বরগুনা প্রতিনিধি : বরগুনার বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ি গ্রামের দরিদ্র গৃহবধূ হোসনে আরা বেগম। অপুষ্টির শরীরে তার দিন দিন জেঁকে বসেছে জটিলসব ব্যাধি।
এদিকে, কোমড়ে আঘাত পেয়ে শয্যাশায়ী দিনমজুর স্বামী আব্দুল মালেক। ছোট ছোট পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে এক বেলার অন্ন যোগাতেই তার টালমাটাল অবস্থা। সীমাহীন অভাব অনটন আর দারিদ্রের কষাঘাতে একসময় দিশেহারা হয়ে পড়েন হোসনে আরা বেগম।
ডুবন্ত মানুষ হাতের কাছে খড় কুটো যেমন ধরতে চায়, তেমন হোসনে আরা বেগমও তাই চাইলেন। কখনও গ্রামীণ সড়ক মেরামতের কাজ, কখনও বা পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে ঝিয়ের কাজ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। চির দারিদ্রের সংসারে একটু সচ্ছলতার স্বপ্ন।
কোনোদিনই কি তা সম্ভব? বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে একসময় হোসনে আরা ভাবেন ক্ষুদ্র ব্যবসার কথা। কিন্তু কিছু পুঁজি তো লাগবে। কে দেবে সেই পুঁজি? নিকট এক স্বজনের মাধ্যমে একদিন আলেয়া বেগম জানতে পারেন, স্থানীয় একটি উন্নয়ন সংগঠন থেকে হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যদের জন্য এককালীন অফেরতযোগ্য ১০ হাজার টাকার সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। এরপর স্থানীয় ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির সদস্য হন তিনি।
এভাবেই একসময় হাতে আসে তার এককালীন ১০ হাজার টাকা। বাড়ির পাশেই বিষখালী নদী। বিষখালীর গহীন জলে দিনরাত মাছ ধরে সংসার চালায় শত শত জেলে। ছোট্ট একটি ডিঙ্গি নৌকা আর সামান্য একটু জাল হলে মাছ ধরে প্রতিদিন কিছু না কিছু রোজগার হবেই। অনেক ভেবে চিন্তে চার হাজার টাকার মধ্যে একটি নৌকা বানিয়ে ফেললেন হোসনে আরা। বাকি টাকার কিনলেন জাল। এরপর সকাল-বিকেল নাও-জাল নিয়ে পড়ে থাকলেন নদীতেই। মাছ বেচে এখন গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিনশ টাকা রোজগার হয় হোসনে আরার।
কোনো কোনো দিন এ হিসেব হাজারের ঘরও ছুঁয়ে যায়। একই সঙ্গে বাড়িতে যেটুকু সামান্য জমি রয়েছে সেখানে হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি বসত ঘরের আঙিনায় সবজির আবাদ করলেন। পাশের বাড়ির কবুতর দেখে নিজেও বাঁশ আর খুঁটি দিয়ে উঁচু করে বানালেন কবুতরের ঘর। আর এসব কাজে তার সাথে খাঁটুনি দিতে লাগল তার পাঁচ ছেলে মেয়ে এমনকি অসুস্থ স্বামীও। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি হোসনে আরা বেগমকে। ক্ষুধা আর দারিদ্রকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে এগিয়ে যান হোসনে আরা বেগম। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বর্ষা মৌসুমে গুটিসুটি হয়ে নির্ঘুম অনেক রাত কাটিয়েছেন হোসনে আরা, কিন্তু আর নয়। ছোটখাট সব দেনা পাওনাও শোধ হয়ে গেছে তার। এবার হোসনে আরা শুরু করে ঘর তোলার কাজ। যেখানে যে সঞ্চিত দু’পয়সা ছিল তা ভেঙে আর নিকট স্বজনদের কাছ থেকে হাজার দশেক টাকা ধার নিয়ে বানিয়ে ফেললেন ঘর।
আত্মবিশ্বাসী হোসনে আরা বলেন, ‘কোনোকালে ভাবি নাই নিজের পায়ে দাঁড়াইতে পারমু। অহন নিজের কাম কইরা নিজেই নিজেগো খাওন যোগাড় করতে পারতে আছি। মাছ বেইচ্চা দুই পয়সা পাই। আবার হাঁস-মুরগির ডিম বেইচ্চাও কিছু পাই। কইতরেও (কবুতর) ছাও (বাচ্চা) দেয়। এক জোড়া কইতরের ছাও বেচি দেড়শ টাহা। মাঝে মাঝে নিজেরাও খাই।’
শুধুমাত্র হোসনে আরা বেগমই নন, ক্ষুদ্র ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করে হোসনে আরা বেগমের মতো বরগুনা সদর ও বেতাগী উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের সাড়ে তিন হাজার অতি দরিদ্র পরিবার এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ সরকারের ই ই পি প্রকল্পের আওতায় দাতা সংস্থা অক্সফামের সহযোগিতায় নারী অধিকার নিয়ে কর্মরত স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন ‘জাগো নারী’ সিডর পরবর্তী সময় থেকে বরগুনা ও বেতাগী উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে রি-কল প্রকল্প নামে জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজন বিষয়ক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে।
২০০৯ সালে স্থানীয় অধিবাসীদের সংগঠিত করে তাদের দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রশমনের পাশাপাশি সব প্রকার অধিকার সচেতন করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে এ প্রকল্পটি শুরু হয়। এ প্রকল্পের অধীনেই বরগুনা ও বেতাগী উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে মোট ১০৫টি স্থানীয় সংগঠন বা সিবিও গঠন করা হয়েছে। এসব সিবিওর অধীনে সাড়ে তিন হাজার হতদরিদ্র পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে বিভিন্ন ট্রেন্ডের ক্ষুদ্র ব্যবসা, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনের জন্য অফেরতযোগ্য এককালীন ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে।
রি-কল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. মনিরুজ্জামান জানান, এ প্রকল্পের অধিনে নির্বাচিত উপকারভোগীদের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ওইসব পরিবারের ব্যবসায়িক আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণসহ তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে দারিদ্রসীমার উপরে উঠে আসতে কেউ ব্যর্থ না হয়।
বেতাগী উপজেলার সরিষামুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউসুফ শরীফ জানান, অক্সফামের সহযোগিতায় উন্নয়ন সংগঠন জাগো নারী যে প্রকল্পটি এখানে বাস্তবায়ন করছে তা যথেষ্ট সময়োপযোগী। এ প্রকল্পের অধীনে এককালীন অফেরতযোগ্য ১০ হাজার টাকার আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে তার ইউনিয়নে হোসনে আরার মতো হতদরিদ্র অনেকেই এখন নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই তৈরি করে নিয়েছেন।

