ঢাকাWednesday , 23 October 2024
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ হোক পূর্ণ স্বাধীন

তালুকদার রুমী
October 23, 2024 11:02 pm
Link Copied!

ছাত্র-জনতার এক অবিস্মরণীয় অভ্যুত্থানে মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে তার প্রভু দেশ ভারতে পালিয়ে গেলেও দেশকে বহুমুখী বিপর্যয়ের মধ্যে রেখে গেছে। বিপর্যয়গুলো কেবল রাজনীতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাতেই সীমিত নয়, বাংলাদেশ আইনের শাসনেরও চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানাভাবে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ভুক্ত করা হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এ প্রভাব বলয়ের বাইরে ছিল না বিচার বিভাগের মতো সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় স্তম্ভও। মানুষ যেখানে ন্যায়বিচার পাবে, যেখানে সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, রাষ্ট্রের সেই বিভাগকেও করায়ত্ব করে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল শেখ হাসিনা।তবে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায় সর্বোচ্চ আদালত বহাল রেখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করেছেন। এর মাধ্যমে এখন থেকে বিচার বিভাগের স্বনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পাবে। দুর্বৃত্তায়ন ও রাজনীতির প্রভাব থেকে বেরিয়ে বিচার বিভাগ পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে।
বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার যে রায় গত ২০ অক্টোবর দিয়েছেন দেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ, তা এক কথায় যুগান্তকারী। কেননা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রায় বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণমুক্ত করে স্বাধীন এবং নিরপেক্ষভাবে বিচারকাজ নিশ্চিত করতে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখবে। এ রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে দীর্ঘ জটিলতার অবসান হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত ও অপসারণ সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ক্ষমতা ও পরিধি বহাল রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ই বহাল রেখেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাত বছর আগে এই রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।পরে এই রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) করতে আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ গত ২০ অক্টোবর সেই রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করে এই রায় দিলেন। পাশাপাশি বিচারপতিদের অপসারণ ও পদত্যাগের বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর করতে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ২ থেকে ৮ উপ-অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়। অর্থাৎ রায়টির মধ্য দিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের আদেশ বহাল রইল এবং বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ফিরে এলো। এখন থেকে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অসমর্থতা ও পেশাগত অসদাচরণের কোনো অভিযোগ উঠলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এ ছাড়া এই রায়ে বিচারপতিদের জন্য করা ৩৯ দফার আচরণবিধি এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সব পর্যবেক্ষণ বহাল রয়েছে।
আমরা জানি, ১৯৭২-এর সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা ছিল জাতীয় সংসদের কাছে। ১৯৭৫ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে অর্পণ করা হয়। পরে ১৯৭৭ সালেজিয়াউর রহমান সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনী এনে সেই ক্ষমতা আবার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ফিরিয়ে দেন, যার প্রধান ছিলেন প্রধান বিচারপতি। পরবর্তীকালে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংসদে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব পাস করে, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত।সংবিধানের এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছর ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এ রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এরপর হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। একই বছর ৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা) নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিতে আপিল খারিজ করে রায় দেন। রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২৪ ডিসেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন (রিভিউ) করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর বিভিন্ন সময় এই আবেদন আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় এলেও রাষ্ট্রপক্ষ ও রিটকারীপক্ষের আবেদনে শুনানি পিছিয়ে যায়। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। গত ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। সরকার গঠনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের ৫ বিচারপতি। পরে ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এ অবস্থায় ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিভিউ আবেদনের শুনানি করতে আপিল বিভাগে আবেদন করে রিটকারীপক্ষ। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করায় সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ছয়টি ধারা পুনর্বহাল হয়। কাউন্সিলের দায়িত্ব সম্পর্কে ৪ নম্বর ধারায় বলা আছে, বিচারকদের জন্য পালনীয় একটি আচরণবিধি কাউন্সিল নির্ধারণ করে দেবে এবং একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সে বিষয়ে তদন্ত করবে। আদালতে রিভিউ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) মো. আসাদুজ্জামান। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে রিভিউ শুনানিতে অংশ নেন সাবেক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল। অতীতে বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার অনেক অপচেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। আমরা আশা করি, বর্তমান রায়ের মাধ্যমে বিচার বিভাগ আরো স্বাধীন, শক্তিশালী ও গতিশীল হবে।
বিচার বিভাগকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা নগ্নভাবে দলীয়করণ করেছিল। গত ১৫ বছর ধরে হাসিনা সরকার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। যার ফলে উচ্চ আদালতে গিয়েও মানুষ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হাইকোর্টের বিচারপতিরা প্রকাশ্যে বলেছে ‘আমরা শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’। এই শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদরা এখনো হাইকোর্টের বিচারক হিসাবে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। সেই ‘শপথবদ্ধ দলবাজ’ বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং আইনজীবীরা আন্দোলন করছে। আওয়ামী লীগের সমর্থক বিচারপতিদের পদত্যাগের দাবিতে হাইকোর্ট চত্বরে বিক্ষোভ করছেন একদল শিক্ষার্থী। হাইকোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। একই দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী আইন সমাজ’ ব্যানারে একদল আইনজীবীও সেখানে জড়ো হন। আর শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ব্যানারে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পোস্টে লিখেন, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট বিচারকদের পদত্যাগের দাবিতে হাইকোর্ট ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যে একই পোস্ট দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম। এই পোস্টের কমেন্ট বক্সে সারজিস লিখেন, ‘এই খুনি হাসিনার দালালদের কারণেই রাষ্ট্র ঠিকমতো ফাংশন করতে পারছে না। এদের উৎখাত না করা পর্যন্ত দেশ সামনে আগাতে পারে না, পারবে না।’ এদিকে গত ১৫ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগের ‘দুর্নীতিবাজ ও দলকানা’ ৩০ বিচারপতির পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিতে প্রধান বিচারপতির কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা। পদযাত্রার পর আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সিনিয়র আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, আইনজীবী মহসীন রশিদ, শাহ আহমেদ বাদল, সৈয়দ মামুন মাহবুব, এবিএম রফিকুল হক তালুকদার রাজা, কাজী জয়নাল আবেদীন প্রতিনিধি দলে ছিলেন। তবে ষোড়শ সংশোধনীর কারণে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের দোসর ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ থাকার পরও অপসারণের পথ এতোদিন রুদ্ধ ছিল। এবার এ সংশোধী বাতিল করে রায় দেওয়ায় সব প্রতিবন্ধকতা দূর হলো।
বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীন করতে এবং মানুষের ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিশন ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কমিশন প্রধান গত ৯ অক্টোবর রাজধানীর বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে সংস্কার কমিশনের দ্বিতীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বিচার বিভাগ সংস্কারে তিনি দুটি বিষয়ে বিশেষ নজর দেবেন। এর প্রথম বিষয়টি হলোঅধস্তন আদালতে বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং দ্বিতীয়টি হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে একটি যথাযথ নীতিমালা তৈরীর বিষয়।বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে দুটি বিষয়ে বেশি নজর দেব, অধস্তন আদালতে বিচারকাজে যাতে বিলম্ব না হয়। তাহলে বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি যেমন কমবে কেমনি বিচারকাজের খরচটাও কমবে। এছাড়া উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে একটা নীতিমালা সম্ভব হলে আমরা করে দেব। আপনি একজনকে এনে পরিচয় দিলেন আমার চাচা, জজ করে দেন, এটা যাতে না হয়। আমরা নীতিমালা ঠিক করব।নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা থাকলে জজ হবেন, না হলে বাদ যাবেন। যাই হোক বিচার বিভাগ তার পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করুক। মানুষ ন্যায় বিচার পাক এটাই সবার প্রত্যাশা।