ঢাকাThursday , 3 September 2020
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বারিড পাইপ নির্মাণে বিএডিসি’র অবদান : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

Link Copied!

মো. জিয়াউল হক
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মোট জনশক্তির প্রায় ৪০.৬০% সরাসরি কৃষি কাজে নিয়োজিত। কৃষকের কৃষি উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৬১ সালের ১৬ অক্টোবর ৩৭ নম্বর অধ্যাদেশ বলে ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (ইপিএডিসি) প্রতিষ্ঠা লাভ করে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) নামে পরিচিত।
মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগে বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা ও উৎপাদন প্রযুক্তির আধুনিক কলা-কৌশল উন্নয়ন অনস্বীকার্য। ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ কমানোর মুখ্য ভূমিকা পালন করে সেচ। তাই সেচের আধুনিক কলা-কৌশল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। ফসল উৎপাদনে মৌলিক উপাদান তিনটি-উন্নত জাতের বীজ, সার ও সেচ। তন্মধ্যে সামগ্রিকভাবে সেচ ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত কার্যক্রম। যে কোন ফসল উৎপাদনে সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৩০-৩৫% অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। সেচ ব্যবস্থাপনা সেচের পানির উৎস, সেচযন্ত্র, পানির পরিবহণ ও বিতরণ, যথাযথ প্রয়োগ, সঠিক সময় এবং পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। তন্মধ্যে পানির পরিবহণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই পরিবহণ ও যথাযথ প্রয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সেচ খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ সেচযন্ত্র মাঠ পর্যায়ে কাঁচা সেচনালার মাধ্যমে পানি পরিবহণ করা হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে সেচযন্ত্রের কাঁচা সেচনালায় পরিবহণ অপচয় প্রায় ৪৭% এবং শাখা ও উপ-শাখা সেচনালায় অপচয় প্রায় ২৩%। ফলে কাঁচা সেচনালায় পানি পরিবহণের কারণে কমান্ড এরিয়া মোট অপচয় ৫০-৭০% (বারি বুকলেট-১৯৯৭)। কাঁচা সেচনালায় সাধারণত বাষ্পীয়ভবন (Evaporation), অনুস্রাবণ (Percolation), চোঁয়ানো (Seepage) এবং আগাছা এর মাধ্যমে অপচয় হয়ে থাকে। ফলে সেচের পরিবহণ দক্ষতা কমে যায়। অপরদিকে, কাঁচা সেচনালায় তৈরিতে মোট কমান্ড এরিয়ার প্রায় ২-৪% আবাদী জমি অপচয় হয় (A.M. Michael, Irrigation Theory and Practice)। তাই সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া, সেচ দক্ষতা এবং সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি নির্ভর বারিড পাইপ ও ফিতা পাইপের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
উন্মুক্ত সেচনালা (Open Channel): যে সকল নালায় সেচের পানি প্রবাহকালে উপরিভাগ মুক্তভাবে/অবাধে পানি প্রবাহিত হয় তাকে উন্মুক্ত সেচনালা বলে। উন্মুক্ত সেচনালা ২ প্রকার যেমন-কাঁচা সেচনালা (Unlined/Earthen Channel) ও পাকা সেচনালা (Lined/Pacca Channel)। সাধারণত মাটি দিয়ে কাঁচা সেচনালা এবং মাটি, গোবর, ধানের তুষ, কাঠের ভুসি ও পাটের কুচির মিশ্রণ দ্বারা উন্নত কাঁচা সেচনালা তৈরি করা হয়ে থাকে। ইট (Bricks), সিমেন্ট কনক্রিট (Cement Concrete-CC) এবং রিইনফোর্সমেন্ট সিমেন্ট কনক্রিট (Reinforcement Cement Concrete-RCC) দ্বারা পাকা সেচনালা তৈরি করা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষক পর্যায়ে কাঁচা ও উন্নত কাঁচা সেচনালা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক হতে সরকারি পর্যায়ে সারাদেশে পাকা সেচনালা নির্মাণ করা হচ্ছে। এ সকল কাঁচা ও পাকা সেচনালা বিভিন্ন সাইজ ও ধরণের হয়ে থাকে। যেমন-ধরণ হিসেবে কাঁচা সেচনালা সাধারণত ট্রাপিওজডাল এবং পাকা সেচনালা আয়তকার (Rectangular), ট্রাপিওজডাল (Trapeyoidal), গোলাকার (Spherical), ভি-আকৃতি (V-Shaft) হয়ে থাকে।
