
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের আওতাধীন রংপুর অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্পর্কে কাউনিয়া উপজেলার তালুকশাহাবাজপুর স্কীমের কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করছেন সংস্থার চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. নাসিরুজ্জামান, এ সময় প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সঞ্চয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন
হাসান রেজা : উত্তরের ৪ জেলা রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রামের ১৬ হাজার ১শ’ ৯৭ হেক্টর জমি সেচ কার্যক্রমের আওতায় এনে অতিরিক্ত ৭২ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)’র আওতাধীন ‘রংপুর অঞ্চলে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প’র মাধ্যমে খাল পুনঃখনন ও প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি এ অঞ্চলে আশানুরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
সূত্র জানায়, প্রায় ১শ’ ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে জানুয়ারি-২০১৮ থেকে জুন-২০২২ মেয়াদী এ প্রকল্পটি রংপুর জেলার রংপুর সদর, গংগাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ; নীলফামারী জেলার নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা, ডোমার ও ডিমলা; লালমনিরহাট জেলার লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালিগঞ্জ, হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রাম জেলার কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজীবপুর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পভুক্ত এলাকায় অপেক্ষাকৃত শুষ্ক আবহাওয়া, উচ্চতাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূ-উপরিস্থ পানির স্বল্পতা বিদ্যমান। কিন্তু, এ এলাকার মধ্য দিয়ে অনেক নদী, শাখা-নদী প্রবাহিত, যেখানে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস রয়েছে। এছাড়া, এসব এলাকায় অসংখ্য খাল-নালা রয়েছে এবং খালগুলো প্রায় ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। অসংখ্য নদী, খাল, নালা সমৃদ্ধ এ জেলাগুলোতে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎস থাকা সত্ত্বেও পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ভূ-উপরিস্থ পানির সেচ কাজে ব্যবহার কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছেনি; তাই আবাদযোগ্য অনেক জমি পতিত রয়েছে।
সূত্রমতে, প্রকল্প এলাকায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে এবং প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমি সেচ বহির্ভূত রয়েছে। খাল, নালা পুনঃখনন এবং প্রয়োজনীয় সেচ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সেচ বহির্ভূত জমির মধ্য থেকে ১৬ হাজার ১শ’ ৯৭ হেক্টর জমিতে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করে প্রতি বছর প্রায় ৭২ হাজার ৮শ’ ৮৭ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। প্রকল্প এলাকায় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠির আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহার ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি প্রয়োগ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ফলে এই এলাকায় সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি ও ফলন পার্থক্যও হ্রাস পাবে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, সম্পূর্ণভাবে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে ২শ’ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন এবং ১শ’ ১৮টি হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার (ক্রসড্যাম/সাবমার্জড ওয়্যার/সাইফন) নির্মাণের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ করে সংরক্ষিত ভূ-উপরিস্থ পানি ১শ’টি বিদ্যুৎ চালিত লো-লিফট পাম্প (এলএলপি) এবং ৫০টি সোলার লো-লিফট পাম্প (এলএলপি) দ্বারা ১৬ হাজার ১শ’ ৯৭ হেক্টর জমিতে ভূ-উপরিস্থ পানি নির্ভর সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে এবং সেচের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেচের স্কীমসমূহে ৪০৩.৫০ কিলোমিটার ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ করা হবে। বিশেষ করে, বিদ্যুৎবিহীন চর এলাকায়, চর নিকটবর্তী, তিস্তা, আত্রাই, যমুনেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া, ধরলা, ঘাঘট, দুধকুমার, টাংগন নদী থেকে নৌকায় স্থাপিত ভ্রাম্যমাণ সোলার লো-লিফট পাম্পের (এলএলপি) সাহায্যে পানি উত্তোলন করে চরাঞ্চলে পোর্টেবল আধুনিক মানসম্মত ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ সুবিধা প্রদান করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া, ৩০ হাজার মিটার ফিতা পাইপ সরবরাহ, প্রকল্প এলাকার খালের পাড়ে ফলদ ১০ হাজারটি ও বনজ ৩৫ হাজারটি বৃক্ষ রোপণসহ ৯শ’ জন কৃষি শ্রমিক ও কৃষক প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে ২শ’ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের মাধ্যমে ২ হাজার হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং ১৬ হাজার ১শ’ ৯৭ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। এছাড়া, ১৬ লাখ ঘনমিটর ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষিত হবে; এতে ভূ-গর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের নিমিত্ত বিভিন্ন ক্ষমতার সেচযন্ত্র স্থাপনের মাধ্যমে ১৬ হাজার ১শ’ ৯৭ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। প্রকল্পভুক্ত এলাকার বিদ্যুৎবিহীন চরাঞ্চলে নৌকায় ভ্রাম্যমাণ সোলার স্থাপনের মাধ্যমে চরাঞ্চলে ৩০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। ৪০৩.৫০ কি.মি. ভূ-গর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণের ফলে এলাকায় সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। বৃক্ষরোপনের ফলে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় ফলমূলের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। এছাড়া, ০.৭২ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন হবে, যার দ্বারা ৫০টি সোলার সেচযন্ত্র পরিচালিত হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সঞ্চয় সরকার দৈনিক পাঞ্জেরী’কে বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পভুক্ত ২৮ উপজেলায় আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারের ফলে কৃষি উন্নয়ন গতিশীল হবে। তিনি আরো বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূ-গর্ভস্থ পানির পরিবর্তে সেচ কাজে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক জলাশয়ের নাব্যতা, ভূ-গর্ভের পানির রিচার্জ বৃদ্ধি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রকল্পটি যথাযথ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্প এলাকার অনাবাদি জমি চাষাবাদের আওতায় আনয়নের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

