নিজস্ব প্রতিবেদক : হঠাৎ করেই রাজনীতির মাঠ থেকে যেন হারিয়ে গেছেন হাজি সেলিম। সভা-সেমিনারে উপস্থিতি নেই, কোথাও কোনো বক্তব্য-বিবৃতি নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যাচ্ছেন না, আত্মপ্রচার তো নেই-ই। এলাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও নেই তিনি। নেই মহানগরের কোনো কর্মসূচিতেও। এপ্রিলের পর থেকে এড়িয়ে চলছেন সাংবাদিকদেরও। কী হলো হাজি সেলিমের? এমন প্রশ্ন এখন আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক ও কর্মীদের মাঝে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিমের হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়াটাকে খুব একটা সহজ চোখে দেখছেন না কেউ। এর পেছনের ঘটনা জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন অনেকে।
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থিতার যুদ্ধে পরাজয়ের পর তিনি একেবারেই ঘরকুনো হয়ে গেছেন। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা দক্ষিণে তার পরিবর্তে সাঈদে খোকনকে প্রার্থী করার পর থেকেই মূলত নিষ্ক্রিয় হয়েছেন তিনি। অনেকের প্রশ্ন- তবে কি রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়ছেন হাজি সেলিম?
ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসা এবং তরুণ নেতা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে সাঈদ খোকনের আবির্ভাব হাজি সেলিমের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। বিষয়টি বুঝতে পেরেই হাজি সেলিম অনেকটা মানে মানে কেটে পড়ছেন বলেও ধারণা করেছেন তারা।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিটি নির্বাচনের পর হাজি সেলিমের গুরু ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া নিজেই মুখে কুলুপ এঁটেছেন। সেখানে হাজি সেলিম নিজে থেকে আর কী করবেন?
তাদের মতে, গত ২৮ এপ্রিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই মূলত হাজি মো. সেলিম আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে মাইনাস হয়ে গেছেন। একই সঙ্গে সে সময় তার পক্ষ নেয়ায় দলের অভ্যন্তরে কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন নগরের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। সিটি নির্বাচনে নগরের এই দুই নেতার ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
আওয়ামী লীগের ওই নেতাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক এবং সাঈদ খোকনকে সমর্থন দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলীয় নেত্রীর সমর্থনের পরও দক্ষিণে সিটি মেয়রের জন্য হাজি সেলিমের পক্ষ নিয়ে নানা ‘গুটিবাজি’ করেন এই দুই নেতা। ফলে শেখ হাসিনা বেজায় চটেন তাদের উপর। হাসিনার কাছে যেন আর বেশি বিরাগভাজন না হন সে জন্যই চুপসে গেছেন ওই দুই নেতা এবং তাদের শিষ্য হাজি সেলিম।
গত ৩ এপ্রিল মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকনের পক্ষে হাজি মো. সেলিম একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে ৪ এপ্রিল ওমরা হজ পালনে সৌদি আরব চলে যান। সেই থেকে আর রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না সেলিমকে।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, হাজি সেলিম গত ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। তারপরেও শেখ হাসিনা তাকে ক্ষমা করেছেন। তিনি এমপি হয়েছেন। তাকে আবার মেয়র নির্বাচন করতে হবে কেন? তাকে কী সব দিতে হবে? আওয়ামী লীগে তো আরো অনেক নেতা রয়েছেন।
অনেকে মনে করেন, এই মুহূর্তে বেশি কথা বললে হাজি সেলিম আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একেবারে অপাঙক্তেয় হয়ে পড়বেন। এমনিতেই ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগেও তার অবস্থান খুব নড়বড়ে। আগামী কমিটিতে সেটা আরো স্পষ্ট হবে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের এক সহ-সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হাজি সেলিম একসঙ্গে সব খেতে চান। তাকে আর সেই সুযোগ দেয়া হবে না। রাজনীতি কখনও ক্যাডার দিয়ে হয় না। হাজি সেলিম ক্যাডার দিয়ে রাজনীতি করতে চান। তিনি নিজেও লেখা পড়া জানেন না, মেধাহীন। রাজনীতিটাকেও মেধাহীন করতে চান। তিনি সংসদ সদস্যও হবেন, দক্ষিণ সিটির মেয়র হবেন? কত চাই তার?’
তিনি আরো বলেন, ‘শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ নির্বাচন করেছেন। তারপরও তিনি তাকে সহ্য করেছেন, দলে রেখেছেন। এখন তিনি আবার মেয়রও হতে চান। অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিন্তু কখনও কিছু চাননি। তিনি কেন এত চান?’
ঢাকা মহাগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বলেন, ‘ইদানিং উনি (হাজি মো. সেলিম) কেন কোনো কর্মসূচিতে থাকছেন নেই সেটা বলতে পারব না। সম্ভবত তিনি ব্যস্ত আছেন।’
মহানগরের আসন্ন কমিটিতে তিনি বড় কোনো পদে থাকছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ নেত্রী (শেখ হাসিনা) জানেন।’
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ‘রাজনীতির দোকান’ খ্যাত বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে অতিথি থেকে বক্তব্য দিতেন হাজি সেলিম। কখনো কখনো সেইসব সংগঠনের অনুষ্ঠানগুলোতে সভাপতিত্ব করতেও দেখা যেতো তাকে। এখন সেসবের কোনোটিতেই হাজি সেলিমের দেখা মেলে না। এমনকি আগে কারণে-অকারণে, কোনো উপলক্ষ পেলেই পোস্টার ছাপিয়ে, বিলবোর্ড লাগিয়ে তিনি যে ধরনের আত্মপ্রচারণায় মেতে উঠতেন, সেসব থেকেও নিজেকে বিরত রেখেছেন। তার কাছের লোকজন জানিয়েছেন, তিনি এখন সংসার ও ব্যাবসাপাতি নিয়ে নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
চুপচাপ থাকা, রাজনীতিতে হঠাৎ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার ব্যাপারে জানতে হাজি সেলিমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। হাজি সেলিমের ব্যক্তিগত সহকারী বেলাল বলেন, ‘স্যার ব্যস্ত আছেন। এখন কথা বলতে পারবেন না।’

