চাকরিজীবনের শুরু। কই, আগে তো কখনো খাইনি। নামও শুনিনি। ‘আপনার বৌদি বারবার বলে দিয়েছে এই মাংস খাওয়ানোর কথা। কিন্তু আমার উপর আস্থা রাখতে না পেরে অমুককেও দায়িত্ব দিয়েছে।’ খাচ্ছি… লীনা, আমি, সচিব মহোদয়, সচিব ভাবী, বেবী, অন্যান্য সহকর্মীগণ এবং আরও অনেকে। উহু আহা! আর নতুন করে মাংস নেওয়া থালায়। রসিকতা। ‘স্যার, আপনি এই বয়সেও এতটা হ্যান্ডসাম! এত চমৎকার করে কথা বলেন। নিশ্চয় বৌদির সাথে আপনার প্রেমের বিয়ে।’ টেবিলভরা হাসি। ‘না, ডিজি সাহেব, ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করার কারণে আজ বাসায় তো, কাল জেলে। প্রেম করার কথা মনেই আসতো না। সময়ও ছিল না।’ লীনা বলে, ‘দেখছেন দাদা, আপনার ডিজি সাহেব কী দুষ্টু!’ ‘ঠিক আছে, ভাবী। ডিজিসাহেব তো একজন কবি। মজা করে কথা বলেন। চমৎকার বক্তৃতা দিতে পারেন।’
১১। কপোতাক্ষ নদ। তখন প্রথম সন্ধ্যার আলো-আঁধারি। সবাই কপোতাক্ষের ঘাটে। নদ/নদী দর্শন। আসলে তীর্থ ভ্রমণ। লীনা কই! দেখি একটি নৌকায় লীনা, সচিব ভাবী এবং সচিব মহোদয়। মাঝনদীতে। সচিব ভাবীকে চিৎকার করে বললাম, ভাবী, কবিকে বঞ্চিত করা ঠিক হচ্ছে না! নৌকা এসে তুলে নিলো। প্রায় ২০ মিনিট নৌভ্রমণ। অনির্বচনীয় আনন্দ। মনে বাজছিল সাবিনা ইয়াসমিন:
‘সন্ধ্যারই ছায়া নামে এলোমেলো হাওয়া
ভালো লাগে জীবনের এই গান গাওয়া
একটি দু’টি তারা জ্বলে আকাশের কোলে
ভীরু ভীরু মনে কোন স্বপন যে দোলে…’
কিন্তু ভিআইপি যাত্রীদের শুনিয়ে আমি আমার ফাটাবাঁশকে হার মানানো গলায় গাইলাম,
‘মাঝি বাইয়া যাও রে….
দীক্ষা শিক্ষা না হইতে আগে করছো বিয়া,
ও তুই বিনা খতে গোলাম হইলি
গাইটের টাকা দিয়া রে মাঝি,… বাইয়া যাও রে…’
মহাকবির প্রস্থান ঘাট থেকে নৌকা ভিড়লো মূল ঘাটে। ‘ও মাই গড!’ মন্ত্রী মহোদয় লোকজন নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের জন্য। ভাবছিলাম, তিনি যদি অন্য কোনো ‘বস’ হতেন, তবে কী হতো!
১২। সাগরদাঁড়ি থেকে মণিরামপুর। রাত ৮টা। একতার মন নিয়ে মাঠের দখল নিয়ে আছে অন্ধকার। নিশ্ছিদ্র। আমার নিজের লেখা কবিতার লাইন মনে পড়ছিল:
‘কাকের একতার মতো ঘনতায় জমা হয়েছে
শব্দহীন অন্ধকার।
বিস্তারিত আঁধার ছুয়ে ফেলেছে
পারস্যের প্রভাতী মুখ
আফ্রিকার মেঘলা চুল
পারস্যের ধবধবে ঊরু;’
সেই আঁধার মন্ত্রী মহোদয়কে চেনে। তাই তাঁর জন্য কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। মাঠের মাঝে এক জায়গায় গাড়ি রেখে হাঁটা। সহায়তায় মোবাইল ফোনের লাইট। একটি মোটরসাইকেলের হেডলাইটের পরাক্রান্ত আলো। অবশেষে ঘটনাস্থল। পল্লী উন্নয়ন একাডেমির জন্য নির্বাচিত স্থান পরিদর্শন। তিনি নানাভাবে সচিব মহোদয়কে বুঝাচ্ছিলেন। স্থানটির উপযুক্ততা। এলাকার কি কি উপকার হবে ইত্যাদি। তাঁর মুখে ভবিষ্যতের স্বপ্নমাখা আলো। আনন্দ। ভাবছিলাম, এই মানুষটি শারীরিকভাবেও কি ক্লান্ত হন না? সম্ভবত জনগণের উপকার করে যিনি আনন্দ পান, তাকে কোনোকিছুই ক্লান্ত করতে পারে না। এই আনন্দ অন্যদের কাছে অপরিচিত। অধরা।
১৩। রাত ৯টা। এটা সার্কিট হাউস নয়। বৌদির বাড়ি। লীনা এবং সচিব ভাবী আগেই এসে বসেছিলেন। কত আয়োজন! ওয়াশরুমে যাবার কথা বাসার কাজের লোক নিসারকে বলতেই মন্ত্রী মহোদয় নিজে আমাকে নিয়ে গেলেন একটি বেডরুমে এবং ওয়াশরুমের দরোজা খুলে দিলেন। আমি অবাক না বিড়ম্বিত— সেটা ভাবার সময় ছিল না। সেই বাড়িতে বেশ কিছু ছবি ওঠানো হলো। ছবিগুলো নিশ্চয়ই কবির আমাকে দেবেন। সমস্ত ভ্রমণে এপিএস কবিরকে মনে হয়েছে মন্ত্রী মহোদয়ের যোগ্য, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। কিন্তু শাকিব খানের মতো রূপযৌবন নিয়ে কেন সে সিনেমা পাড়ায় যায়নি, তা আমার বোধগম্য নয়। মন্ত্রী মহোদয় নিসারের নিñিদ্র বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠার কথা বলছিলেন বারবার। আমরা বৌদির কথা বলতেই স্যারের চোখেমুখে অদ্ভুত সুন্দর আভা ফুটে উঠলো। তিনি বৌদিকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। তাঁর ওপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত থাকেন। কথার ছলে বললেন, ‘ডিজিসাহেব, এটা তো আপনার বৌদির বাড়ি। আমি একদিন রিকশা করে কাচাবাজার নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। বাসার সামনে এসে থামাতে বলায়, রিকশাওয়ালা বললো, এখানে কেন? এটা তো বৌদির বাড়ি !’
