বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনকে ঘিরে সংগঠনটির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক নাম। সম্ভাব্য সভাপতি প্রার্থীদের তালিকায় যাদের নাম ঘুরছে, তাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা এই ছাত্রনেতাকে তৃণমূলের একটি বড় অংশ ত্যাগী ও কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব হিসেবে দেখছে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত এবং সংগঠনের কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় থাকা নেতাদের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কে নেতৃত্বে আসবেন, তা নির্ভর করবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে দলের কার্যালয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পর থেকেই ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে সংগঠনের ভেতরে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি পদপ্রার্থী ছিলেন। যদিও এমফিলে ভর্তি হওয়ার পর মোস্তাফিজুর রহমানের হলের সংযুক্তি পরিবর্তন হয়ে সূর্যসেন হল হয়েছে। বর্তমানে তিনি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন। স্বৈরাচারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন, কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে। সমর্থকদের ভাষ্য, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি সংগঠন ছেড়ে সরে যাননি বরং রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের দাবি, কঠিন সময়ে দলীয় পতাকা আঁকড়ে ধরে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেই তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হন মোস্তাফিজুর রহমান। নির্বাচনকে ঘিরে নানা বিতর্ক থাকলেও তার সমর্থকরা মনে করেন, প্রতিযোগিতামূলক ও অবাধ পরিবেশ থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। আওয়ামী দোসরদের মিথ্যা মামলায় ২০১৯ সালে মোস্তাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাকে মিথ্যা মামলায় কারাবাসসহ হয়রানি ও চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দাবি করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনসহ স্বৈরাচারবিরোধী সকল কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সমর্থকদের মতে, আন্দোলনের সময় তিনি কর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন এবং বিপদের মুহূর্তে তাদের পাশে থেকেছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় ছাত্রদলের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতিকে সংগঠনের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন একই নেতৃত্বে সংগঠন পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আঞ্চলিকতার প্রভাব ছাত্রদলের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করেছে। ফলে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করতে নতুন ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যিনি রাজপথে পরীক্ষিত, কর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সংগঠনের আদর্শে অটল। তাদের মতে, কর্মীদের আস্থা ধরে রাখা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং আন্দোলন-সংগ্রামকে সংগঠিতভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতা থাকতে হবে নতুন নেতৃত্বের। এই প্রেক্ষাপটে মোস্তাফিজুর রহমানের নাম আলোচনায় আসায় সংগঠনের ভেতরে নতুন করে আলোচনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত এবং তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ থাকা নেতাদের হাতেই সংগঠনের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব তুলে দেওয়া উচিত।
তবে শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে কে আসবেন, তা নির্ধারিত হবে দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই। নতুন কমিটি ঘোষণার আগ পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের একাধিক নেতা। নেতাকর্মীদের আশা, নতুন কমিটির মাধ্যমে ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

