
প্রকল্পের উদ্যোগে সিআইজি (কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ) মৎস্য চাষিদের প্রদর্শনী খামারের উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম
হাসান রেজা : মাছ চাষের সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম-২ (এনএটিপি-২)। দেশের ৫৭টি জেলার ২৭০টি উপজেলায় এই প্রকল্পের নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে প্রকল্প এলাকায় মৎস্য খাত ও সংশ্লিষ্টরা আরো সমৃদ্ধ হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, মাছ চাষের মাধ্যমে দেশে অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে রফতানি আয়। স্বাধীনতা পরবর্তী মৎস্য ও মৎসজাত দ্রব্য রফতানি করে আয় বেড়েছে বহুগুণ। পাশাপাশি, মাছ চাষের মাধ্যমে দূর হচ্ছে বেকারত্ব। বহু শিক্ষিত যুবক মাছ চাষকে পেশা হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। মাছ একদিকে যেমন আমিষের অভাব পূরণ করছে তেমনি মাছ চাষের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব দূর হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান জনবান্ধব সরকার দেশের গ্রামীণ উন্নয়নের ধারা শহর এলাকার উন্নয়নের সাথে একই গতিতে আনতে বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে সরকার বিশ্বব্যাংক, ইফাদ এবং ইউএসএইড’র অর্থায়নে ৩ পর্যায়ে ১৫ বছরের ‘ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম’ শীর্ষক একটি কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই প্রোগ্রামের প্রথম পর্যায়ের সফল সমাপ্তির পর বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ও চাষি পর্যায়ে সম্প্রসারণের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণ এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
সূত্র জানায়, ছোট আকারের মৎস্য খামারের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট জেলাসমূহে মৎস্য বিপণন ব্যবস্থায় চাষিদের প্রবেশাধিকার উন্নয়নের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এনএটিপি-২ এর বিভিন্ন কার্যক্রম।
সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে মৎস্য খাত ও সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন ধরণের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-অভ্যন্তরীণ মৎস্য চাষ ও অভ্যন্তরীণ মৎস্য আহরণ কার্যক্রমের স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন সহায়তা প্রদান, নির্বাচিত মৎস্য উৎপাদন মডেলসমূহকে প্রণোদনা প্রদান। এছাড়া, প্রকল্পের মাধ্যমে মানসম্মত মৎস্য পোনা এবং গুণগত মানসম্পন্ন মৎস্য খাদ্য ব্যবহারে সহায়তা প্রদানসহ সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিলে মৎস্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নেও বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে চাষিদের প্রবেশ উন্নততর করার লক্ষ্যে লাগসই মার্কেট লিংকেজ তৈরি এবং মৎস্য পণ্য বাজারজাতকরণে ক্ষুদ্র মৎস্য চাষিদের সহায়তা করা হচ্ছে। এছাড়া, প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে নির্বাচিত জেলায় মৎস্য বাজারজাতকরণে সহায়তা প্রদান, মৎস্য খাদ্যের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কার্যক্রম চলছে। তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক সম্প্রসারণ পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য স্থানীয় মৎস্য সম্প্রসারণ প্রতিনিধি বা লিফ মনোনয়ন এবং প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে তাদের কারিগরি দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের উদ্যোগে মহিলাদের মধ্যে বাইসাইকেল বিতরণ করা হয়
