ঢাকাThursday , 8 October 2020
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানো (AWD) পদ্ধতিতে সেচ প্রদান
পানি সাশ্রয়ী, সেচ দক্ষতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি

Link Copied!

সেচ নিয়ন্ত্রক পাইপ (সেনিপা) ব্যবহারের মাধ্যমে AWD পদ্ধতিতে সেচ।

মো. জিয়াউল হক
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ এবং এদেশের জনগোষ্ঠির প্রধানতম খাদ্য ধান থেকে উৎপাদিত ভাত। এ দেশের কৃষিতে তিনটি মৌসুম হলো খরিফ-১, খরিফ-২ ও রবি। প্রতিটি মৌসুমে কম বেশি ধান চাষ হয়ে থাকে। তন্মধ্যে রবি মৌসুমে মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ ধান উৎপাদিত হয়। রবি মৌসুমে উফশী ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষের ফলে সেচের প্রয়োজন বেশি হয়। কৃষকরা সাধারণত নভেম্বর হতে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বোরো ধান রোপণ এবং মে মাস পর্যন্ত জমিতে সেচ প্রদান করে থাকে। রবি মৌসুমে খুবই সামান্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। ধান চাষের জীবনকালে ৪৮ একর ইঞ্চি পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে সেচের পানি ব্যবহারে কৃষি প্রকৌশলগত জ্ঞান না থাকায় প্রয়োজনের চেয়ে প্রায় ২-৩ গুণ বেশি পানি ব্যবহার করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে সেচের দক্ষতা মাত্র ৩৮ শতাংশ। অপরদিকে, পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সেচ দক্ষতা, ফিলিপাইন ৫০ শতাংশ, পাকিস্তান ৪৯, চীন ৪৫, থাইল্যান্ড ৪৩, ভিয়েতনাম ৪২, ভারত ৪০%, মায়ানমার ৩৯% এবং শ্রীলংকা ৩৬ শতাংশ। সেচ দক্ষতা বলতে কোন ফসলের জীবনকালে পানির চাহিদা এবং পানির পাম্প বা উৎস হতে ঐ ফসলে পানি সরবরাহের অনুপাতকে বোঝায়, যা শতাংশে প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ধান উৎপাদনে ০.৩৩ কেজি/ঘনমিটার অর্থাৎ এক কেজি ধান উৎপাদন করতে প্রায় ২৫০০-৩০০০ লিটার পানির ব্যবহৃত হয়। অপরদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধান উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রে ১.৫৫ কেজি/ঘনমিটার, চীনে-১.১০ কেজি/ঘনমিটার, দক্ষিণ এশিয়ায় ০.৩৩ কেজি/ঘনমিটার এবং আফ্রিকায় ০.২২ কেজি/ঘনমিটার সেচের পানি ব্যবহৃত হয় (এরশাদুল হক-বিএআরআই); যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বোরোতে সেচের পানির পরিমিত ব্যবহার এবং সেচ দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানো (Alternate Wetting and Drying-AWD) পদ্ধতি সেচ প্রয়োগ নিশ্চিত করা আবশ্যক।
ধান চাষে পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং সঠিক পদ্ধতির সেচ ব্যবস্থাপনা অনুসরণের মাধ্যমে ধানের ফলনের ক্ষতি এড়ানো যায়। বোরোতে সেচ ব্যবস্থাপনায় মোট উৎপাদন খরচের ৩০-৩৫ শতাংশ হয়ে থাকে। ফলে একদিকে পানির অপচয় ও আর্থিকভাবে ক্ষতির পাশাপাশি ধানের উৎপাদনও অনেক কমে যায়। সেচের পানির এ অপচয় রোধকল্পে পানির পরিবহণ দক্ষতা (Water Conveyance Efficiency) বৃদ্ধি এবং পানির প্রয়োগ দক্ষতা (Water Application Efficiency) বৃদ্ধি করা জরুরি। আর এ প্রয়োগ দক্ষতা বৃদ্ধির উপায় হলো বোরো মৌসুমে জমিতে রসের পরিমাণ পরিমাপ করা। এ পরিমাপের উপায় হলো ক) হাতের সাহায্যে মাটির ঢেলাকরণ পদ্ধতি, খ) AWD পদ্ধতি এবং গ) আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর টেনসিওমিটার পদ্ধতি।
