ড. মো. শাফায়েত হোসেন
বিএডিসি’র বীজ ও উদ্যান উইং-এর আওতাধীন কাশিমপুর উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রটি দেশের উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের উন্নয়ন এবং প্রদর্শনীর জন্য একটি অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার কাশিমপুরে ১৯৬৭ সালে ৬৩.৬৭ একর জমিতে খামারটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। গাজীপুর-চন্দ্রা সড়কের কোনাবাড়ী থেকে ৩.৫ কি. মি. দক্ষিণে এবং ঢাকা-আশুলিয়া সড়কের নরসিংহপুর থেকে ৭.০ কি. মি. উত্তরে কাশিমপুর উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রটি অবস্থিত। দেশি-বিদেশি নানান জাতের ফল-ফুল, বনজ, ঔষধি, মসলা ও সবজি চারা/কলম উৎপাদনসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ প্রদর্শনী এবং সরবরাহের জন্য কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রটি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন ফসলের বীজ, চারা ও কলম উৎপাদন ছাড়াও নতুন নতুন প্রযুক্তির সমাহার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা খামারটিকে একটি ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেছে। যে কেউ খামারটি ঘুরে দেখলে অভিভূত না হয়ে পারবেন না।
উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রের বিভিন্ন কার্যক্রম: * চাষীদের নিকট থিমেটিক ধারণা (Themetive idea) প্রদান * নিরাপদ সবজি ও ফল উৎপাদন কৌশল প্রদর্শন * প্রদর্শনী খামার ও প্রকল্প এলাকায় GAP অনুসরণপূর্বক নিরাপদ সবজি ও ফল উৎপাদন এবং ঢাকাস্থ বিএডিসি’র স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র ও ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে বিপণন * নতুন উদ্ভাবিত উদ্যান ফসলের উৎপাদন কৌশল প্রদর্শন এবং প্রশিক্ষণ প্রদান * উদ্ভাবিত আধুনিক জাতের মাতৃবাগান স্থাপন, চারা কলম উৎপাদন ও বিক্রয় * বিভিন্ন প্রচলিত জনপ্রিয় ফলের জাতের মাতৃগাছ সংরক্ষণ ও চারা কলম বিতরণ * দেশে প্রায়োগিক গবেষণা ও ট্রায়ালের মাধ্যমে বিদেশি ফলের প্রবর্তন * কৃষি উপকরণ যেমন: বীজ, চারা, কলম বিপণন * অপ্রধান/অপ্রচলিত ফলের জাত (Germplasum) সংরক্ষণ * বাড়ির ছাদে বাগান মডেল প্রদর্শন * হাইড্রোপনিক কালচার মডেল প্রদর্শন * ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন, প্রদর্শন এবং বিপণন * প্রোটিনসমৃদ্ধ স্পিরুলিনা চাষ এর মাধ্যমে পুষ্টি ঘাটতি দূরীকরণ প্রচেষ্টা গ্রহণ * একোয়াপনিক কালচার মডেল প্রদর্শন।
গবেষণাধর্মী কার্যক্রম: খামারটিতে বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কাশিমপুরী পেঁপে অত্যন্ত সুমিষ্ট এবং স্বল্প সময়ে ছোট অবস্থায় ফল ধারণ করে। বিগত ৩০ বছর ধরে ভ্যারাইটি স্ক্রীনিং এর মাধ্যমে এ জাতের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ ও বিস্তার করা হচ্ছে * লিক, মিনারি, নীরা, বানচিং অনিয়ন, রেড ক্যাবেজ, ক্যাপসিকাম, সেলারী, পার্সলী, স্ট্রবেরি, ড্রাগন ফ্রুট, অ্যাভোকেডো, লংগান ইত্যাদি বৈদেশিক সবজি, মসলা ও ফলের জাতসমূহ অভিযোজনপূর্বক দেশে চাষ প্রচলনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে * ZBNF (Zero Budget Natural Farming) পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ছাড়া প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ পদ্ধতি পরিবীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও প্রচলনকরণ * বছরব্যাপী ফল উৎপাদন এর জন্য ফোর্স ফ্রুটিং এর ব্যবস্থাকরণ * হাইড্রোপনিক ও এ্যাকোয়াপনিক কালচার এর মাধ্যমে মাটি ছাড়া শহরভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অল্প খরচে কৃষক পর্যায়ে বাস্তবায়ন * ইনব্রিড এবং হাইব্রিড বীজ, ফুল এবং ফলের গবেষণা কার্যক্রম জোরদারকরণ।
খামারে প্রাপ্ত ফল, ফুল, ঔষধি ও বনজ উদ্ভিদ এর জাতসমূহ: খামারটিতে রয়েছে আমের ৬৫টির অধিক জাত, এর অর্ধেকই বিদেশি। থাইল্যান্ডের রয়েছে প্রায় ১৫টি জাত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিং অব চ্যাকাপাত, নামডোকসাই (৪টি জাত), চিয়াংমাই, ফোরকেজি। আমেরিকান জাতের মধ্যে রয়েছে পালমার, কেন্ট, কেইট। দেশি জাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ল্যাংড়া, ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, বৈশাখি, হাড়িভাঙ্গা প্রভৃতি। এখানে রয়েছে থাই ডোয়ার্ফ সাদা কাঁঠাল। দেশি কাঁঠালের মধ্যে আকর্ষণীয় জাত হচ্ছে হাজারি কাঁঠাল, এই কাঁঠালের থোকায় ১২-১৩টি কাঁঠাল ধরে। নাবি জাতের মধ্যে বৈশাখি কাঁঠাল উল্লেখযোগ্য। এ খামারে ভিয়েতনামের