মো. জিয়াউল হক
আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পটি ২টি ইউনিটে বিভক্ত। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার আশুগঞ্জে একটি ইউনিট এবং নরসিংদী জেলার পলাশে অপর ইউনিটটি অবস্থিত। তৎকালিন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), যা বর্তমানে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেড (এপিপিসিএল) এর আশুগঞ্জে অবস্থিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং সিস্টেমে ব্যবহারের জন্য ১১৬০ কিউসেক পানি মেঘনা নদী হতে উত্তোলন এবং কুলিং কাজে ব্যবহারের পর পুনরায় নিষ্কাশন নালার মাধ্যমে মেঘনা নদীতে পতিত হয়। ১৯৭৫ সালে তৎকালিন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মরহুম হাজী খুরশিদ সিকদার ও মরহুম মাহবুবুল হুদা ভূঁইয়াসহ কিছু উদ্যোগী জনপ্রতিনিধি/কৃষক সম্মিলিতভাবে প্লান্টে নির্গত গরম পানিকে ঠান্ডা করে সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উদ্যোগী ব্যক্তিবর্গ আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইনটেক পয়েন্টে একটি হেড রেগুলেটর নির্মাণের মাধ্যমে কুলিং ওয়াটারের আংশিক গতি পরিবর্তন করে পার্শ্ববর্তী এলাকার আবাদী জমিতে স্থানান্তর করে রবি মৌসুমে ইরি ধানের জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সফলতা প্রমাণ করে। এ কার্যক্রম তৎকালিন কৃষককুলের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগায় এবং উৎসাহের সঞ্চার করে।
আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প নামকরণ: বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চফলনশীল বীজ, সার ও সেচের পানি ব্যবহারের মাধ্যমে গম, ভুট্টা, ধান প্রভৃতির উৎপাদন অতিদ্রুত যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে তাকে ‘সবুজ বিপ্লব’ (Green Revolution) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এখানে ‘বিপ্লব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে দ্রুত পরিবর্তনের অর্থে। এ পরিবর্তনটি এসেছে প্রচলিত (Conventional) পদ্ধতির চাষাবাদ থেকে অধিক উৎপাদনক্ষম নতুন প্রযুক্তির চাষাবাদে রুপান্তরের মাধ্যমে। আর ‘সবুজ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে উৎপাদিত শস্যের কাঁচা রং হিসেবে। বাস্তবে দেখা যায়, শস্য যৌবন প্রাপ্ত হলে এর নান্দনিক সবুজ রং প্রকাশ পায়। ১৯৬৮ সালে ইউএসএইড-এর পরিচালক উইলিয়াম এস. গাউড এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভাষণে দ্রুত ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির কলা-কৌশলকে ‘সবুজ বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আর এ সবুজ বিপ্লবের জনক ছিলেন যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা ড. নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীনতার পর পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে কিভাবে পুনর্গঠন করা যায়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে চলছিল ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ। তিনি এ ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ হতে মুক্তির জন্য বাংলার কৃষক ভাইদের নিকট সবুজ বিপ্লবের ডাক দেন। তৎকালিন কৃষক জনতা জাতির জনকের ডাকে সাড়া দিয়ে কৃষিতে বিপ্লব ঘটায়, যা অদ্যবধি চলমান রয়েছে। তাঁরই ডাকে সাড়া দিয়ে আশুগঞ্জের স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, জনপ্রতিনিধি এবং কৃষকদের উদ্যোগে আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং কাজে ব্যবহৃত গরম পানিকে ঠান্ডাকরণের মাধ্যমে আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প নামে সেচ কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে সরকারিভাবে ১৯৭৮-৭৯ সালে আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যার বর্তমান নাম ‘আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’।