১৪। ডিসেম্বর ১১। দুপুরের সার্কিট হাইসে একসাথে দুপুরের খাবার। আবারও খাসির মাংস; চুইঝাল নয়। কিন্তু তেমনি স্বাদ। আমরা লাঞ্চের পর ঝিকরগাছায় ফুল উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি দেখতে যাবো। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবকে ফোন করে বলে দিলেন, আমাদের সচিব এবং ডিজি সাহেব যাবেন ফুলবাগানে। সাথে ভাবীরা থাকবেন। সবকিছু ঠিকঠাক ব্যবস্থা করেন। আমরা তো মহাখুৃশি বটেই। তিনি বারবার যশোরের ফুলচাষীদের কথা বললেন। ফুলচাষের ইতিবৃত্ত বললেন।
১৫। অতঃপর…
ঢাকায় প্রত্যার্তন। রোববার অফিসে গেলাম। একজন মাননীয় জনপ্রতিনিধি সেলফোন থেকে ফোন দিলেন। তাঁর নির্দেশের কথা বললেন। আমি বললাম, স্যার, এটা আমার এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নয়। তাছাড়া আপনি যা বললেন তাতে তো দেখা যাচ্ছে আমার জেলা সমবায় অফিসার আইনসম্মত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সেটা পাল্টানোর সুযোগ নাই। তিনি রেগেমেগে একাত্তরের ২৬ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট–এর রাত! প্রায় ১৫ মিনিট পর জেলা সমবায় অফিসার অসহায়ত্বের স্বরে আমাকে ফোন করে জানালেন, মাননীয় জনপ্রতিনিধি তাকে যা-তা ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। আমি বললাম, তোমার সিদ্ধান্ত যদি আইনসম্মত হয়ে থাকে, তবে তুমি তোমার সিদ্ধান্তে অটল থাকো। প্রয়োজনে বিষয়টি আমি মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করবো। ভয় পেও না। উল্লেখ্য, এর আগেও বেশ কয়েকবার এমন চাপ এসেছে পাওয়ারফুল মহল থেকে। তিনি আমাদের প্রটেকশন দিয়েছেন। তাঁর ভূমিকা সমবায় বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সাহস জোগায়। এটিও সমবায়-বান্ধব মানসিকতা।
মাননীয় প্রতিমন্ত্রী আমি জানি, হাজার ব্যস্ততার মাঝে আমার এই স্ট্যাটাস পড়ার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হবে না আপনার। সেটা আমার লক্ষ্যও নয়। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। আমি রোগশয্যায় শুয়েও লিখি। আপনার সাফল্যে আমি উৎসাহিত বোধ করি বরাবরই। আপনার সাথে ৩দিনের বিরল সফরের সুযোগ আপনাকে নিবিড় জানার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি লেখালেখি করি বলে এসব অভিজ্ঞতা আমার কাজে লাগে। লীনা, আমি এবং আমরা সবাই খুশি। রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষদের একজন হতে চেয়ে আকুলতা ব্যক্ত করেছিলেন,
‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক,
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয়।’
আপনার অমনতর প্রার্থনার প্রয়োজন হয়নি; হবেও না। কারণ আপনি তৃণমূল থেকে উঠে আসা মানুষ। সরকারি দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে রাজধানীতে বসবাস করলেও আপনার অস্তিত্বে জড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষের এঁটেল ভালোবাসার ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ আমাকে মুগ্ধ করেছে পুরো সফরকাল।
কিন্তু আমার কেন জানি আশংকা হচ্ছে, আপনার মতো বিরল তৃণমূল নেতাদের সাফল্যের আড়ালে বেড়ে উঠছে একধরনের পথভ্রষ্ট প্রজন্ম। রবীন্দ্রনাথ বিধাতাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’
মাননীয় জননেতা, আপনারা কাদের হাতে পতাকা দিয়ে যাবেন?
লেখক : নিবন্ধক ও মহাপরিচালক, সমবায় অধিদপ্তর।