ভূগর্ভস্থ সেচনালা (Buried Pipe): সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য মাটির নির্দিষ্ট গভীরতায় স্থাপিত এবং নির্দিষ্ট সাইজ ও ডিজাইনে পাইপের মাধ্যমে উৎস হতে নির্গত পানি যে নালায় প্রবাহিত হয় তাকে ভূগর্ভস্থ সেচনালা বা বারিড পাইপ বলে। যাতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পাইপ, গ্যাস পাইপ (Air Vent), হেডার ট্যাংক (Header Tank) আলফা আলফা ভাল্ব (Alpha Alpha Valve) ও রাইজার (Riser)। বিএডিসিতে প্রথম পর্যায়ে সিমেন্ট কনক্রিট (Cement Concrete-CC) পাইপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ করা হয়। যার স্থায়ীত্বকাল ছিল খুবই কম। এ সিসি পাইপ প্রায়শই মাটি বা অন্যান্য চাপে ভেঙ্গে যায় ও মেরামতের প্রয়োজন হয়, ফলে সেচ ব্যবস্থাপনার বিঘ্নতা সৃষ্টি হয়। তাই পরবর্তীতে আধুনিক প্রযুক্তির পলিভিনাইল ক্লোরাইড (Polyvinyl Chloride-PVC) পাইপ এবং বর্তমানে উন্নত আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর আন-প্লাস্টিসাইজড পলি ভিনাইল ক্লোরাইড (Unplasticized Polyvinyl Chloride-UPVC) পাইপ ও হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (High Density Polyethylene-HDPE) পাইপ ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ করা হচ্ছে। যার স্থায়িত্বকাল প্রায় ৪০-৫০ বছর বা তারও অধিক। বিংশ শতাব্দীতে কিছু সংখ্যক গভীর নলকূপে বারিড পাইপ নির্মাণ করা হয়। তবে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক হতে সরকারি পর্যায়ে সারাদেশে ব্যাপকভাবে বারিড পাইপ সেচনালা নির্মাণ কাজ শুরূ করা হয়।
ফিতা পাইপ/হুজ পাইপ/পলিথিন পাইপ (Fita Pipe/Hose Pipe/Polythene Pipe): পলিথিন বা মোটা কাপড়ের তৈরি গোলাকার, ওজনে হালকা, পাতলা এবং সহজে বহনযোগ্য যে পাইপের মধ্য দিয়ে সেচের পানি পরিবহণ করা হয় তাকে ফিতা পাইপ/হুজ পাইপ/পলিথিন পাইপ বলে থাকে। যে সকল এলাকা পানি পরিবহণের অভাবে সময়মত সেচ প্রদান করা সম্ভব হয় না, সে সকল এলাকায় এ পাইপ খুবই কার্যকরি। এ পদ্ধতিতে অনেক দূর হতে পানি পরিবহণ করে জমিতে সেচ প্রদান করা যায়। যেখানে কাঁচা সেচনালায় পানির পরিবহণে অপচয় প্রায় ৫০-৭০%, জমির অপচয় ২-৪% সেখানে এ পদ্ধতিতে সেচ প্রদান করলে অপচয় রোধ এবং খরচও অর্ধেক হয়। ফিতা পাইপ/হুজ পাইপ/পলিথিন পাইপে সেচ এলাকা ২০-৩০% এবং পরিবহণ দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এসকল পাইপ যেকোন দৈর্ঘ্য ও সাইজের পাওয়া যায়। সেচ কার্যক্রম পরিচালনা ও পরিবহণের সুবিধার্থে ১০০/১৫০ মিটার করা যেতে পারে। এছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে ফিতা পাইপ রোলিং করার জন্য এক ধরণের যন্ত্র তৈরি করা যায়, যাতে পরিবহণ ও পাইপ সংরক্ষণ করা সহজ হয়। প্রয়োজনে দৈর্ঘ্য বাড়ানো জন্য এসকল পাইপে ক্ল্যাম্প ব্যবহার করা যায়।
বারিড পাইপ নির্মাণের উদ্দেশ্য/সুবিধাসমূহ:
১) মাটির গভীরে স্থাপিত হয়, বিধায় আবাদী জমির অপচয় হয় না;
২) অপচয়কৃত আবাদী জমিতে অতিরিক্ত ফসল উৎপাদিত হয়;
৩) অনুস্রাবণ, চোঁয়ানো, আগাছা এবং বাষ্পীয়ভবন হয় না;
৪) পানির অপচয় মাত্র ০-১%, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগামিতা রোধ হয়;