খাটো জাতের লাল কাঁঠাল ও সাদা কাঁঠাল পাওয়া যায়। এ জাতের কাঁঠাল ছাদ বাগানেও লাগানো যায়। চায়না-৩ জাতের লিচু, বাউকুল ছাড়াও রয়েছে কাশ্মিরি আপেল ও নারিকেলি কুলের জাত। মাল্টার ২টি, কমলার ৪টি, বাতাবি লেবুর ৪টি, পেয়ারার ৭টি, লেবুর ৫টি জাত। আরো রয়েছে নানান জাতের ফলের চারা ও কলম যেমন, লটকন (দেশি উন্নত/থাই), ড্রাগন ফ্রুট (থাই), কদবেল (বনলতা), কামরাঙ্গা (হুইলার-মিষ্টি/দেশি), সফেদা (দেশি উন্নত/থাই), আমলকি, জামরুল (সাদা/লাল), মাল্টা (বারি মাল্টা-১/স্থানীয় উন্নত/চায়না), কমলা (নাগপুরি/ছাতকি/চায়না), বাতাবি লেবু (বারি/লাল/সবুজ/থাই সবুজ), মিষ্টি করমচা, অরবরই (স্থানীয় উন্নত/মিষ্টি), বেল (সিডলেস/দেশি উন্নত/বিএডিসি-১), মিষ্টি তেঁতুল, জলপাই, পেয়ারা (মুকুন্দপুরি/কাজি/বালি/থাই/ মাধুরি/বাউ/আপেল), কাগজি লেবু (সিডলেস/বারমাসি/এলাচি/থাই কাগজি), আঙ্গুর (ব্ল্যাক/পার্ল), আতাফল, থাই শরীফা, করমচা (মিষ্টি/থাই/দেশি), বারমাসি আমড়া, ব্রাজিলিয়ান এ্যাভোকেডো, মিশরীয় ডুমুর (মিষ্টি), নাশপাতি (বারি নাশপাতি-১), ব্রাজিলিয়ান জাবুটিকাবা, থাই রাম্বুটান, বিএডিসি জাম-১ (বড়/বারমাসি), টক আতা, আমলকি। নারিকেল, তাল, আশফল, বিলাতী গাব, ডেওয়া, আমড়া, মিষ্টি তেঁতুল, কলা, আনারস, আনার/ডালিম, গোলাপজাম, চালতা, চাপালিশ, জাম, সুপারি, স্ট্রবেরি, পেঁপে প্রভৃতি। এ খামারে ৬০ এর অধিক রয়েছে ফুলের জাত। আরও রয়েছে ২০টির অধিক ঔষধি ও বনজ উদ্ভিদ। এখানে ১৪-১৫ প্রকার মশলার চারা পাওয়া যায়। এখান থেকে ১৫-২০টি জাতের সবজি চারা ও বীজ বিক্রয় করা হয়।
প্রকল্প এলাকাসমূহ: খামার প্রকল্পের আওতায় গাজীপুর সদর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ, সাভার এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার চুক্তিবদ্ধ চাষীকে সবজি ও ফল চাষের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। বর্তমানে কৃষকরা বিএডিসি’র সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণ গ্রহণের ফলে নিজেরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সক্ষমতা অর্জন করেছে। একই সাথে কেন্দ্রটি নিয়মিতভাবে নতুন প্রযুক্তি ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে কৃষকদের সহায়তা করে যাচ্ছে।
খামারটির লোকবল এবং আয়-ব্যয়: অনুমোদিত ২২টি পদের বিপরীতে ১৬টি পদে লোকবল কর্মরত রয়েছে খামারটিতে অর্থাৎ ৬টি পদ এখনও শূন্য রয়েছে। শূন্য জনবলের কাজ মাস্টাররোল শ্রমিক দ্বারা সম্পাদন করায় সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনবল ঘাটতির মধ্য দিয়েও খামারটি ক্রমান্বয়ে লাভজনক অবস্থানে চলে এসেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৪৮.৫৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৬৫ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৬৪.৯৮ লাখ টাকা। সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছর ৭০ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৭১ লাখ টাকা। দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না হলেও বিএডিসি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে তা স্বল্প জনবল এবং স্বল্প বাজেটের মধ্যে দিয়েও অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

খামারে স্থাপিত স্থায়ী গোলাপবাগানেরএকাংশ।
খামারে নতুন সংযোজন: খামারটির নান্দনিকতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দর্শনার্থীর সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় বছরব্যাপী দর্শনার্থী লেগেই থাকে। ফলে খামারটির গুরুত্ব ও পরিচিতি যেমন বাড়ছে তেমনি খামার থেকে চারা-কলম, বীজ, ফুল ও ফল বিক্রয়ের মাধ্যমে আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে দেশের প্রথম অঙ্কুরোদগম ভাস্কর্য (Germination Sculpture) খামারের গেস্ট হাউজের প্রবেশ মুখে স্থাপন করা হয়েছে। দর্শনার্থী কর্তৃক খামারটি স্বল্প সময়ে ঘুরে দেখার জন্য সম্প্রতি ২টি স্কুটার ভ্যান ক্রয় করা হয়েছে।
শেষ কথা: খামারটির সাথে ঢাকা ও নিকটবর্তী গাজীপুর শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা পণ্য পরিবহন সহজতর করার মাধ্যমে খামার কর্তৃক প্রযু্িক্ত সম্প্রসারণ ও আয়বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ এবং শূন্যপদের লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে খামারটি বিশ্বমানের খামারে পরিণত করা সম্ভব।
লেখক: উপব্যবস্থাপক, বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ (বীপ্রস) বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), ঢাকা।