প্রকল্প এলাকা ও কার্যালয়: চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার ৪টি উপজেলা যথাক্রম-ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর, আশুগঞ্জ, সরাইল ও নবীনগর এবং ঢাকা বিভাগের নরসিংদী জেলার ৩টি উপজেলা যথাক্রম-নরসিংদী সদর, পলাশ ও শিবপুর নিয়ে প্রকল্পটি গঠিত। আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পে একজন প্রকল্প পরিচালক ও দুইজন উপ-প্রকল্প পরিচালক এর কার্যালয় রয়েছে। প্রকল্প পরিচালক ও আশুগঞ্জ অংশের একজন উপ প্রকল্প পরিচালক এর কার্যালয় ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার শিমরাইল কান্দিস্থ বিএডিসি সেচ ক্যাম্পাস এবং অপর একজন উপ প্রকল্প পরিচালক এর কার্যালয় বিএডিসির নিবার্হী প্রকৌশলী, নরসিংদী জেলার কার্যালয়ে অবস্থিত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য:
১) আশুগঞ্জ ও ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যথাক্রমে ১১০০ কিউসেক ও ৮০০ কিউসেক কুলিং ওয়াটার দ্বারা ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার ৪টি উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন এবং নরসিংদী জেলার ৩টি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন অর্থাৎ সর্বমোট ৩৮টি ইউনিয়নের ২৪,৮৬০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান;
২) প্রকল্প এলাকায় ভূপরিস্থ পানির (তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং ওয়াটার) এর সাহায্যে সেচ প্রদান করে ১,০৮,৭৬২ মে. টন খাদ্য শস্য উৎপাদন;
৩) গ্র্যাভিটি ফ্লো এবং সেকেন্ডারি লিফটিং এর মাধ্যমে সেচ প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের ও সাইজের সেচ অবকাঠামো নির্মাণ;
৪) প্রকল্প এলাকায় সুবিধাভোগী কৃষকদের সেচ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মকান্ড অন্তর্ভুক্ত করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনকরণ।
১৯৭৮-৭৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সরকারের আর্থিক সহায়তায় ৮৭.৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৭৯-৮২ মেয়াদকালে ‘আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প’নামে একটি সেচ প্রকল্প গ্রহণ করে। উক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং সিস্টেমে ব্যবহৃত পানির সাহায্যে প্রায় ৩২৫০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করে। একই সময়ে নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ঘোড়াশালে অবস্থিত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং সিস্টেমে ব্যবহৃত পানি সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য স্থানীয় প্রাক্তন সাংসদ মরহুম আহমেদুল কবীর এর উদ্যোগে আশুগঞ্জের অনুরূপ একটি সেচ প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করা হয়।
১৯৯০-৯১ সালে তৎকালিন সরকারের নির্দেশনায় চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক (১৯৯০-৯৫) পরিকল্পনায় আশুগঞ্জ ও পলাশ অংশের ২টি প্রকল্পকে একীভূত করে ১৯৯১-৯৫ মেয়াদকালে ৩১৭৮.৮৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’ ১ম পর্যায় শিরোনামে নামে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পে আশুগঞ্জ অংশে ২৫০ কিউসেক এবং পলাশ অংশে ১৫০ কিউসেক মোট ৪০০ কিউসেক কুলিং ওয়াটার ব্যবহার করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর, সরাইল ও নবীনগর এবং নরসিংদী জেলার পলাশ, নরসিংদী সদর ও শিবপুর উপজেলায় মোট ৫০৭০ হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা প্রদান করা হয়।