৫) বন্যা/বৃষ্টি/প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতি হয় না, ফলে মেরামতের প্রয়োজন পড়ে না;
৬) সেচ প্রদানে সময় কম ও কম পানি উত্তোলিত হয় এবং শ্রম ও জ্বালানি সাশ্রয় হয়;
৭) কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল পরিবহণ এবং ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়;
৮) উঁচু নিচু বা খাল-বিল অতিক্রম করে সেচ প্রদান করা যায়;
৯) প্রাথমিক খরচ বেশি, তবে সামগ্রিক খরচ কমে যায়;
১০) সেচযন্ত্রের ১১২% কমান্ড এরিয়া বৃদ্ধিসহ, সেচ দক্ষতা ও সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পায়;
১১) সর্বোপরি পরিবেশসম্মত আধুনিক ও টেকসই সেচ প্রযুক্তি।
বারিড পাইপের চ্যালেঞ্জসমূহ:
১) সেচের পানি পরিবহণ ও যথাযথ ব্যবহারে অসচেতনতা;
২) বারিড পাইপের সুবিধাদি বিষয়ে জ্ঞানের অভাব;
৩) কৃষক সমবায় সমিতির কার্যকারিতা না থাকা;
৪) আবাদি জমি খন্ড খন্ড অর্থাৎ মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ ০.০৪৯ হেক্টর হওয়া;
৫) পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা না মেনে অপরিকল্পিতভাবে সেচযন্ত্র স্থাপন;
৬) প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারণার অভাব;
৭) কৃষিভিত্তিক শিল্প উদ্যোক্তা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ জোনের অভাব;
৮) সর্বোপরি কৃষকের মূলধন ও সরকারি সহায়তার অভাব।
করণীয়সমূহ:
১) পৃথিবীতে পানি সম্পদ সীমিত। আর এ সীমিত পানি সম্পদকে প্রকৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালি কাজ চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে দেশে কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার প্রায় ৭৪%। তাই এ ভূর্গভস্থ পানিকে সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পানি ব্যবহারের সমন্বিত (Conjunctive) উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়াও কৃষকদের “On Farm Water Management” বারিড পাইপ, ফিতা পাইপ, এডব্লিউডির ব্যবহারের সুবিধাদি ও সম্প্রসারণ, কম জীবনকালের ধানের জাত নির্বাচন বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণ এবং মোটিভেশনের মাধ্যমে সকলকে সচেতন করতে হবে।
২) বারিড পাইপে সেচের পানি পরিবহণ কৃষিতে সম্পূর্ণ নতুন, আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি। বারিড পাইপ মাটির নিচে স্থাপন করা হয় বিধায় জমি ও পানির পরিবহণ অপচয় হয় না। ফলে সেচযন্ত্র কম পরিচালনা করায় জ্বালানি খরচ কম, পানি উত্তোলন কম হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির নিম্নগামিতা হ্রাস পায়। বারিড পাইপ নির্মাণের ফলে কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল পরিবহণ সহজ এবং কৃষক পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। বারিড পাইপের পরিবহণ দক্ষতা প্রায় ৯৯%। উপরন্তু উঁচু-নিচু খাল-নালা, বিল অতিক্রম করে সেচ দেয়া যায়। অপরদিকে, ১১২% সেচের কমান্ড এরিয়া বৃদ্ধিসহ, সেচ দক্ষতা ও সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পায়। তাই এ প্রযুক্তির সুবিধাদি বিষয়ে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩) দেশে সেচ কার্যক্রম শুরুর প্রাক্কালে কৃষক সমবায় সমিতি গঠন করে কৃষকদের মাঝে সেচযন্ত্র সরবরাহ করা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেচ কার্যক্রমে পরিবর্তন আসায় কৃষক সমবায় সমিতির কার্যক্রম কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। তাই সেচ কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত বর্তমান পানি ব্যবহারকারী দল (Water User Group-WUG) কে রাষ্ট্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে।
