ফেনী প্রতিনিধি : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমির হিসেবে শপথ নিয়েছেন মকবুল আহমাদ। তার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, মকবুল রাজাকার।
জামায়াতের আমির হিসেবে শপথ নেওয়ার পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, মকবুল আহমাদ ৭১ সালে স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেছেন। তিনি ফেনীর রাজাকার কমান্ডার ছিলেন।
কেন্দ্রীয় ও ফেনী জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, মকবুল আহমাদের গ্রামের বাড়ি ফেনী জেলার দাগনভূঁঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপূর ইউনিয়নের ওমরাবাদে। পেশায় তিনি স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ফেনী মডেল হাইস্কুলের শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর জামায়াতের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
আওয়ামী লীগ গত মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গ্রামের বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকেন মকবুল। পারিবারিক জীবনে চার সন্তানের জনক মকবুল আহমাদ। রুকন থেকে পর্যায়ক্রমে দলটির অঞ্চলভিত্তিক পরিচালক, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জেলা নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।
জামায়াতের প্রাক্তন আমির মতিউর রহমান নিজামী গ্রেপ্তার হওয়ার পর ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি আত্মগোপনে থেকেই দল পরিচালনা করেছেন।
জামায়াতের নেতা-কর্মীদের কাছে মুখলিস (সৎ) চরিত্রের মানুষ হিসেবে বিবেচিত মকবুল আহমাদ। দলের নেতা-কর্মীদের কাছে একাত্তরে তার অবস্থান স¤পর্কে জানতে চাইলে তারা কোনো কিছু বলতে রাজি হননি।
রাজনৈতিক জীবনে ফেনী-২ আসন থেকে ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যান মকবুল। প্রচারের আড়ালে থাকা জামায়াতের নতুন আমিরকে নিয়ে অন্যান্য দলের মধ্যেও আলোচনা কম। যদিও গত মাসে তার আমির হওয়ার খবর প্রকাশের পর তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল এমপি বলেছিলেন, মকবুলের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চিত্র খতিয়ে দেখা হোক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে তার বিষয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এমএ আউয়াল এমপি।
মঙ্গলবার দুপুরে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এম এ আউয়াল এমপি বলেন, ‘আমি আগেও এ বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলেছিলাম। এখন যদি এ ধরনের অভিযোগ ওঠে তাহলে আমার শঙ্কাই সত্যি হবে। আমি মনে করি, শিগগিরই মকবুলের একাত্তরের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত।
ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান অভিযোগ করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের কাজ চলমান থাকলেও ৭১-এর ঘাতক, তালিকাভুক্ত রাজাকার জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির মকবুল ও ফেনীর দুই শতাধিক রাজাকার এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী ও রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত ২০০ জনের বিচারের দাবিতে গত বছরের মে মাসে ফেনী শহীদ মিনার চত্বরে মানববন্ধন করা হয়। ফেনী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা এই মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন।
ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিকামী মানুষের রক্তে রঞ্জিত এমন একজনকে দলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতার আসনে বসিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের কলঙ্ককে অলঙ্কার হিসেবে ধরে রাখতে চাইছে জামায়াত।’
তিনি বলেন, ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মকবুল আহমাদ রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তারই নির্দেশে ফেনীর স্থানীয় রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন ভিপি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনকে চট্টগ্রামে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।’
দাগনভূঁঞা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার শরিয়ত উল্যাহ বাঙ্গালী বলেন, ‘মকবুল আহমাদের নির্দেশে দাগনভূঁঞা উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়ে ১০ জনকে হত্যা করা হয়।’ এই হত্যাকা-ের তদন্ত সাপেক্ষে মকবুল আহমাদের বিচার দাবি করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘মকবুল আহমাদের নির্দেশে রাজাকার মোশাররফ হোসেন মশা দাগনভূঁঞা উপজেলার খুশিপুর গ্রামে আহসান উল্লাহ নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকেও হত্যা করেন। রাজাকার মোশাররফ হোসেন মশা জীবিত আছেন। তার বাড়ি একই উপজেলার সাফুয়া গ্রামে।’
এদিকে জেলা জামায়াতের প্রাক্তন আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী দলের কেন্দ্রীয় আমিরের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ তুলে তার মতো একজন ইসলামি আন্দোলনের নেতাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করছে কিছু অসাধু ব্যক্তি। তার মতো একজন সৎ ও আদর্শ রাজনীতিবিদকে এই ধরনের মিথ্যা কলঙ্ক দিয়ে আদর্শের পথ থেকে কেউ সরাতে পারবে না।’
সোমবার জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে শপথ গ্রহণের পর মকবুল আহমাদ বলেন, ‘দেশে বিরাজমান সমস্যা ও সংকটের সমাধান আমাদের সবাইকে মিলেই করতে হবে। কোনো একটি দলের পক্ষে কিংবা একা সরকারের পক্ষে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে সবার সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে চলমান সংকট ও সমস্যা সমাধানের উদ্যেগ গ্রহণের জন্য আমি সরকারের প্রতি আবারো আহ্বান জানাচ্ছি। আর এ জন্য সব দল ও পক্ষের অংশগ্রহণে একটি সফল জাতীয় সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। তবে জাতীয় সংলাপকে সফল করতে হলে প্রয়োজন সংলাপের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।’