১ম পর্যায় প্রকল্পটি সাফল্যজনকভাবে বাস্তবায়ন ও ১৯৯৫-৯৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার আশুগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার পলাশের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং পানিকে শীতলীকরণের মাধ্যমে সেচ প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৯৬-০২ মেয়াদকালে ২১৫৬.২২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘মাহবুবল হুদা ভূঁইয়া আশুগঞ্জ পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’ ২য় পর্যায় শিরোনামে একটি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে আশুগঞ্জ অংশে ৫০০ কিউসেক এবং পলাশ অংশে ৩০০ কিউসেক মোট ৮০০ কিউসেক কুলিং ওয়াটার সেচ কাজে ব্যবহার করে মোট ১০,৪৯০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করা হয়।
২য় পর্যায়ের ধারাবাহিকতায় ও আইএমইডি’র সুপারিশের আলোকে এবং বিএডিসি কর্তৃক সফলভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ভূপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ এলাকা বৃদ্ধি ও উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ২০০২-০৮ মেয়াদকালে ২৮৪১.৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’ ৩য় পর্যায় শিরোনামে নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে আশুগঞ্জ অংশে ৬০০ কিউসেক এবং পলাশ অংশে ৪০০ কিউসেক মোট ১০০০ কিউসেক কুলিং ওয়াটার সেচ কাজে ব্যবহার করে ব্রাহ্মণবাডিয়া ও নরসিংদী জেলায় ১৫,৮০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়েছে।
৩য় পর্যায়ের প্রকল্পটি সুষ্ঠু ও সফলতার সাথে বাস্তবায়ন ও তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং ওয়াটার দ্বারা আরও সেচ এলাকা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আইএমইডি’র সুপারিশের আলোকে কৃষিবান্ধব সরকাররের নির্দেশনায় বিএডিসি ২০০৯-১৪ মেয়াদকালে ২৫৪২.৩৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’ ৪র্থ পর্যায় গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। এ পর্যায়ে আশুগঞ্জ অংশে ১০০০ কিউসেক এবং পলাশ অংশে ৬০০ কিউসেক মোট ১৬০০ কিউসেক কুলিং ওয়াটার ব্যবহার করে প্রায় ২২,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হয়।
৪র্থ পর্যায়ের প্রকল্পটি সুষ্ঠু ও সফলতার সাথে বাস্তবায়ন ও বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নির্দেশনায়, আইএমইডি’র সুপারিশের আলোকে ২০১৫-২০ মেয়াদকালে ২৩৩৫.৮২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’ ৫ম পর্যায় গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় আশুগঞ্জ অংশে ১১০০ কিউসেক এবং পলাশ অংশে ৮০০ কিউসেক মোট ১৯০০ কিউসেক কুলিং ওয়াটার ব্যবহার করে পূর্বেরসহ ২৪,৮৬০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়। প্রকল্প সমাপ্তিকালে মোট ২৪,৮৬০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদান করে প্রতি বছর উৎপাদিত ধানের পরিমাণ ১,০৮,৭৬২ মে.টন এবং প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় ২৮২.৭৮ কোটি টাকা।
ব্যতিক্রমধর্মী সেচ প্রকল্প: সম্পূর্ণ ভূপরিস্থ পানি নির্ভর ও প্রাইমারি লিফটিং এ কোন প্রকার সেচযন্ত্র ব্যবহার না করে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত পানি ড্রেনেজ ক্যানেলে ওয়াটার কন্ট্রোল স্ট্রাকচার নির্মাণপূর্বক পানির গতিপথ পরিবর্তন করে কুলিং রিজার্ভারের মাধ্যমে বিভিন্ন সেচ খালে সরবরাহ করা হয়। প্রকল্প এলাকায় ২-ধরণের সেচ কার্যক্রম চালু রয়েছে- প্রথমত: কোন প্রকার সেচযন্ত্র ব্যবহার না করে প্রকল্পের বিভিন্ন প্রাইমারি ক্যানেল থেকে সরাসরি কৃষি জমিতে গ্র্যাভিটি ফ্লো’র মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দ্বিতীয়ত: প্রকল্পের বিভিন্ন ফিডার ক্যানেলে ছোট ছোট সেচযন্ত্র স্থাপন করে কৃষক পর্যায়ে সেকেন্ডারি লিফটিং