সূত্র জানায়, প্রকল্পভুক্ত প্রতি ইউনিয়নে ২০ জন মৎস্য চাষির সমন্বয়ে ২টি করে কমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ বা সিআইজি গঠন করা হচ্ছে যার ফলে সিআইজিভুক্ত চাষিরা নিবন্ধন ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার সুযোগ পাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের চাষিদের কাছে মৎস্য চাষ বিষয়ক সকল তথ্য সম্প্রসারণের জন্য প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে প্রতি ইউনিয়নে একজন করে লিফ নির্বাচিত করে ইউনিয়ন পরিষদে কৃষক তথ্য ও পরামর্শ প্রদানে সক্রিয় করা হচ্ছে। লিফদের পানি পরীক্ষার কিট, বাইসাইকেল, ইন্টারনেট সংযোগসহ ট্যাবলেট পি সি, ইত্যাদি সরবরাহ করা হচ্ছে যার মাধ্যমে লিফগণ মৎস্য চাষ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হালনাগাদ থাকতে পারেন। চাষিদের দোরগোড়ায় শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক তথ্য ও পরামর্শ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রকল্প এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ফারমার্স ইনফরমেশন এন্ড এ্যাডভাইস সেন্টার (ফিয়াক) স্থাপন এবং ৯শ’ ফিয়াক কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্প মেয়াদে ২৪ হাজার ৭শ’ ৭৪টি উন্নত প্রযুক্তি প্রদর্শনী স্থাপন এবং সমসংখ্যক মাঠদিবস বাস্তবায়ন; সিআইজি সদস্য, দলনেতা, সিআইজিবহির্ভুত মৎস্য চাষি, মৎস্য হ্যাচারি/নার্সারি মালিক ও মৎস্য চাষের সাথে জড়িত উদ্যোক্তা ও লিফদের প্রশিক্ষণ; চাষিদের উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরও নির্ধারিত আছে।
প্রকল্পের আওতায় ২টি আহরণোত্তর মৎস্য পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন, মৎস্য পণ্য বাজারজাতকরণ ও মার্কেট লিংকেজ স্থাপনের জন্য মৎস্য চাষি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ২২টি প্রডিউসার্স অর্গানাইজেশন তৈরি ও সহায়তা; উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে ৪০টি বিলের উন্নয়ন, বিল নার্সারি স্থাপন, পোনা অবমুক্তকরণ, মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন এবং সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানায় প্রকল্প অফিস।
জলবায়ু সহনশীল এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি গ্রহণে সিআইজি চাষিদের উৎসাহিত করার জন্য এগ্রিকালচারাল ইনোভেশন ফান্ড-২ এর আওতায় মূলধন সহায়তা প্রদান; মৎস্য পণ্য পরিবহন, মৎস্যজাত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে প্রকল্প এলাকায় হ্যাচারি/নার্সারি স্থাপন, বরফ কল স্থাপন, কুল ভ্যান ক্রয়, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন, মৎস্য খাদ্য উৎপাদন কারখানা, ইত্যাদি স্থাপন করার জন্য মূলধন সহায়তা প্রদান করা হবে বলেও জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রমে বেশ কিছু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকার প্রতি ইউনিয়নে একজন করে লিফ নির্বাচন ও কাজে নিয়োগ এবং পানি গুণাগুণ পরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও ক্ষেত্র সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রতি দলে ২০ জন মাছচাষিকে নিয়ে ৫ হাজার ২শ’ ৭৬টি সিআইজি গঠন করা হয়েছে; ১ লাখ ২শ’ ৮০ জন সিআইজি সদস্যকে মৎস্য চাষ বিষয়ে ১ দিনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে; মাছ চাষ প্রযুক্তি বিষয়ক ৩ লাখ লিফলেট, ২৫ হাজার পন্ড রেকর্ড বুক, ১ লাখ ২০ হাজার সিআইজি পাশ বই, ১৫ হাজার এ্যাডভাইস সিøপ প্যাড, ২ হাজার ৭শ’ ১৫ সেট পানির গুণাগুণ পরীক্ষাকরণ যন্ত্র এবং উপজেলা দপ্তরে ১ শ’ ৬৩টি মোটরসাইকেল সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া, ১৩ হাজারের বেশি মাছচাষ প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকল্প কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চাষিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনএটিপি-২ (মৎস্য অধিদপ্তর অঙ্গ)’র পরিচালক খন্দকার মাহবুবুল হক দৈনিক পাঞ্জেরীকে জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের মৎস্য খাতের উন্নয়নে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের প্রতিটি কার্যক্রম বাস্তবায়নে কঠোর মনিটরিং অব্যাহত আছে। প্রকল্প কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চাষিদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

