মোশারফ হোসেন
‘সেবা’ ও ‘ভোগান্তি’ শব্দ দুটি পরস্পর বিপরীতার্থক। গণপরিবহন খাত একটি সেবাধর্মী খাত। তবে এ খাতে ‘সেবা’ ও ‘ভোগান্তি’ শব্দ দুটি সমার্থক না হলেও অন্তত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলা চলে।
ভোগান্তি যেন পরিবহন সেবার ‘বাই-প্রডাক্ট’। এখানে সেবার সঙ্গে নানা যাত্রী ভোগান্তি যেন অবধারিত। অন্যদিকে এ খাতের সর্বাধিক সেবাগ্রহীতা নারী না হলেও নারী-পুরুষ-শিশুসহ সব শ্রেণির যাত্রীর মধ্যে এ খাতে নারীরাই সবচেয়ে বশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
গণপরিবহনে একের পর এক যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে যাচ্ছে; কিন্তু বিচারের আওতায় আসছে না কেউ। আর যে দু-একজন শাস্তি পাচ্ছে, তাদের সংখ্যাও খুবই যৎসামান্য। তাই এই নিপীড়ন যেন থামছেই না।
কিছুসংখ্যক নারীর সাহসী পদক্ষেপের জন্য কিছু ঘটনার খবর হয়তো আমরা পাচ্ছি; কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে অনেক নিপীড়িত নারীই প্রকাশ করে না এসব হয়রানির ঘটনা। তাই দৃষ্টির অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে অগণিত দুষ্কৃতকারীর অপকর্ম।
এ ছাড়া গণপরিবহনে নিত্যদিনের যাতায়াতকালে নারী যাত্রীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা এবং সম্মান পায় না প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই। তবে এসব হয়রানি ও ভোগান্তির জন্য সব সময়ই যে কেবল পরিবহন কর্মী, চালক এবং পরিবহন মালিকরাই দায়ী- এমনটা মানতে আমি রাজি নই।
আমাদের ঘুমন্ত সমাজব্যবস্থা, আইনের শিথিলতা, অসাম্য রাষ্ট্রনীতি এবং সর্বোপরি পুরুষ যাত্রীদের সহনশীল ও ত্যাগী আচরণের অভাবও নারীযাত্রীর ভোগান্তি ও হয়রানির অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি।
২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গণপরিবহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিধান করা হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয়, বড় বাসে ৯টি, মিনিবাসে ছয়টি এবং বিআরটিসি বাসে ১৪টি আসন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।
‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭’-এর খসড়ায়ও বলা হয়েছিল, ‘গণপরিবহনে নারী, শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে তাদের বসতে না দিয়ে অন্য কেউ ওই আসনে বসলে তিনি এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
কিন্তু বাসে উঠে দেখা যায় ওইসব সংরক্ষিত আসনও কিছু বীরপুরুষ সদর্পে দখল নিয়ে বসে আছেন। তাদের পাশে একজন নারী যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তারা আসন ছেড়ে ওঠেন না। তাই নারীদের গাদাগাদি করে বসতে হয় ড্রাইভারের বাম পাশে ইঞ্জিনের তাপে তপ্ত বনেটের ওপর।
বাকিদের দাঁড়িয়েই যেতে হয়। দু-একজন নারী হয়তো প্রতিবাদ করেন কিংবা অনুরোধ করে আসন ছাড়তে বলেন। কিন্তু তখনও কোনো কোনো পুরুষকে বলতে শোনা যায়, ‘সবখানেই সমান অধিকার দাবি করেন, তাহলে বাসের মধ্যে এসে কোটা সুবিধা চান কেন?’
আর এ কারণে বাসে উঠতে চাওয়া মহিলা যাত্রীদের লক্ষ্য করে হেল্পারদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘মহিলা সিট খালি নাই’। তা ছাড়া ব্যস্ত সময়ে, বিশেষ করে সকালে স্কুল-কলেজ, অফিস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় এবং বিকালে ও সন্ধ্যায় কর্মজীবী মানুষের ঘরে ফেরার সময় নারীদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
হুড়োহুড়ি করে দৌড়ে চলন্ত বাসে ওঠা, ভিড়ের মাঝে পুরুষ যাত্রীদের ঠেলে বাসে ওঠা, ঠাসাঠাসি করে পুরুষ যাত্রীদের গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়ানো, বাসের স্থিতি ও গতি জড়তার প্রভাবে পুরুষ যাত্রীর গায়ের ওপর আছড়ে পড়া, আবার একইভাবে পুরুষ যাত্রীদের ঠেলে ঠেলে বাস থেকে নামতে গিয়ে নারীদের যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়।
বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা হেল্পার তো মহিলা যাত্রীদের বাসে উঠানো এবং নামানোর সময় নিজের অজান্তেই তাদের গায়ে হাত দেন।
আমি জানি, এই বীভৎস অভিজ্ঞতাগুলো কল্পনা করতেই অনেক নারীর গা কাঁটা দিয়ে উঠবে। তাই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটাই সত্যি যে, নারীর জন্য গণপরিবহনের প্রত্যেকটি ভ্রমণ যেন এক একটা যুদ্ধযাত্রা!