করে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং কাজে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন এবং তা ব্যবহারের পর উক্ত গরম পানি নদীতে নির্গত হয়। এ পানি বিএডিসি’র নিজস্ব প্রযুক্তিতে ঠান্ডা করে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ২৪,৮৬০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমে সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। উক্ত প্রকল্পে সেচের পানি পরিবহণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের বরোপিটকে সেচখালে রূপান্তর করে গ্রাভিটি ফ্লো’র মাধ্যমে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। প্রকল্পটি সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক পানিসম্পদ উত্তোলন না হওয়ায়, পানির নিম্নগামিতা রোধ হচ্ছে। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত পানি সেচে ব্যবহার অর্থাৎ ভূপরিস্থ পানির ব্যবহারের ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচালনা, জ্বালানি ও মেরামত খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে কৃষক নামমাত্র মূল্যে সেচ সুবিধা পাচ্ছে। তাই প্রকল্পটি পরিবেশ ও কৃষিবান্ধব। এক কথায় প্রকল্পটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রকল্প।
প্রকল্পের উপকারভোগী: আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পের প্রতিটি ব্লক ১৫০-২০০ জন কৃষক/কৃষাণি নিয়ে গঠিত এবং প্রতিটি ব্লকে একজন গ্রুপ ম্যানেজার নিয়োজিত রয়েছে। অনুরূপভাবে কিছু কিছু এলাকায় লিফট ইরিগেশন ব্লকে ৮০-১০০ জন কৃষক/কৃষাণি নিয়ে গঠিত এবং প্রতিটি ব্লকে একজন গ্রুপ ম্যানেজার রয়েছে। গ্রুপ ম্যানেজারের দায়িত্ব হলো সেচ মৌসুমে কৃষকদের মাঝে সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে সেচের পানির বিতরণ এবং সেচচার্জ আদায়পূর্বক বিএডিসির স্থানীয় দপ্তরে জমা প্রদান করা। বর্তমানে প্রকল্পে মোট ৪৩০টি সেচ গ্রুপ/দল এবং মোট ৫০,৫০০ জন কৃষক/কৃষাণি পরিবার যারা প্রকল্পের সুবিধাভোগী।
ভূগর্ভস্থ পানির সাশ্রয়: প্রকল্পটি আশুগঞ্জ ও পলাশ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শীতলীকরণ পানি বিএডিসি’র নিজস্ব প্রযুক্তিতে ঠান্ডা করে আশুগঞ্জ অংশে ১৫,০০০ হেক্টর এবং পলাশ অংশে ৯,৮৬০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমে সেচ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। সেচ মৌসুমে ধানে প্রকৌশলগত সেচের চাহিদা ১.২২ একর-মিটার ধরে, ভূপরিস্থ পানির সাহায্যে সেচ সম্প্রসারণের ফলে আশুগঞ্জ অংশে প্রতি সেচ মৌসুমে সাশ্রয়কৃত ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ= ১৫,০০০×১০,০০০×১.২২= ০.১৮ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিক মিটার) এবং পলাশ অংশের পরিমাণ= ৯,৮৬০×১০,০০০×১.২২ = ০.১২ বিসিএম অর্থাৎ দুই অংশের সর্বমোট ০.৩০ বিসিএম (প্রায়)। এ বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি সাশ্রয় এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পানির স্তর নিম্নগামিতা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
প্রকল্পের সাফল্য: ভূপরিস্থ পানি নির্ভর ও গ্রাভিটি ফ্লো’র মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা কল্পে প্রকল্প এলাকায় সেচ কাজ সম্প্রসারণ এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধির নিমিত্ত বিভিন্ন প্রকার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। উক্ত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে গ্রামীণ রাস্তা ঘাটের উন্নয়ন এবং কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও মাঠে উৎপাদিত ফসল বাজারজাতকরণের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও নিম্নোক্ত সুফল পাচ্ছে-
