নিজস্ব প্রতিবেদক : মধুর ক্যান্টিনে কিংবা ডাকসুর সামনে নেতাকর্মীদের ভিড়, ক্যাম্পাসজুড়ে তাদের ছুটাছটি আর নেতাদের লবিং ব্যস্ততা- এসবকিছুই বলে দিচ্ছে শিগগির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই এই ব্যস্ততা চোখে পড়ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শাখায়। পদ-প্রত্যাশীদের এই দৌড়ঝাঁপ শেষ হবে আগামী বৃহস্পতিবার।
ইতোমধ্যেই সম্মেলনের সবধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ২৮তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন আগামী ২৫-২৬ জুলাই। এর আগে দেশব্যাপী ১০১টি শাখার সম্মেলন চলছে একে একে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৃহত্তম ইউনিট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। তাছাড়া, রাজনীতির আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত ঢাবির মধুর ক্যান্টিন থেকে ছাত্রলীগের অধিকাংশ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলন নিয়ে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের সব হিসাব-নিকাশ। এই শাখার নেতৃত্বে কারা আসতে পারেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠনো হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এ শাখার সম্মেলন নিয়েও অভিযোগের শেষ নেই। অনেক নেতাই অভিযোগ করেছেন, সারাদেশের প্রায় সব শাখার মতো এখানেও হয়তোবা ‘সিলেকশন’ পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচন হবে। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে নেতা নির্বাচনে ‘ভোটপদ্ধতি’ এর কথা বলা থাকলেও তা মানছে না বর্তমান কমিটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, এবছর প্রায় সব জেলা শাখায়ই নেতা ‘নির্ধারণ’ করে দিয়েছে সোহাগ-নাজমুল কমিটি। সর্বশেষ, দুই গুরুত্বপূর্ণ শাখা ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে নির্বাচন করা হবে শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত নেতা বাছাই করা হয়েছে সিলেকশনে।
এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ প্রভাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেক পদ প্রত্যাশী। এ বিষয়ে অভিযোগ করে তারা বলেন, পরপর দুইটি কমিটি দেয়া হয়েছে বৃহত্তর ফরিদপুর ও বরিশাল থেকে। এতে করে ওইসব এলাকার প্রার্থীরা সবসময়ই আলাদা সুবিধা পায়। এভাবে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ করলে সংগঠনেরই ক্ষতি।
একজন প্রার্থী জানালেন তার হতাশার কথা। তিনি বলেন, সারাজীবন রাজনীতি করে গেলাম আর এখন এলাকা নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম।
সূত্র জানায়, বিগত বেশ কয়েকটি কমিটিতে বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুরের নেতাদের নিয়ে আসা হয়েছিল। এবারও তা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে অন্য নেতাদের মধ্যে। তাই নীতি নির্ধারকরা এবার বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুরের বাইরে যাবেন বলে তিনি আশা করেন। এসব বিষয় নিয়ে সাবেক ও বর্তমান নেতাদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ঝড় তুলছেন।
গত রোববার সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আফরিন নুসরাত তার ফেসবুক ওয়ালে লেখেন, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে বাড়ি ফরিদপুর-বরিশাল মানে ১০০ এর খাতায় ৫০ পেয়ে এগিয়ে থাকা! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদ দুটি এই দুই অ লের একক দখলে বললেই চলে। আ লিকতার এই অভিশাপে অনেক মেধাবীদের অংকুরেই স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলে পিছিয়ে পড়ছে ছাত্রলীগ! মেধাবীদের সামনে আনুন, দয়া করে ছাত্রলীগকে জেলা সমিতি বানায়েন না!’
এদিকে, গত সোমবার ও আজ মঙ্গলবার ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত জমা নেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জয়দেব নন্দীর নেতৃত্বে এ জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়। জয়দেব নন্দী জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনে এ জীবণবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হয়। এতে মোট দুইশর উপরে পদপ্রত্যাশীরা জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন।
গত ৮ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ কেন্দ্রীয় সম্মেলনসহ মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোর সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পর চঞ্চল হয়ে ওঠে ছাত্রলীগের রাজনীতি। কমিটিতে স্থান পেতে মন্ত্রী-এমপি, সাবেক ও বর্তমান ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে লবিং করার চেষ্টা করছেন সাম্ভাব্য প্রার্থীরা। সাবেক নেতাদের সিন্ডিকেট অনুযায়ী নিয়মিত তাদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন তারা। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনেকের সঙ্গেই দিনে রাতে দেখা করতে দেখা যাচ্ছে অনেককেই।
এছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে আওয়ামী লীগের আগামী দিনের নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদের সুনজরে আসার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। একই সঙ্গে লন্ডনে বসবাসরত প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট জন হিসেবে পরিচিত কলামিস্ট গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছেন পদ প্রত্যাশীদের একটি অংশ।
জানা গেছে, ক্যাম্পাসের একটি গোয়েন্দা দল পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছে। এতে তারা বেশকয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে ক্যাম্পাস ও পদপ্রত্যাশীদের এলাকায় যাচাই-বাছাই করেছেন। বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- ওই পদপ্রত্যাশীরা দলের প্রতি আনুগত্যশীল কি না, পদপ্রত্যাশীর পরিবার কোন ধারার রাজনীতির সাথে জড়িত, পদপ্রত্যাশী কোন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত আছে কি না ইত্যাদি। ওই গোয়েন্দা দলের এক সদস্য জানান, বিষয়টি যাচাই-বাচাই করে তার প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চলে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাবি শাখায় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসেবে জীবন বৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন প্রায় দুইশ নেতা। এর মধ্যে দৌড়ে এগিয়ে আছেন, ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আপেল মাহমুদ সবুজ, আদিত্য নন্দী, আসাদুজ্জামান শিকদার, আবুল হাসান রুবেল ও মেহেদী হাসান, সহ-সভাপতি রেজাউল ইসলাম রেজা, ফারুক হোসেন ও খায়ের চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সাইফ ও হান্নান হোসেন তালুকদার। এই দৌঁড়ে আরো আছেন মাস্টার দা সূর্যসেন হল শাখা সভাপতি মোবারক হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরেফিন সিদ্দিক সুজন, জসিম উদদীন হল শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান রনি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হল শাখার সভাপতি দারুস সালাম শাকিল, জহরুল হক হল শাখার সাধারণ সম্পাদক আল নাহিয়ান খান জয় প্রমুখ।
সম্মেলনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই সবধরণের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাবি শাখা সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা। আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের কার্যক্রম শুরু হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবাইদুল কাদের। সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম।
প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা বলেন, ‘আমরা সম্মেলনের সব প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছি। আশা করি এবার একটি সুন্দর সম্মেলন উপহার দিতে পারব আমরা।’