৪) দেশে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ০.০৪৯ হেক্টর। এ খ- খ- জমিতে বারিড পাইপে সেচ প্রদান অনেক সময় সমস্যার সৃষ্টি হয়, তাই সমবায় ভিত্তিতে বারিড পাইপের মাধ্যমে সহজে সেচ প্রদান করা সম্ভব।
৫) কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী সেচযন্ত্র স্থাপন করা হলে সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া, সেচ দক্ষতা এবং সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পাবে। ফলে পানির নিম্নগামিতা হ্রাস করা সম্ভব হবে।
৬) প্রচারেই প্রসার। প্রচারই যে কোন বিষয় বিস্তারে/প্রসারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বারিড পাইপে সেচের সুবিধাদির ডকুমেন্টেশন তৈরি করে কৃষকদের সহজে বোধগম্যের জন্য প্রচার-প্রচারণা করতে হবে।
৭) দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষিমুখী করতে হবে। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
৮) বারিড পাইপ মাঠ পর্যায়ে বিস্তার/সম্প্রসারেণের লক্ষ্যে সেচপাম্প মালিক/ম্যানেজারকে সহজশর্তে স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থাকরণ অথবা সরকারি পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।
বিএডিসি’র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সারাদেশে গভীর নলকূপ ও শক্তিচালিত পাম্প পরিচালনা করে আসছে। অপরদিকে কিছু সংখ্যক গভীর নলকূপ, বিপুল সংখ্যক শক্তিচালিত পাম্প এবং অগভীর নলকূপ বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বিএডিসি সরকারি ও বেসরকারিভাবে পরিচালিত সেচযন্ত্রসমূহে লাইসেন্স ও অন্যান্য কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে। সেচের পানি পরিবহণের জন্য সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়ায় প্রধান, শাখা ও উপ-শাখা সেচনালার প্রয়োজন হয়। প্রধান সেচনালাটি কমান্ড এরিয়ার নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে প্রবাহিত হয়। শাখা ও উপ-শাখা সেচনালাসমুহ কমান্ড এরিয়ার সর্বত্র প্রবাহিত হয়। কৃষক পর্যায়ে ব্যবহৃত কমান্ড এরিয়ায় দেখা যায়, কমান্ড এরিয়ার ধরণ ও অবস্থাভেদে সেচনালার দৈর্ঘ্য নির্ভর করে। প্রতি হেক্টর জমিতে প্রধান, শাখা ও উপ-শাখাসহ ১০০-১১০ মিটার সেচনালা প্রয়োজন হয়। ২০১৮-১৯ সেচ মৌসুমে সেচযন্ত্র জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিএডিসি’র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও নিয়ন্ত্রণাধীন পরিচালিত ২০,০৮১টি সেচযন্ত্রের আওতায় মোট সেচকৃত জমি ৫,৩৬,৮২৪ হেক্টর, যার সেচনালায় তৈরিতে ৪% জমি অপচয় ধরে মোট অপচয়কৃত জমি ২১,৪৪০ হেক্টর এবং উক্ত জমিতে সেচ প্রদানে প্রধান, শাখা ও উপ-শাখা সেচনালার প্রয়োজন প্রায় ৫৬,৩৭০ কি. মি.। বিএডিসি সারাদেশে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে জুন/২০২০ পর্যন্ত মোট ৮৩৪৫টি সেচযন্ত্রের সেচ ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ৯,৭৮৩ কি.মি. প্রধান কাঁচা সেচনালা বারিড পাইপে রূপান্তর ও ৩৪১ কি.মি. ফিতা পাইপ সরবরাহ করেছে,যা মোটের প্রায় ১৭%। এ কার্যক্রমে প্রতিটি সেচযন্ত্রে গড়ে ১০০০-১,২০০ মিটার বারিড পাইপ এবং ১০০-২০০ মিটার ফিতা পাইপ সরবরাহ করা হয়েছে। কাঁচা সেচনালাকে বারিড ও ফিতা পাইপে রূপান্তরের ফলে প্রতিটি সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া, সেচ দক্ষতা, সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে, জমির অপচয়, জ্বালানি ও শ্রম সাশ্রয় এবং ভূগর্ভস্থ পানি নিম্নগামিতা হ্রাস পেয়েছে।
প্রতি মৌসুমে জমি সাশ্রয়ের পরিমাণ: বিএডিসি’র গভীর নলকূপ ও শক্তিচালিত সেচ পাম্পের প্রধান সেচ নালায় ৯,৭৮৩ কি.মি. বারিড পাইপ নির্মাণে (কাঁচা সেচনালার প্রস্থতা=৪.৫ ফুট ধরে) মোট সাশ্রয়কৃত জমির পরিমাণ দাঁড়ায় =১,৩৪২ হেক্টর (প্রায়)।
ক) সাশ্রয়কৃত জমির উৎপাদিত ফসলের মূল্য: উৎপাদন ৫ টন/হেক্টর, মূল্য ২২/কেজি হিসেবে ধরে=১৪.৭৬ কোটি টাকা (প্রায়)।
খ) প্রতি মৌসুমে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পরিমাণ: বিএডিসি’র ৮,৩৪৫ টি সেচযন্ত্রের বারিড পাইপ নির্মাণে (প্রতি ইউনিটে বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০ কিলোওয়াট, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য= ৪.০০ টাকা, মৌসুমে চালু ঘণ্টা ১,০০০ ও সেচের পানির অপচয় ৪৭% ধরে) মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ ৩১.৩৭ কোটি টাকা (প্রায়)।
ঘ) প্রতি মৌসুমে পাম্প অপারেটর ভাতা সাশ্রয়: ৮,৩৪৫টি সেচযন্ত্রের পাম্প অপারেটর ভাতা বাবদ (প্রতি মাসে ১২,০০০/-, সেচ মৌসুম ৩ মাস, পানির ৪৭% অপচয় ধরে) মোট সাশ্রয়ের পরিমাণ ১৪.১২ কোটি টাকা (প্রায়)।
সর্বমোট সাশ্রয়কৃত অর্থের পরিমাণ: অপচয়কৃত জমিতে ফসলের মূল্য সাশ্রয় + বিদ্যুৎ হতে সাশ্রয় + পাম্প অপারেটর ভাতা হতে সাশ্রয়= ১৪.৭৬+৩১.৩৭+১৪.১২=৬০.২৫ কোটি টাকা।
ভূগর্ভস্থ পানির সাশ্রয়: ৮,৩৪৫টি সেচ পাম্প বারিড পাইপ নির্মাণে (সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া ২৫ হেক্টর, কৃষি প্রকৌশল প্রযুক্তিভিত্তিক পানির চাহিদা ৪৮ একর-ইঞ্চি অর্থাৎ ১.২২ একর-মিটার ধরে) মোট পানির চাহিদা ২.৫৪ বিলিয়ন কিউবিক মিটার (বিসিএম) প্রায়। কিন্তু বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে কাঁচা সেচনালায় ব্যবহৃত হচ্ছে ২ গুণ অর্থাৎ ৫.০৮ বিসিএম। কাঁচা সেচনালায় অপচয় সাশ্রয়= ৫.০৮ দ্ধ ৪৭% = ২.৩৯ বিসিএম।
বিএডিসি মোট ৯,৭৮৩ কি.মি. বারিড পাইপ ও ৩৪১ কি.মি. ফিতা পাইপ নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ২,২১,৭০০ হেক্টর জমিতে প্রতি সেচ মৌসুমে সেচ সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। এ বারিড ও ফিতা পাইপে রূপান্তরের ফলে প্রতিটি সেচযন্ত্রের কমান্ড এরিয়া, সেচ দক্ষতা, সেচের নিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে সেচনালার জমির অপচয়, জ্বালানি ও শ্রম সাশ্রয় এবং ভূগর্ভস্থ পানি নিম্নগামিতা হ্রাস পেয়েছে, ফলে সেচ খরচ কমে আসছে। যাতে মোট সাশ্রয়কৃত অর্থের পরিমান ৬০.২৫ কোটি টাকা ও সেচের পানির অপচয় রোধের পরিমাণ ২.৩৯ বিসিএম। এ সকল কার্যক্রমের পাশাপাশি উঁচু-নিচু-বন্ধুর জমিতে সেচ প্রদান, কৃষিজ যন্ত্রপাতি ও উৎপাদিত ফসল পরিবহণ সহজ এবং ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছে।
কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব স্থবির হয়ে পরেছে এবং তা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলশ্রুতিতে সারাবিশ্বে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। এ বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃষিক্ষেত্রে করণীয় নির্দেশনা প্রতিপালনে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবাদি জমি ফেলে না রেখে প্রতি ইঞ্চি জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর কলা-কৌশল অবলম্বন করে উন্নতজাতের ফসল উৎপাদন এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে।
লেখক: প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), ঢাকা।