ক) বোরো ধানসহ অন্যান্য উন্নতজাতের শস্য বিন্যাসের মাধ্যমে সেচভিত্তিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে;
খ) সেচের মাধ্যমে শস্যের উন্নতজাত ব্যবহারে উৎপাদন ক্ষমতা ২-৩ গুণ বৃদ্ধি এবং বার্ষিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে;
গ) সেচ অবকাঠামো এবং রাস্তা ঘাট নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়েছে;
ঘ) শস্য বিন্যাসের পরিবর্তন ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে;
ঙ) ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের মাধ্যমে জীবন জীবিকার মান উন্নতি হয়েছে;
চ) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও কৃষি ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশবান্ধব প্রকল্প: প্রকল্পটিতে প্রাইমারি লিফটিং এ কোন প্রকার সেচযন্ত্র ব্যবহার না করে শুধুমাত্র তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত ভূপরিস্থ পানি নির্ভর গ্রাভিটি ফ্লো’তে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ভূপরিস্থ পানির ব্যবহারের ফলে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় বড় ধরনের পানির গতি প্রতিরোধক অবকাঠামো নির্মাণ ও জ্বালানিশক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে না। প্রকল্পটিতে সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করায় পানির নিম্নগামিতা রোধ হচ্ছে। এছাড়াও প্রকল্প এলাকায় শুরু হতে অদ্যাবধি ৫৪,০০০টি বিভিন্ন ধরনের ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রকল্পটি বিরাট অবদান রাখছে।
কৃষিবান্ধব প্রকল্প: প্রকল্পটি আশুগঞ্জ অংশে মেঘনা নদী ও পলাশ অংশে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং কাজে ব্যবহারের পর তা শীতল করে বিএডিসি সেচ কার্যক্রম পরিচালিত করে। কুলিং কাজে ব্যবহৃত ভূপরিস্থ পানিতে উদ্ভিদের খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকায় কৃষকের রাসায়নিক সার কম লাগে এবং ভূপরিস্থ পানিতে বিদ্যমান জৈব সার ফসলের ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। প্রকল্প এলাকাটি বন্যা প্রবণ হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে সেচ প্রদানের ফলে আগাম বন্যার প্রকোপ হতে নিশ্চিত ফসল রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রান্তিক কৃষকগণও পুঁজি বিনিয়োগে অধিক ফসল উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। অপরদিকে, নামমাত্র মূল্যে সেচসুবিধা পাচ্ছে। তাই প্রকল্পটি কৃষিবান্ধব।
যৌবনে পরিসমাপ্তির কারণ: ১৯৯২ সাল হতে বিএডিসি আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পে আশুগঞ্জ অংশে সড়ক বিভাগের ঢাকা-সিলেটসড়কের পার্শ্বে সড়ক বিভাগের বরোপিট ক্যানেলটি সেচ খাল এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এর ১.৩০ একর অব্যবহৃত পুকুরটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং ওয়াটার শীতলীকরণ কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইতোমধ্যে পিডিবি বিএডিসিকে অবহিত না করে উক্ত পুকুরটি বালি ভরাট করে। ফলে কুলিং কার্যক্রম এবং সেচনালায় পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্প পরিচালক, বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতে উপস্থাপন করলে কমিটি পিডিবিকে বালি ভরাট বন্ধ এবং পূর্বাস্থায় ফেরৎ আনার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশনা প্রদান করে। পিডিবি বিষয়টি অদ্যাবধি কোন প্রকার সুরাহা করেনি। অপরদিকে, প্রকল্প শুরু হতে বরোপিট ক্যানেলটিতে সেচ কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন প্রকার সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে সড়ক বিভাগ আশুগঞ্জ-ধরখার-আখাউড়া সড়কটি ৪ লেনে উন্নিতকরণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সড়ক বিভাগের