পর্যায়ক্রমে ভিজানো ও শুকানো (AWD) পদ্ধতি: AWD পদ্ধতির একমাত্র সরঞ্জাম/উপকরণ হলো সেচ নিয়ন্ত্রক পাইপ (সেনিপা), যা সেচের পানি প্রয়োগের একটি সহজলভ্য ও কম মূল্যের উপকরণ। AWD পদ্ধতি ব্যবহার করে কৃষক তার বোরো ধানের জমিতে কখন সেচ দিতে হবে এবং কতটুকু পানি দিয়ে সেচ দিতে হবে, তা সহজেই নির্ণয় করতে পারেন। সেনিপা একটি ছিদ্রযুক্ত পিভিসি পাইপ, যা সাধারণত লম্বায় ২৫ সেন্টিমিটার (সেমি) বা ১২ ইঞ্চি এবং ব্যাস ৭-১০ সেন্টিমিটার (সেমি) বা ৩-৪ ইঞ্চি হয়ে থাকে। পিভিসি পাইপটির নিচের দিকে ১৫ সেমি জুড়ে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। পাইপটি চারা রোপণের ১০-১৫ দিনের মধ্যে আইলের (জমির প্রতিনিধিত্ব করে এমন জায়গায়) কাছে চারটি ধানের গোছার মাঝে খাঁড়াভাবে স্থাপন করতে হবে যেন এর ছিদ্রবিহীন ১০ সে.মি. মাটির উপর এবং ছিদ্রযুক্ত ১৫ সে.মি. মাটির নিচে থাকে। এবার পাইপের তলা পর্যন্ত ভিতর থেকে মাটি উঠিয়ে নিতে হবে। অনেক সময় জমি চাষের যন্ত্র (লাঙ্গল, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর) ও জমির মাটির প্রকারভেদে মাটির নিচে সেনিপার গভীরতা ৫-৮ ইঞ্চি হয়ে থাকে। কারণ ট্রাক্টর দ্বারা চাষকৃত জমির গভীরতা বেশি এবং গরুর লাঙ্গলে গভীরতা কম হয়ে থাকে। মাটি শক্ত হলে গর্ত করে পাইপটি মাটিতে বসানো যেতে পারে। তবে কোন অবস্থায় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগে সেনিপার গভীরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন নেই। কারণ এক্ষেত্রে ব্যবহৃত সেচের পানির পরিমাণ বেশি কমানো সম্ভব হলেও জমির মাটি ফেটে ধানের ফলন কমার সম্ভবনা থেকে যায় এবং সেচের পানির অপচয় বৃদ্ধি পায়। সেনিপা জমিতে বসানোর পর নিয়মিত পাইপের পানি স্তর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। যখনই পানির স্তর পাইপের তলায় নেমে যাবে, তখনই জমিতে এমনভাবে সেচ দিতে হবে যেন দাঁড়ানো পানির পরিমাণ ৫-৭ সে.মি. হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে ভিজানো এবং শুকানো পদ্ধতিতে জমি ও জাতভেদে ৪০-৫০ দিন পর্যন্ত সেচ চলবে। যখনই গাছে থোঁড় দেখা দিবে তখন থেকে দানা শক্ত হওয়া পূর্ব পর্যন্ত জমিতে স্বাভাবিক ২-৫ সে.মি. পানি ধরে রাখতে হবে। ধান চাষে জমিতে দাঁড়ানো পানিতে শেওলা জমে কুঁশির পরিমাণ কম ও সারের অপচয় হয়, ফলে সার্বিকভাবে উৎপাদন কম হয়। দেখা গেছে, AWD পদ্ধতিতে বোরো ধানে সেচ দিলে দাঁড়ানো পানি রাখার চেয়ে ৫-৬টি সেচ কম লাগে, ২০-৩০ শতাংশ পানি সাশ্রয় এবং হেক্টর প্রতি প্রায় ৫০০ কেজি উৎপাদনও বেশি হয়। ফলে সেচের পানি, জ্বালানি ও সময় সাশ্রয় এবং উৎপাদন খরচও হ্রাস পায়। সেনিপা তৈরিতে পিভিসি পাইপের পরিবর্তে বাঁশ বা সয়াবিন তেলের/পানীয় এক লিটারের প্লাস্টিক বোতল ছিদ্র করেও ব্যবহার করা সম্ভব।
সাবধানতা: AWD পদ্ধতি ব্যবহারে অসাবধানতা বা অজ্ঞতার কারণে জমিতে পানির ঘাটতি হলে ধানে চিটা/অপুষ্ট চাল হওয়ার সম্ভবনা থাকে। এছাড়া কাইচ থোঁড় আসার পর হতে ধান পাকার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ ও রোগ-বালাইয়ের সম্ভবনা থাকে। ধান গাছে ফুল আসার পর AWD পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ আছে, তবে সেক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে সালোক সংশ্লেষণের সময় পানির ঘাটতি না হয়। উল্লেখ্য, কাইচ থোঁড় আসার পর হতে ধান পাকার পূর্ব পর্যন্ত সময়ের বাদামি ঘাস ফড়িং (ব্লাস্ট) এর মত বিপদজনক পোকার আক্রমণ হতে পারে, যা দমনে জমিতে দন্ডায়মান পানি অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।
বিএডিসি’র ক্ষুদ্রসেচ উইং-এর আওতায় জুলাই-২০০৯ হতে জুন-২০২০ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের AWD পদ্ধতির ব্যবহার বিষয়ক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সর্বমোট ৩২,৩০০টি সেচ নিয়ন্ত্রক পাইপ সরবরাহ করা হয়েছে। যা মাঠ পর্যায়ে ব্যবহার করে সেচ খরচ কমানো, পানি সাশ্রয়, কমান্ড এরিয়া ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। শুধুমাত্র কৃষি প্রকৌশলগত প্রযুক্তি AWD পদ্ধতিসহ অন্যান্য সেচের প্রয়োগ পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি করে স্বল্প সময়, স্বল্প ব্যয় এবং সহজে এ ক্ষতি পুরাপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দেশের পানি সম্পদ, যা কৃষি ও মৎস্য সম্পদের উৎপাদনশীল রাখবে, তার নিরাপত্তা বিধানে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। (১১/০৭/২০২০)
‘সেনিপা ব্যবহারে সেচ খরচ সাশ্রয় করে’
লেখক : প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), কৃষি ভবন, ঢাকা।