নিজস্ব প্রতিবেদক : ফুলের মতো ফুটফুটে ছোট্ট শিশু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত রাস্তায় ফুল হাতে ছুটছে দু’পয়সার আশায়। এখন এমন দৃশ্য আর ভাবায় না আমাদের। একটি ক্ষুধার্ত টোকাই বালক ডাস্টবিনের ধারে বসে তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে টুকিয়ে পাওয়া খাবার তাতেই বা কি আসে যায় নগরবাসীর। এসব পরিচিত দৃশ্য ভেবে সময় নষ্ট করার মত সময় কোথায়! সবাই ছুটছে জীবিকার তাগিদে। ভাবনা একটাই নিজেরা যতই কষ্ট করি না কেন, বাচ্চাটাকে তো মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। কিন্তু ভাববার বিষয় এখানেই!
সেদিন বিকেল বেলায় পুরানা পল্টন লাইনে কংক্রিটের ১০ তলা বিল্ডিংয়ের ৪র্থ তলায় বেলকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক শিশু। দেখি শিশুটি অচেনা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পৃথিবীর দিকে। সে কিন্তু ওই ব্যস্ত বাবা-মা’র খুব আদরের সন্তান। টাকায় কেনা যায় এমন সব চাওয়াই তার পূরণ হয় সহজেই। তাহলে কেন সে অমন করে চেয়ে আছে? সুকান্তের ভাষায়- ‘তার চোখের সে ভাষা বুঝে না কেউ/ কেউ হাসে কেউ করে মৃদু তিরস্কার।’
আমিও তৎক্ষণাত না বুঝলেও পরে ওই শিশুর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি- তার নাম স্পর্শ। সে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। বাবা তার ব্যবসা নিয়ে সারাদিন বাড়ির বাইরে। মা ব্যাংকার বাসায় ফিরে সন্ধ্যায়। ওইটুকু বয়সের একটি ছেলে বাড়িতে সে একা! স্কুলে খেলার একটু সুযোগ মেলে। কিন্তু মাঠ কংক্রিটের হওয়ায় পড়ে গেলেই হাত-পা ফুলে যায়। বাসায় এসে তা দেখলে আবার মা বকে। তাই খেলতে ইচ্ছে করলেও অনেক সময় খেলা হয় না। বিকেলে স্কুল থেকে ভ্যান আঙ্কল বাড়ির গেটে পৌঁছে দিয়ে যায়। টেবিলে রাখা খাবার খেয়ে তখন বেলকুনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখ রাস্তায় কেউ খেলছে কি না। এসময় আমার কোচিংও নেই, খেলব এমন মাঠও নেই এখানে। তাই এখানে দাঁড়িয়ে থাকতেই আমার ভাল লাগে। আবার সন্ধ্যায় মা এসেই স্কুলের পড়া নিয়ে বসবেন।
বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখেন নানা জিনিস দিয়ে। তাদের সময়টা আনন্দের করতে হাতে তুলে দেন স্মার্টফোন, ট্যাব, ভিডিও গেমস। ব্যস্ত থাকার এসব উপকরণ পেয়ে বাচ্চারাও সাময়িক খুশি হয়। এমনকি অনেক সময় বাচ্চারা এসব জিনিসে আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে আবার ক্ষতিও হয়। পড়াশুনা বা অন্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক মেশা বন্ধ হয়ে যায়। হাতের কাছে এসব জিনিস না পেলে কান্নাকাটিও শুরু করে দেয়। আর এ অভ্যাস বাচ্চার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিখ্যাত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ স্টিভ জবসকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তার বাচ্চারা অ্যাপল এর আইপ্যাড পছন্দ করে কি-না। তখন তিনি বলেছিলেন- ‘তারা আইপ্যাড ব্যবহার করে না এবং বাচ্চারা কোন কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তা আমরাই ঠিক করে দিই’।
ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড এ্যান্ড মাদার হেল্থ-এর সহকারী অধ্যাপক রুবাইয়া পারভীন বলেন,‘ জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার হাতিয়ারই যেখানে প্রযুক্তি, সেখানে বাচ্চাদের এগিয়ে রাখতে তাদের ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে তারা পিছিয়ে পড়বে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিকে তারা কী কাজে ব্যবহার করছে সেদিকেও বাবা মায়ের নজর রাখতে হবে। প্রযুক্তির আসক্তি দূর করতে বাচ্চাকে ভালো বই পড়তে দিতে হবে, সৃজনশীল কাজে যুক্ত রাখতে হবে। প্রকৃতির কাছে নিয়ে যেতে হবে। প্রযুক্তি পণ্যে বাচ্চা যা দেখছে তা যেন তাদের বয়স উপযোগী হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সঙ্গ।’
শিশুদের গঠনমূলক এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটাতে বাবা মায়ের উচিৎ সময় দেয়া। তবে আজকাল বাচ্চাদের উপযোগী পার্ক কিংবা খেলার মাঠও পর্যাপ্ত নেই। যা অনেক অভিভাবকেরই ক্ষোভের কারণ। তাদের কথা জাতীয় শিশু একাডেমিও স্থানান্তরের জন্য আদালত আদেশ দিয়েছে। তাহলে শিশুদের বিকাশে আর বাকি থাকল কি!
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মজীবী বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের একটু দৃঢ় আর সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাবা-মা’কে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। আর এক্ষেত্রে আপনি বেছে নিতে পারেন বিকেল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগের সময়টি। এই সময়টা শিশুর সঙ্গে বন্ধুর মতো কাটাতে চেষ্টা করুন, যাতে সে সারাদিনের কষ্ট কিংবা একাকীত্ব পুষিয়ে নিতে পারে।