প্রকল্প দপ্তর হতে জানানো হয়েছে, বরোপিট ক্যানেলটি ভরাট করে বিদ্যমান সড়কটি ৪ লেনে উন্নীত করা হবে। যদি সড়ক বিভাগের বরোপিট ক্যানলটি ভরাট করা হয়, তবে বিএডিসির কর্তৃক পরিচালিত আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পের আশুগঞ্জ অংশে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, আশুগঞ্জ, সরাইল ও নবীনগর উপজেলায় প্রায় ১৫,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। ফলে ৬৫,৬২৫ মে. টন খাদ্য শস্য উৎপাদন ব্যহত এবং ৩৪,১২৫ কৃষক পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। যাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রতি সেচ মৌসুমে প্রায় ১৭০.৬৩ কোটি টাকা। অপরদিকে, কৃষক বিকল্প পন্থায় প্রতিবছর সেচ মৌসুমে ০.১৮ বিসিএম ভূগর্ভস্থ পানি যান্ত্রিকভাবে উত্তোলনে পানির স্থিতিশীল স্তরের নিম্নগামিতা শুরু হবে।
পরিত্রাণের উপায়সমূহ: আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্ত প্রদান করে-
‘প্রকল্প এলাকায় সেচ প্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একটি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে’। তদানুযায়ী বিএডিসি’র ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি বাস্তবধর্মী প্রস্তাব দাখিল করে। উক্ত দাখিলকৃত প্রস্তাবের ওপর গত ২০১৭ সালের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, লে-আউট/মাস্টার প্ল্যান তৈরি এবং অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করার নিমিত্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করে। সে প্রেক্ষিতে বিএডিসি ‘Feasibility Studz and Master Plan for Ashugonj-Polash Agro-Irrigation Project-4th Phase’ এ প্রকল্প এলাকায় সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, ড্রইং ডিজাইন, লে-আউট প্ল্যান সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদনের লক্ষ্যে সরকারি ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান Centre for Environmental and Geographic Information Services (CEGIS) কে নিয়োগ প্রদান করা হয়। সে মোতাবেক প্রতিষ্ঠানটির সুপারিশকৃত প্রস্তাব প্রকল্প পরিচালক, আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্প’ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া কর্তৃক প্রকল্প পরিচালক, সড়ক বিভাগকে জানানো হলে, জবাবে সড়ক বিভাগ জানান যে, বর্ণিত সুপারিশমালা গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে বিএডিসি’র চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী এবং সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ঐক্যমতে না পৌঁছায় সড়ক বিভাগের প্রকল্প দপ্তর হতে বোরোপিট ক্যানেলটিতে পানির প্রবাহ বন্ধ করার জন্য তাগিদ দেয়া হচ্ছে। সে প্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করা হয়। এদিকে বরোপিট ক্যানালে পানির প্রবাহ বন্ধ করা হলে, আশুগঞ্জ অংশে ১৫,০০০ হেক্টর জমিতে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূপরিস্থ পানির সাহায্যে সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে না। এ উদ্ভুত সমস্যা হতে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১,৪২,২৭৬ হেক্টর এবং সেচকৃত জমির পরিমাণ ১,১৪,৮৯৮ হেক্টর। এ ১,১৪,৮৯৮ হেক্টর জমির মধ্যে ৩৩,৮০০ হেক্টর হাওর এবং ৮১,০৯৮ হেক্টর সমতল ভূমি। বর্তমানে ৮১,০৯৮ হেক্টর জমির মধ্যে আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং ওয়াটারের মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে ১৫,০০০ হেক্টর, বাকি ৬৬,০৯৮ হেক্টর কিছুটা সেচবিহীন এবং কিছুটা বর্তমানে বিভিন্ন প্রকার সনাতন এবং আধুনিক সেচযন্ত্রের মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং কাজে ব্যবহৃত পানির পরিমাণ ১৮৪০ কিউসেক, বিএডিসি উক্ত পানির মাত্র এক তৃতীয়াংশ সেচ কাজে ব্যবহার করছে। বাকি দুই তৃতীয়াংশ পানি ব্যবহার করে আরও ৩০,০০০ হেক্টর জমিতে ভূপরিস্থ পানির সাহায্যে সেচসুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে সড়ক বিভাগের ঢাকা-সিলেট সড়কটি ৪ লেনে উন্নিতকরণ প্রকল্প হাতে নেয়া, প্রকল্প প্রণয়ন কাজটি থমকে যায়। অপরদিকে সংস্থার চেয়ারম্যান মহোদয় কর্তৃক আশুগঞ্জ পরিদর্শনকালে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রধান প্রকৌশলী জানান দেশে বিদ্যুতের চাহিদার প্রেক্ষিতে আরও দু’টি নতুন ইউনিট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। আশা করা যায়, আগামী জুন/২০২১ সালের মধ্যে একটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে, যার কুলিং কাজে ব্যবহৃত পানির চাহিদা হবে ৩৪০ কিউসেক। ফলে আশুগঞ্জ অংশে মোট ১০টি ইউনিটের নির্গত পানির পরিমাণ দাঁড়াবে ২,১৮০ কিউসেক। তিনি আরও জানান, আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে অপর ইউনিট চালু হলে মোট নির্গত পানির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫২০ কিউসেক। তথ্য প্রযুক্তির যুগে বিএডিসি আধুনিক ও টেকসই সেচ প্রযুক্তি এবং সেচ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটিয়ে আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার সমতল ভূমি ৮০,০০০ হেক্টর জমিতে ভূপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হবে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া ভূপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থায় সাফল্য তৈরি হবে। এতে বর্ণিত জেলায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সাশ্রয় হবে ১.০০ বিসিএম (প্রায়)। ফলশ্রুতিতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের নিম্নগামিতা রোধ করা সম্ভব হবে। ফলে উক্ত এলাকায় কোন সেচের নলকূপ প্রয়োজন হবে না।
উপসংহার: আশুগঞ্জ-পলাশ এগ্রো-ইরিগেশন প্রকল্পটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও সার্থক প্রকল্প। এতে নামমাত্র মূল্যে সেচচার্জ আদায় করা হয়। প্রকল্পটি ভূপরিস্থ পানির নির্ভর হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগামিতা রোধ, রাসায়নিক সার কম লাগে, ফলে উৎপাদন খরচও কম হয়। অপরদিকে ফলন বেশি হয় এবং প্রকল্প এলাকায় পরিবেশের ক্ষতিকারক কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। উপরন্তু পরিবেশ পরিষ্কার রাখার জন্য ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়কৃত সেচযন্ত্র ও তৈল-জ্বালানি ব্যবহার না হওয়ায় অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। তাই প্রকল্পটি যুগান্তকারী, পরিবেশ ও কৃষিবান্ধব। তাই কৃষি ও পরিবেশবান্ধব ভূপরিস্থ পানি নির্ভর এ ব্যতিক্রমধর্মী সেচ প্রকল্পটি চালু থাকলে কৃষক বাঁচবে এবং দেশ বাঁচবে। বৈশ্বিক মহামারি করোনার পরিবর্তিত অবস্থায় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সবুজ বিপ্লব’-এর ডাক এবং তার স্বপ্ন ‘গ্রামীণ অর্থনীতি’র উন্নয়নের দিকে আমাদের সবার ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ‘কৃষক বাঁচাতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, তা নাহলে বাংলাদেশ বাঁচতে পারে না’ এর ওপর ভিত্তি করে তৎকালীন ‘আশুগঞ্জ সবুজ প্রকল্প’ আরও বৃহৎ পরিসরে ‘আশুগঞ্জ-পলাশ সবুজ প্রকল্প’ নামে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, কৃষিবান্ধব সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সংকট হতে পরিত্রাণপূর্বক প্রকল্পটি অনুমোদিত হবে বলে আশা রাখি।
‘ভূপরিস্থ পানি ব্যবহার করুন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় করুন’
লেখক: প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কৃষি ভবন, ঢাকা। (১২/০৫/২০২০)