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, রাজধানীতে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ২৮ হাজার ২২২, আর রাজধানীর বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন সাত হাজার বাস চলে। এর মধ্যে সরকারি পরিবহন বিআরটিসির বাস ৪০০টি।
কিন্তু নারীদের জন্য বাস আছে মাত্র ১৫টি! সেটাও সরকারি পরিবহন সেবা বিআরটিসির। তাই প্রতি বাস বে (যাত্রী ওঠা-নামার জায়গা) বা বাস স্টপ থেকে শহরের প্রধান প্রধান সড়কে চলা প্রতি পাঁচটি বাসে অন্তত একটি বাস নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার পাশাপাশি অন্য সব বাসে নারীদের জন্য কমপক্ষে ২০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রাখার বিধান করা যেতে পারে।
এই ২০ শতাংশের অন্তত অর্ধেক আসন নারীদের জন্য সব সময় সংরক্ষিত রাখতে হবে, যেখানে পুরুষদের বসা একেবারেই নিষিদ্ধ থাকবে। সংরক্ষিত বাকি অর্ধেক আসনের কোনো আসন যদি খালি থাকে তাহলেই শুধু পুরুষ যাত্রী ওইসব আসনে বসতে পারবে, তবে কোনো নারী যাত্রী বাসে ওঠামাত্রই নারীকে সেখানে বসতে দিতে হবে।
সরকারি তদারকির অংশ হিসেবে ভেজাল খাদ্যবিরোধী মোবাইল কোর্টের মতো বাসের ভেতরও নারী যাত্রীদের সেবা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিতকরণে নারী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে দৈবচয়ন ভিত্তিতে বাস নির্বাচন করে নিয়মিত মোবাইল কোর্টের অভিযান চালাতে হবে।
আমরা পুরুষদেরও একটু ত্যাগী ও সহনশীল হতে হবে। কয়েক মাস আগে আমার এক তরুণ জুনিয়র ব্যাংকার সহকর্মীর সঙ্গে কথায় কথায় পিতৃত্বের অনুভূতি, দায়িত্ব ও ত্যাগ নিয়ে কথা হচ্ছিল। সে দুই কন্যাসন্তানের জনক।
এক পর্যায়ে সে বলল, ‘কন্যাসন্তানের বাবা হওয়ার পর থেকে সে ট্রেনে বা বাসে কোনো নারী যাত্রীকে দেখলেই তার নিজের দুই মেয়ের চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে এবং দাঁড়িয়ে থাকা নারী যাত্রীকে নিজের আসন স্যাক্রিফাইস করে বসতে দেন।’
আমার নিজেরও একটি অভিজ্ঞতা বলি। আমি এক কন্যাসন্তানের বাবা। আমার স্ত্রী গর্ভবতী থাকাবস্থায় তার নিয়মিত চেকআপ শেষে বাসায় ফিরতে সিটিং সার্ভিস বাসে উঠতেই দেখি, কোনো সিটই খালি নেই। উপরন্তু মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত সিটগুলোয়ও পুরুষরা বসে আছে।
দেখলাম, বনেটেও বসার মতো ব্যবস্থা নেই। হেল্পারকে উদ্দেশ করে বললাম, ‘আমার স্ত্রী অসুস্থ, তাকে বসতে দিতে হবে।’ আমি খুব ভালো করে লক্ষ করলাম, কোনো পুরুষ যাত্রীই আমার আকুতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করছেন না, যে যার মতো করে কিছুই শোনেনি ভান করে বসে আছেন।
স্ত্রীর অবস্থা চিন্তা করে খুব অসহায় বোধ করছিলাম এবং মহিলা সিটে বসা পুরুষগুলোর জন্য খুব লজ্জাবোধ করছিলাম। পরক্ষণেই চালক তার হাতের কাছের একটা কাঠের তক্তা দিয়ে সেটা বনেটের ওপর বিছিয়ে তার ওপর বসতে বলল। চালকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল।
বাস থেকে নামার সময় চালককে খুব জোরে একটি ধন্যবাদ দিতে আমার কোনো ভুল বা কার্পণ্য হয়নি। বাসায় ফিরতে ফিরতে আশায় বুক বাঁধলাম- সব পুরুষ যদি আমার সহকর্মীর মতো, সব চালক ও পরিবহন কর্মীরা যদি আজকের এ চালকের মতো হয় তাহলেই তো বদলে যাবে দেশ; আমাদের নারীরা পাবে যোগ্য সম্মান- পরিবারে, পথে, পরিবহনে, কর্মস্থলে- সবখানে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক গত বছর মার্চের এক জরিপে জানিয়েছে, গণপরিবহনে যাতায়াতকারী নারীদের ৯৪ শতাংশই যৌন হয়রানির শিকার। কিন্তু এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ দরকার।
আমাদের ভুলে গেলে হবে না, একজন নারী হচ্ছেন একজন মা, একজন বোন, একজন কন্যা কিংবা একজন স্ত্রী। তাই তাদের নিরাপত্তা দেয়া আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
আপনি আমার মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাকে সম্মান দিলেন, আমি আপনার মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাকে সম্মান দিলাম- একটি সুন্দর নারীবান্ধব পরিবহন খাত ও সমাজ গঠনে এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই যথেষ্ট।
লেখক: ব্যাংকার

